ওড়িশায় যারা আই এ এস নয়, তারা সবাই ছেলেমেয়েদের আই-এ এস করার জন্য বা আই এ এসের সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য প্রাণ দিতে পারে অথচ সর্বদা আই এ এসদের কুৎসাও করে। বরাবর দেখেছি। আমি ওর মধ্যে যাই না। অতঃপর প্রত্যাশিত উত্তর দিয়ে বিদায় নিই। এবারে টারগেট সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব। তার ঘরের সামনে ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় প্রাইভেট সেক্রেটারি স্টেনো প্রভৃতির প্রারম্ভিক বাধা উত্তরণ। ঘরে ঢুকে নমস্কারের পালা সেরে বক্তব্য নিবেদন করি। ভদ্রলোকের মুখের ভাবে কোনও বদল দেখা গেল না। নাকি আমিই বুঝতে অপারগ। রংহাড়ির কালি তার ওপর দাড়িভর্তি মুখ। অনেকটা আফ্রিকান আফ্রিকান। যেন জোমো কেনিয়াট্টার ছোট ভাই। মোটেই পরিচিত ওড়িয়া মধ্যবিত্ত উচ্চবর্ণের চেহারা নয়। ভদ্রলোক অবশ্য জাতে ব্রাহ্মণ। যাই হোক কর্তব্য করা দরকার। চিঠিটা ওঁর সামনে দিই। একবার চোখ বুলিয়ে জোমো কেনিয়াট্টার ছোট ভাই বললেন,
—আপনংকর একতা কালচারল অর্গানাইজেসন?
–ইয়েস স্যার।
—আপন তার প্রেসিডেন্ট?
—ইয়েস স্যার।
–আচ্ছা, আজিকালি বঙ্গলারে বিজয় গোস্বামী কণ বঢ়িয়া লেখুছন্তি শুনুছি। আপন তাংক বিষয়রে কিছি জানন্তি?
আমার মাথায় বজ্রঘাত। বাংলা কবিতা পড়ার পাট স্কুল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, চুকে গেছে। রবীন্দ্রনাথ নজরুল ছাড়া কারো এক লাইনও মনে নেই। একতার ঘরোয়া অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি-টাবৃত্তি হয়। আর বাচ্চাদের ফাংশানে সুকুমার রায়। আমার জ্ঞানের বহর সেই অবধি। অতএব মাথা চুলকে বলি,
—ওঁর কবিতা স্যার আমার তেমন পড়া নেই। তবে আপনি যদি কোনও খবর চান ওঁর সম্পর্কে সেটা আমি জোগাড় করে দিতে পারি। বিজয় গোস্বামী সম্বন্ধে একজাক্টলি কী স্যার জানতে চান?
-না না সিমিতি স্পেসিফিক ইনফরমেসন দরকার নাহি। তাংকর কবিতা সম্পর্করে জানিবাকু চাহুথিলি। তা হউক পছরে দেখিবা।
-স্যার আমাদের কেসটা একটু দেখবেন। চিমিনিষ্টারের ইচ্ছে স্ট্যাচু একটা বসুক, আমরা তৈরিও করিয়েছি। এখন ইনস্টল করার পারমিশানটা…
-ইয়েস ইয়েস আই আন্ডারস্ট্যান্ড। বাট ইট মাস্ট কম থ্রু প্রপার চ্যানেল। ডাইরেক্টর ফাঁইল পাঠাইলে তারপর যা করিবার করিবা। আগরুতো কিছি হেই পারিব নি..
