রোগীর অতীত সম্পর্কে এখন একটা সুস্পষ্ট ধারণা করা যাচ্ছে কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। আমার কৌতূহল নিবৃত্তি স্মৃতিচারণার উদ্দেশ্য হতে পারে না।
রোগী নিজের অতীত পুনরুদ্ধার করে বর্তমানকে মেনে নেবে এটাই আশা। সমস্ত বর্ণনা এত জীবন্ত যেন আমাকে বলার সময় সে-ও আরেকবার অভিজ্ঞতাটির মধ্যে দিয়ে যায়। একটা বিশেষত্বনজরে পড়ে। তার স্মৃতিতে দাগ কেটে আছে বহুসংখ্যক স্বল্প পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ। সে তুলনায় ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আদান প্রদানের চিত্রটি অস্পষ্ট ঝাঁপসা ভাসা-ভাসা। মানুষের সঙ্গে মানুষের সখ্য সহমর্মিতা বিষ ঈর্ষার উজ্জ্বল বলয়ের কেন্দ্রে অন্ধকার মৈত্রেয়ী ও অমলের সম্পর্ক।
রোগীর স্মৃতি রোমন্থনে দেখি সে সর্বদা এক ছোটখাটো জনতায় পরিবেষ্টিত। কখনওই একান্ত বা একলা নয়। এমন কি মৈত্রেয়ীর সঙ্গেও না। ভুবনেশ্বরে মেত্রেয়ীর আসা মানে একতার অনুষ্ঠান পিকনিক আউটিং, নিদেন পক্ষে বাড়িতে জমায়েত। সর্বদা জনতা। মৈত্রেয়ীর সঙ্গে তার নিভৃত জীবনের কোনও বিশেষ ঘটনার বিবরণ পাই না। অথচ বাস্তব তো কিছুতেই সেরকম হতে পারে না। সব অনুষ্ঠান পার্টি লেটনাইটের পরে নারী পুরুষকে এক ছাদের তলায় একান্ত হতেই হয়। তখন কী ঘটত? সে সব স্মৃতি গেল কোথায়? নাকি একান্ত হওয়াটাই ভয়ের। বোঝাঁপড়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই স্বল্পপরিচিত জনারণ্যে তার নিশ্চিত নিরাপত্তা বোধ। মঞ্চে দাঁড়ানো ফোটোগ্রাফারের ক্লিক-ক্লিক, টিভি ক্যামেরার প্রচণ্ড আলো, হাতে মাইক, চারিদিকে প্রচুর লোক। বেশির ভাগ অচেনা। এর মধ্যে ব্যক্তিসত্তার হদিশ কই? নাকি সত্তালোপই ব্যক্তিটির অভীষ্ট। অর্থাৎ ব্যাধির মূল মনের অন্তর্দেশে।
.
অনেক বাস্তব জড়িয়ে থাকা হয়েছে আর নয়। আমি তো বরাবর শুধু আজকের দিনটার কথাই ভাবতাম, আগামী কাল যেন ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। শুধু গতকাল থেকে বেরুতে পারিনা। সেই ২২শে শ্রাবণের প্রস্তুতি, রবীন্দ্রমূর্তি শুভ-এর বাংলানাটক অভিনয়, এসবের খুঁটিনাটিতেইতো সারাক্ষণ ব্যস্ত। কলকাতায় মৈত্রেয়ীর সঙ্গে সময়টা বেশ ভালই কাটল। মৈত্রেয়ীর আবার আগের মতো উৎসাহভুবনেশ্বরে একতার অনুষ্ঠানে, যেন আমার জীবনে আবার সে কেন্দ্রস্থলে ফিরে এসেছে। না ভুল বলা হল। সে বরাবরই কেন্দ্রে ছিল, সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়। এখন সে যেন আবার জেগে উঠেছে। শুভনাটক গোষ্ঠীর সঙ্গে জমে যাওয়ার ফলেই কি না কে জানে তার উৎসাহ এখন সবার চেয়ে বেশি।
