বাঙাল মেয়েটা থেকে থেকে অমলকে চমকে দেয়।
-এই তো দিব্যি চমৎকার বাংলা বলছ। এত জ্ঞানের কথা কোথায় শিখলে?
-কে জানে। এই আপনাগো পত্রপত্রিকায় পড়সিলাম আর কি। বাংলাদেশের লাইব্রেরিতে পুরাতন কপি দ্যাখতাম কি না। নির্বিকার উত্তর, আবার নিজস্ব বুলি, মেয়েটার তাল পায় না অমল।
—তা বড় বড় কথা তো বললেন কিন্তু ঘটনাটাতো কিছুই আগাইলো না। রবীন্দ্রনাথের মূর্তি কী হইল? শুভম-এর নাটক? বড্ড ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যাংটায় মেয়েটি। বাঙাল বলে কি এটুলি হতে হবে।
–বকবক কোরো না, যাও অনেক হয়েছে। ভয়ংকর বিরক্ত লাগে অমলের। বিনা বাক্যব্যয়ে কাগজ কলম ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে উঠে পড়ে ছায়া।
.
তারপর কদিন তার আর পাত্তা নেই। হঠাৎ সকালে এসে যেন কিছুই হয়নি যেন প্রতিদিন নিয়মিত এসেছে এমন ভাব করে জিজ্ঞাসা করে,
—কী রাতে ক্যামন ঘুমাইছিলেন? চোখদুইটা লাল ক্যান? কয় রাত নাইট্রাসুন খাইলেন, ঘুমান না কান?
অমল জবাব দেয় না। কথা বলতে ইচ্ছে নেই।
-ওষুধপত্র খাইতাসেন তো? দেখি কী কী খাইলেন, হাতে ধরা ফাঁইলটা খুলে পড়তে থাকে। ঠিকই তো আছে। তবে চুপ ক্যান?
এক নম্বরের মিথ্যেবাদী মেয়েটা। ঢং দেখ, ঠিকই তো আছে। ঠিক থাকলে আর ওষুধের ডোজ এত বাড়িয়ে দেয়। প্রত্যেকটি মিল ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ টি ডিনারের সময় ফ্লোর নার্স নিজে এসে দেখে অমল ঠিক মতো খেল কিনা। অমল কি এতই বোকা, কেন আসছে জানে না। চা কি দুধ কি জলে নির্ঘাৎ ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছে। তাই চেক্ করতে এসেছে। ওষুধটা ঠিকমতো অমলের পেটে গেল তো। অথচ অত ন্যাকামির কোনও কারণ নেই। অমল এমন কিছু সাংঘাতিক কাজ করে ফেলেনি। ভীম নামে যে ছোঁকরা তার বাথরুম ঘর বারান্দা সব সাফ করে, যার পুরী জেলায় বাড়ি, যার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই এ পাড়ার বিভিন্ন নার্সিংহোম হাসপাতালে বাথরুম-ঘর বারান্দা সাফ করে, তাকে ধরে অমল বলেছিল,
-তোর নাম তো শকুন।
—না সার আমর নাম ভীমঅ।
-চুপ, ফের মিথ্যে কথা, তোর নাম শকুন। তোর বাপের নাম শকুন। তোর গুষ্টির নাম শকুন।
-আজ্ঞে না সার। আমর নাম ভীমঅ, বাপার নাম—
অমল এক লাফে খাট থেকে নেমে ছেলেটার কলার চেপে ধরে,
-মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাসনি। বস্ তোর নাম শকুন, তোর বাপের নাম শকুন তোর গুষ্টির নাম শকুন। বল্ ব– প্রাণপণে চেঁচাতে থাকে অমল। ছেলেটা হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে, নার্স বয় সবাই ছুটে আসে। অতঃপর ওষুধ, মানে আরও ওষুধ। কদিন বাদে ফ্লোর সিস্টার মায়াদি হাসিহাসি মুখে অমলকে জিজ্ঞাসা করেন,
-আচ্ছা এতগুলো লোকের কি এক নাম শকুন হয় অমল বাবু?
–কেন হবে না? এত প্রাণীর নাম মানুষ না?
