—আশ্চর্য কথা। ওদের নিজেদের রাজ্য, পুরো স্টেট পাওয়ার নিজেদের হাতে। ওরা তো নিজেরাই যেখানে ইচ্ছে সেখানে যতগুলো ইচ্ছে নিজেদের লোকেদের মূর্তি বসাতে পারে। আমরা একটা সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। সাময়িক বাসিন্দা, প্রবাসে নিজেদের সংস্কৃতি বজায় রাখার চেষ্টা করছি। আমরাও যদি ওদেরই সংস্কৃতি ওদেরই সব কিছুতে মিশে যাই তা হলে বাঙালি হিসাবে আমাদের অস্তিত্ব কী থাকে? নাকি আপনাদের নিউজ এডিটার বলছেন বাঙালি অস্তিত্বের দরকার নেই?
–দেখুন অমলবাবু আমি আপনি এখানে বাস করি, আমরা যেটা অনুভব করি কলকাতার লোকে করে না। এই ভারত ব্যাপারটা বাস্তবে কী ওদের একেবারে অভিজ্ঞতা নেই। ওরা ভাবে ওড়িশা মানে বাঙালি ট্যুরিস্টের দেশ উড়িষ্যা। তা ছাড়া কলকাতায়, অন্য প্রদেশের লোকেরা যেমন বুক ফুলিয়ে থাকে ওদের ধারণা আমরাও বাইরে সে ভাবে থাকি। আমাদের ক্ষেত্রে যে টাইটরোপ ওয়াকিং সেটা কে বোঝে।
—তা হলে ছেড়ে দিন।
—ভেরি সরি। না না ঠিক আছে।
—কী হল শেষ পর্যন্ত জানাবেন। –আচ্ছা।
সেক্রেটারিয়েটে গেলাম। প্রথমে ডিরেক্টর অফ কালচার, দেখা যাক বেটা কী করেছে পিটিশানটা। এত বছর ধরে খাইয়েছি দাইয়েছি ছেলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। অন্তত চোখের চামড়াটা তো থাকবে।
-নমস্কার স্যার।
—এই যে মিঃ দাস নমস্কার। আজি মু টিকি-এ ব্যস্ত আছি।
–আপনাকে বেশিক্ষণ ডিস্টার্ব করব না। আমি খালি স্যার রিমাইন্ড করতে এলাম ওই একতার পিটিশানটার ব্যাপারে, মানে আই মিন আওয়ার রিকোয়েস্ট ফর পারমিশান টু প্রেজেন্ট আ স্ট্যাচু অফ রবীন্দ্রনাথ অ্যাট রবীন্দ্রমণ্ডপ।
-হাঁ, চিঠি কণ গোটিএ আপন দেইথিলে। খালি মতে দেইথিলে না ডায়েরি হেইথিলা? ডায়েরি হেইচি? তেবে তো ঠিক অছি। কনসর্ল্ড সেকসন পুট আপ করিব। ডোন্ট ওয়ারি।
—কিন্তু স্যার বেশি দিন আর দেরি নেই। বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিন। আমরা তো প্ল্যান করেচি সে দিনই মূর্তি প্রতিষ্ঠা হবে। কলকাতা থেকে একটি নাট্যসংস্থা আসছে। ভাল বাংলা নাটক করবে। আর রবীন্দ্রসঙ্গীত তো থাকবে বটেই। ভোগ্রাম হয়ে গেছে। চিফ মিনিস্টার জানেন। কিন্তু অফিসিয়ালি সরকার অনুমতি না দিলে তো পি ডবলিউ ডি কাজ শুরু করতে পারে না।
—ইন ডিউ কোর্স হব। আপন এক্সপিরিয়েন্সড লোক পরা, জানি নাহান্তি সরকারি কাম-এ এত্তে জলদি হুয়ে নি? মোর গোটিএ মিটিংকু যিবার অছি, পছরে কথা হব। কিছি মাইন্ড করিবে নি। নমস্কার।
-নমস্কার।
এই কি এতদিনের বন্ধু অনিলেন্দু? ভাবভঙ্গি ভাষায় যেন এক অচেনা আমলা। বেটা তো প্রথমে চিঠির ব্যাপারটাই চেপে দিতে চাইছিল, যেন পায়নি। তবে আমিও অমল কুমার দাস। এক যুগ ওড়িশাতে বাস করছি। অফিসিয়াল চ্যানেল জানতে বাকি নেই। আমলাদের সঙ্গে যতই ভাবভালবাসা থাক কোনও চিঠি ডায়েরি না হলে কিছুই হয় না। অর্থাৎ সরকারের প্রাপ্তিস্বীকারের খাতায় ওঠা এবং নম্বর ও তারিখ পড়া। কিন্তু কাজটাই যদি করতে না চায়? না না চাইবে না কেন। অনিলেন্দুর এতে কী আছে। এসব ভাবতে ইচ্ছে হয় না। বরং সেক্রেটারি পি ডবলিউ ডি-র ঘরে একটু ছুঁ মারি।
–নমস্কার স্যার।
–নমস্কার, কেমন আছেন মিঃ দাস? বসুন চা খাবেন?