অর্থাৎ যে তিমিরে সে তিমিরে। এ দিকে একতার কার্যকরী সদস্যরা রোজ মাথা খাচ্ছে, দাদা খবর পেলেন, পারমিশান হল। সবাইকে ঠেকিয়ে রাখছি স্তোকবাক্যে। অনিলেন্দু পট্টনায়েকের বাড়িতে টেলিফোন করে পাই না। যে ধরে সে আমার পরিচয় জানতে চায় এবং তারপর এক উত্তর সাহেবঅ নাহান্তি। কেন্তে বেলে ফেরিবে কহি পারিবি নি। ব্যস। ঘুম ভেঙে যায় প্রায় প্রতি রাত। সকালে উঠতে পারি না। কাজকর্ম গয়ং গচ্ছ ভাবে চলছে। একদিন আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাল ছেলে সৌম্যেন (নামের ইংরেজি বানানে যে এখনও ওয়াই যোগ করে বলে যার ডাক নাম ওয়াই, টেলিফোন করে বলল, কলকাতা থেকে বিখ্যাত কবি সুহাস চট্টোপাধ্যায় ভুবনেশ্বরে এসেছেন দুদিনের জন্য। ওড়িয়া সাহিত্য আকাদমির কী যেন অনুষ্ঠানে অতিথি। উঠেছেন পান্থনিবাসে। দেখা করলে কেমন হয়।
আমার এসব কবি-টবিদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। স্কুলে আমাদের ক্লাসে বাংলায় ফার্স্ট হত বিজন। বিজন বসু। পরীক্ষায় ওর লেখা রচনা বাংলার স্যার পরে ক্লাসে পড়ে শোনাতেন। ওর কবিতা ছাপা হত স্কুল ম্যাগাজিনে। ওই বাংলালেখার সম্পাদক। আমার মতো যারা বাংলায় কাঁচা তাদের সঙ্গে পারতপক্ষে কথাই বলত না। একবার হাফইয়ার্লিতে আমার সামনে ওর সিট। ওকে একটা এক্সপ্ল্যানেশান জিজ্ঞাসা করেছি, শুধু কবিতাটার নাম। কিছুতেই বলল না, শুনতে পায়নি এমন ভান করল। পরে শুনেছি বিজন নামকরা কবি হয়েছে, কোন প্রাইভেট কলেজে পড়ায়। বাংলায় লেখালেখি করা মানুষের সঙ্গে ওইটুকুই আমার সম্পর্ক। কাজেই সুহাস চট্টোপাধ্যায় সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণাই নেই।
—ওঁর সঙ্গে দেখা করে কী হবে?
-এই আলাপ করা যাবে আর কি। কলকাতায় ওঁর মতো নামকরা কবিকে এমন হাতের কাছে হয়তো পাব না। কলকাতার সঙ্গেই বা আমাদের আর যোগাযোগ কী? তা ছাড়া আমাদের ঐ রবীন্দ্রমূর্তির ব্যাপারটা ওঁকে বললে হয় না।
–কী হবে বলে? উনি এখানে এসেছেন অতিথি। ওঁর পক্ষে তো এসব নিয়ে কথা বলা সম্ভব নয়।
—না না আমি ওঁর কিছু করার কথা বলছি না। কিন্তু দৈনিক খবর-এ যা বেরিয়েছে সেটা তো ওঁর মতো বাংলা ভাষার লেখক সাহিত্যিকদের জানা দরকার।
–ঠিক আছে। চলো যাওয়া যাক।
পান্থনিবাসে গিয়ে দেখি পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কবি শ্রীসুহাস চট্টোপাধ্যায়কে দোতলায় একখানা ভাল ঘরই দিয়েছে। শুধু দেওয়ালে এসি লাগানোর জায়গায় একটা মস্ত ফোঁকড়। কবি সুহাস চট্টোপাধ্যায় একটি সোফায় বসে। পাতলা লম্বা গড়নের ভদ্রলোক। শরৎচন্দ্র মার্কা সাদা ধবধবে চুল এক মাথা। সামনে ওড়িশা সাহিত্য আকাদমির সম্পাদক কানু মিশ্র আর মধ্যবয়সি শিক্ষিত চেহারার এক ভদ্রমহিলা।
কবি সুহাসের হাঁটুর কাছে সেন্টার টেবিলে একটি চটি বই। যথাবিহিত আলাপ পরিচয়ের পালা। আমরা প্রবাসী বাঙালি একতানামে সাংস্কৃতিক সংস্থায় আছি। ভদ্রমহিলা তিলোত্তমা বিশোয়াল, ওড়িয়া কবি, রমা দেবী মহিলা কলেজে ওড়িয়া বিভাগের প্রধান। কানু মিশ্র এবং তিলোত্তমা বিশোয়াল দুজনেই কবি সুহাসের সামনে গদগদ মুখে ভক্তের মতো বসে। আমরাও গদগদ ভাব মুখে আনতে চেষ্টা করি। কবি সুহাস একটি চটি বই টেবিল থেকে তুলে হাতে নিয়ে খুললেন। এ পাতা ও পাতা চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন,