-ও আপনি সেই সেন্সে বলছে। তা এদের শকুন কেন বললেন, এরা তো মানুষ আপনার আমার মতো, দুটো হাত দুটো পা।
–ভুল। ওরা কীভাবে বেঁচে থাকে দেখেছেন?মৃতদের মাংস খেয়ে। এ রাজ্যটা জুড়ে শুধু মরা। মরা হাসপাতাল, মরা ব্যবসা, মরা শিল্প, মরা ভাষা। ভাগাড় ঘাঁটছে সব বাইরে থেকে আসা শকুনের দল।
– তা মরাটাও তো জীবনেরই নিয়ম। জন্মিলে মরিতে হবে। প্রকৃতি ব্যবস্থা নেয়, ভারসাম্য বজায় রাখে। তাতে রাগ হবার কী আছে। আমাদের সবই যদি মরে গেছি তা হলে মরা পরিষ্কার করা তো দরকার। আপনি এতে এত ক্ষেপে যাচ্ছেন কেন? উত্তর দেয় না অমল। ভয়ংকর বিরক্ত লাগে ফালতু কথা শুনলে। এদের যেন কিছুই গায়ে লাগে না। মৃত্যু প্রকৃতির নিয়ম। চমৎকার। বলি নিজের মা মরলে কাদিস, না কি কাঁদিস না? আর যেখানে অকালমৃত্যু সেটা কি শোকের নয়? বাঙালির অদৃষ্টে যা কিছু পাবার ছিল সবই কি অতীতকাল? বর্তমানে শুধু আলোচাল আর কঁচকলা। যত্ত সব ন্যাকামি। মাথায় আগুন ধরে যায় অমলের।
পরের দিন সকালে রাউন্ডে এসে ডাক্তার বর্মনের বদলে ডাক্তার মারিক অনেকটা সময় কাটান অমলের সঙ্গে।
-কী হল হঠাৎ মেজাজ আবার খারাপ হল কেন? দিব্যি চমত্তার ছিলেন, অ্যাবসোলিউটলি নরম্যাল। আমরা তো ভাবছিলাম কিছুদিনের মধ্যে ফিরে যাবেন। কী যেন একটা বেশ আনইউজুয়েল নাম আপনার বাড়ির? হা হা মনে পড়েছে, এই তত ফাঁইলেই আছে, বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতি। মানেটা কী বলুন তো? কী চুপ কেন? বাড়িটা বোধ হয় আপনাদের বেশ পুরনো, আজকাল তো বঙ্গফঙ্গ দিয়ে নাম রাখলে লোকে প্যারোকিয়েল বলে। তা কবেকার তৈরি?
-১৯১০।
–মাই গড, বলেন কি। আপনাদের বাড়ি তো সেঞ্চুরি করে এখনও নট আউট।
—মানেটা কিন্তু অমলবাবু এখনও বলেননি, স্যার, মৃদু হেসে সঙ্গের নার্স মনে করিয়ে দেয়। বলে ফেলুন অমলবাবু বলে ফেলুন। আপনার তিন পুরুষের বাড়ি, আপনাকে বলতেই হবে। যেন বাচ্চা ছেলেকে নার্সারি রাইম জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, বলতো সোনামনি জ্যাক অ্যান্ড জিল তুমি তো খুব ভাল বল ওটা তোমাকে বলতেই হবে দেখ এই আংকল আন্টি কাকু কাকী কত শুনতে চাইছে, রাগে মাথাটা কেমন করে অমলের। ইচ্ছে করেই চেপে যায় অমল আসল ঘটনা। গম্ভীর মুখে বলে,
—ইন দ্য মেমোরি অফ বেঙ্গল দ্যাট ওয়াজ ওয়ান্স ব্লেসড় বাই ফরচুন। যে বাংলা একদিন শ্রীময়ী ছিল তার স্মৃতি।
-বাঃ কবিতাটবিতা লেখার অভ্যাস আছে নাকি? না? লিখতে আরম্ভ করুন। ইটস নেভার টু লেট টু স্টার্ট। একটা সময় ছিল সব বাঙালি বাংলায় লেখালেখি করত, বিজ্ঞানী জগদীশ বসু থেকে নেতা সুভাষ বসু। এখন আমরা নিজের মা-কেও বাংলায় চিঠি লিখতে পারি না। সময়ের সঙ্গে সবই পাল্টে যায়। কী বলেন অমলবাবু? সময়কে তো অস্বীকার করা যায় না। মন ভাল করুন। এত চুপচাপ থাকেন কেন? খবরের কাগজ পড়েন? প্রতিদিন কত কী ঘটছে। জানতে ইচ্ছে হয়? উত্তর দেয় না অমল। খবরের কাগজ, বাইরে কী ঘটছে, কী এসে যায় অমলের। এসমস্ত কিছুর মানেই নেই। অমল জানে ডাক্তার তার অনাসক্তিকে অসুখ বলে দেখে। বাস্তবের সঙ্গে যোগ না থাকা কী ভয়ংকর যেন এইচ আই ভি পজিটিভ।
৭. রোগীর অতীত সম্পর্কে
ছায়া দেবনাথের গবেষণা, কেস নং ৯