–না না থাক। কিছু দরকার নেই।
–তা আপনাদের সেই রবীন্দ্রমূর্তি কী হল? কই পারমিশানের চিঠি তো পেলাম না।
—সেটার খোঁজেই তো স্যার এসেছিলাম।
–হয়ে গেছে?
–কোথায় আর স্যার হল। ডিরেক্টর অফ কালচারকে আমি নিজে দিয়ে গেছি। আলোচনাও হয়েছে। অথচ আজ মনে হল চিঠিটাই যেন ট্রেস করা যাচ্ছে না। তলা থেকে যা করে পাঠাবে। ওঁর তেমন গা নেই।
-আরে এই সবও এ এস,আই এ এসরা বুঝলেন হাইলি ওভাররেটেড। এফিসিয়েন্সি অত্যন্ত লো। পাওয়ার অতিরিক্ত। সব জেনারেল স্ট্রিমের মিডিওকার স্টুডেন্ট। আর আমরা মানে ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার আমরা সব গোড়া থেকে ভাল ছাত্র ছিলাম। যারা সায়ান্স পারেনা তারা আর্টস ফার্টস পড়ে। অথচ দেখুন এখন ওই সিভিল সার্ভিসের ছাপ লাগিয়ে আমাদের ওপর কর্তাতি করে।
-আপনার ওপর আর কী করে, আপনি নিজেই তো সেক্রেটারি।
—আরে সে জানেন তো কত ফাঁইট করে। একটা আই এ এস পোস্টবাইরের কাউকে দেবেনা। তাও আমি শুধু সেক্রেটারি। আই এ এস-দের দেখুন, কমিশনার কাম-সেক্রেটারি, প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি কত কী। বুঝলেন মিঃ দাস যত দিন এই সিভিল সার্ভিসের রিফর্ম না হচ্ছে আমাদের দেশের উন্নতি নেই। কাজই তো হয় না। আপনার নিজের ব্যাপারটাই দেখুন না।
—তাই তো স্যার আপনার কাছে এলাম। কী করা যায় বলুন তো?–সেক্রেটারি কালচারের সঙ্গে দেখা করেছেন? ওঁকে একবার সরাসরি বলে দেখুন। অরিজিনাল চিঠির কপি নিয়ে যাবেন। ওপরে লিখে দেবেন অ্যাডভান্স কপি। কারণ রেগুলার চ্যানেল মানে ডিরেক্টরের থু দিয়ে না গেলে তো অফিসিয়েলি পেয়েছে বলে স্বীকার করবে না। মানে পেলেও অ্যাকশান নেবে না।
—আপনার কী মনে হয় ওঁকে বললে কিছু হবে?
—হলেও হতে পারে। ইনি তো আবার কবি। এই আরেকটা ধান্দা সব ব্যুরোক্র্যাটদের। সকলেই কবি, সকলেই পালা করে প্রাইজ-টাইজ পায়। এটা থেকেই বোঝেন না এ স্টেটের কালচার কী? আপনাদের বেঙ্গলি লিটারেচার তো এত রিচ, কটা আই এ এস লেখক সেখানে? আর যদিইবা থাকে, প্রাইজগুলো কি সব তারাই পায়? আই টেল ইউ মিঃ দাস দিস স্টেট ইজ রুইন্ড বাই আওয়ার ব্যুরোক্র্যাটস…