আমার জীবনকাহিনী যদি কোনও জাতির ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করা যায় তা হলে রবীন্দ্রমূর্তিপর্ব হতে পারত রেনেসাঁস, পুনরুজ্জীবন। সেখান থেকে শুরু হত নব নব দিগন্ত সন্ধান, বহু বিচিত্র ক্ষেত্রে বিস্তার। কিন্তু তা হয়নি। বেঙ্গল রেনেসাঁসের মতো জ্বণেই মৃত। কী হতে পারত ভুত আমাকে ছাড়ে না। মনে করতে ইচ্ছে করে না অথচ সর্বদাই স্মৃতিতে জেগে আছে সেকদিনের ঘটনাবলী। মৈত্রেয়ীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রেখে, অর্থাৎবাইশে শ্রাবণে রবীন্দ্রমণ্ডপে রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠায় এতটুকু সমস্যা হতে পারে সে সম্বন্ধে কোনও আভাস
দিয়ে ফিরে গেলাম ভুবনেশ্বরে। কিন্তু দুশ্চিন্তা গেল না। কার্যকরী সমিতির কেউ না কেউ প্রতিদিন মনে করায়,
—দাদা, আমাদের চিঠিটার কিন্তু কোনও উত্তর এল না।
–কোন চিঠি? আমি ভাল করেই জানি। তবু।
—বা, ভুলে গেলেন। সেই যে সেক্রেটারি কালচারকে আবেদন করা হল!একতার তরফ থেকে রবীন্দ্রমণ্ডপে একটি মর্মর রবীন্দ্রমূর্তি উপহার দেওয়ার সংকল্প। নালকো দিচ্ছে গ্রানাইটের পেডেস্টাল। এসবের অনুমতি প্রার্থনা। সব ভুলে গেলেন?
-না, না ভুলব কেন। তা ব্যস্ত হবার কী? দু এক দিনের মধ্যে সেক্রেটরিয়েটে গিয়ে হাতে হাতে নিয়ে আসব।
-ওটা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত সবাই খুব টেন্স হয়ে আছে।
—কেন টেনশানের কী?
-ওই ওড়িয়া কাগজে কী সব লিখেছিল না, তাই। কাগজটার মালিকতো মুখ্যমন্ত্রীর এক নম্বরের চেলা। সেই আবার সম্পাদক।
-তোমরা অকারণে তিলকে তাল কর। সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা সরকারের এতে কী আছে বল? বিনা খরচে একটা স্ট্যাচু কমপ্লিট উইথ পেডেস্টাল পাচ্ছে, তাতে ডোনারের নাম পর্যন্ত নেই। অসুবিধাটা কোথায়? আর রবীন্দ্রনাথ তো হেঁজিপেজি কেউ নন, ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা, প্রথম ভারতীয় যিনি নোবেল
-ও সব তো দাদা সবাই জানে। তা সত্ত্বেও লেখাটা বেরিয়েছিল। কথাটা আমার মনে বিলক্ষণ আছে। কলকাতা থেকে ফিরে এসে ভুবনেশ্বরে বাংলা দৈনিক, ভারতে সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র অখণ্ড বাজার-এর স্থানীয় প্রতিনিধি সায়ন্তন দাশগুপ্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ছেলেটি ভাল কথাবার্তায় চৌখশ। সাংবাদিকদের যেমন হওয়ার কথা। আমার অফিসে বসে সব বৃত্তান্ত শুনে বলল,
-মুশকিল কি জানেন কলকাতার অফিস ওসব ওড়িয়া বাঙালি ব্যাপার ছাপতে চায় না। আমাদের ইংরিজি কাগজটা এখানে ইংলিশমানের চেয়ে বেশি চলে জানেন তো? তাই সব সময় বুঝতেই পারেন গা বাঁচিয়ে চলা। তবু আমি একবার নিউজ এডিটরকে জিজ্ঞাসা করি।
কদিন বাদে টেলিফোন।
—অমলবাবু, আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তা উনি বললেন শুধু আপনাদের কথা তো ছাপা যায় না ওদের কী দাবি সেটাও দিতে হবে। আমি বললাম, মানে ওড়িয়া প্রতিবেদনটির সারাংশ পড়ে শোনালাম। তাতে কী বলল জানেন? ওহহা ওরা ওড়িয়া লেখকের মূর্তি চায় এই তো? তোমাদের একতা সেরকম দুচারখানা রবীন্দ্রমূর্তির সঙ্গে বসিয়ে দিলে পারে। তা হলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
