-নার্সও, মৈত্রেয়ী রণে ভঙ্গ দেবার পাত্রীনয়। পরশু ট্যাকসি ড্রাইভারকে তো দেখলে, শ্রীমান বংশীধর জেনা।
—তুমি তাহলে নেক্সট ভুবনেশ্বর আসছ সেই বাইশে শ্রাবণ? না এবারে জোর করে কথা ঘোরাতে হয়।
-হ্যাঁ। ততদিনে মা একেবারে ঠিক হয়ে যাবেন।
—কাল তোত মোটামুটি ভালই দেখলাম। অমলের অবশ্যকর্তব্যকর্ম সমাপ্ত, পাঁচ মিনিটের কুশল সম্ভাষণ। অতঃপর সোমবার সকালে ধৌলি। বিদায়, বিদায় কলকাতা, বিদায় জন্মভূমি।
.
ভুবনেশ্বরে ট্রেন পৌঁছল দুপুর দুটোয় আজ বেশি লেট করেনি। এসি চেয়ার কম্পার্টমেন্ট থেকে বেরুতে ঠাঠা রোদ যেন ঠাস করে চড় মারল অমলকে। তবু অনেক ভাল। সামনে পিছনে মাথার ওপরে খোলা আকাশ। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডান দিকের রাস্তায় ঘোরার মুখে সেই পরিচিত ট্রাফিক আইল্যান্ডটা। সুন্দর ছাতার মতো আকারের পরপর দেবদারু গাছ। ছোট ছোট। ঘন সবুজ মসৃণ পাতা রোদে ঝকঝক করছে। বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া সেরে তিনটে নাগাদ অফিস। রাত আটটা পর্যন্ত এসি তে আরাম করে জমে যাওয়া কাজ সারা।
অতঃপর বেরিয়ে সোজা ভুবনেশ্বর ক্লাবের দিকে। কী রাস্তা। বিশাল প্রস্থ, দুদিকে গাছ। কী গাছ কে জানে, তবে আকারে বিরাট এবং ঝকড়া, ডালপালা পাতায় ভরা। এই গরমেও সেক্রেটারিয়েট আর অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল অফিসের বাগানে কিছু না কিছু ফুল ফুটে আছে। বাঁ দিকে যে বিরাট মাঠটা এক সময়ে ছিল সরকারের বিরুদ্ধে সব শোভাযাত্রার গন্তব্যস্থল ও গলাবাজির প্রশস্ত স্থান, সেটি এক মুখ্যমন্ত্রীর বিচক্ষণতায় মনোরম উদ্যানে পরিণত। ইন্দিরা গান্ধী পার্ক। এখন সেখানে গাছলতাফুল আলো, সকালসন্ধ্যায় স্বাস্থ্যান্বেষীর পদচারণা ও শীতের মরশুমে পুষ্পপ্রদর্শনী। যখনই পার্কটির দিকে অমল তাকায় ওড়িয়াদের প্রতি নতুন করে তার শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়। ডানদিকে বাঁক নেয়। রাজপথ, সোজা চলে গেছে রাজভবনে। এ পাড়ায় সব ধ্বজাগজাদের বাস। চওড়া ফুটপাত ও বাড়িগুলোর মধ্যে ছোটবড় গাছের সারি। এখানে শুধু সরকারি বাসস্থান। এক একটি বাড়ির সামনে বিশাল বাগান। ভিআইপিরা থাকেন।
যখন অমল সদ্য ভুবনেশ্বরে পোস্টেড, একবার সারাদিনের কাজে কটক গেছে। দুপুরে কটকের সারকিট হাউসে খাবার বন্দোবস্ত। সেখানে একটু পরেই এলেন এক বয়স্ক বাঙালি ভদ্রলোক, ওড়িশা ক্যাডারের আই এ এস তখন অবসর গ্রহণের মুখে। শান্ত ধীর স্থির ভারি একা। স্ত্রী মারা গেছেন। একমাত্র মেয়ে বিয়ে হয়ে দিল্লিতে। এসব খুঁটিনাটি অমল সারকিট হাউসে ঢুকতে না ঢুকতে অতি কর্মদক্ষ মহিলা ম্যানেজারের কাছে পেয়ে গেছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হতেই জিজ্ঞাসা করে,
–রিটায়ারমেন্টের পর কোথায় সেক্স করবেন?
–কলকাতাতেই ফিরে যাব।
—এখানে বাড়ি করেননি? ভুবনেশ্বরে আই এ এসদের সবতো প্রাসাদের মতো বাড়ি। ভদ্রলোক মৃদু হেসে মাথা নাড়েন, না এখানে বাড়ি করেননি।
-কতদিন হল স্যার আপনার এখানে।
-চৌত্রিশ বছর। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টাই কাটিয়েছি এ রাজ্যে। তাই আজকে এখানে এলাম। এ মাসেই রিটায়ার করছি। কটকেই আমার চাকরিজীবন শুরু। প্রথমে এসে সারকিট হাউসে উঠেছিলাম। না, এই সারকিট হাউস নয়, এটা তো নতুন বিল্ডিং। সামনের দিকে ছিল পুরনো ইংরেজ আমলের চারিদিকে ঘোরানো বারান্দা কাঠের খড়খড়ি দেওয়া বাড়ি। তখন আমি ট্রেনিং-এ। দোতলায় কোণের ঘরে থাকতাম। পিছনের বারান্দা থেকে বিকেলে বসে বসে দেখতাম সামনে মহানদী।
-এতদিনে এখানে কাটিয়ে এখন ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে না? ভদ্রলোক আবার মৃদু হাসেন। ম্লান হাসি।
—হে দেব, হে দেবীগণ আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন। রবীন্দ্রনাথ পড়ি। তিনিই একমাত্র সান্ত্বনা।
এ পাড়াতেই ভদ্রলোকের সরকারি বাসস্থান ছিল। ঠিকানা দিয়েছিলেন, ওড়িশা ছাড়বার আগে অমলের সঙ্গে আবার দেখা হলে খুশি হবেন। নেহাত ভদ্রতা। অমল অবশ্য যায়নি। কবিতাটবিতা আওড়ানো সে বরাবর ভয় পায়। তখনও তো একতা নামে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়া কল্পনায় ছিল না। তবে এ পাড়াতে এলেই ভদ্রলোকের কথা ও কবিতার লাইনটি মনে পড়ে। হ্যালোজেনের উজ্জ্বল আলো ঘন সবুজ গাছ, দুধারে বিস্তৃত বাগান থেকে ফুলের মৃদু সুবাস। এর নাম স্বর্গ। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয় অমল। আঃ কী আরাম। এই জৈষ্ঠের গরমেও।
ক্লাবের চত্বরে অভ্যস্ত কোনায় গাড়ি রেখে ভেতরে ঢোকে। মখমল ঘাসে ঢাকা লন, একদিকে ঘন দেবদারুর দেওয়াল। আধো অন্ধকারে এখানে ওখানে বেঁটে স্তম্ভে জ্বলছে সাদা কাঁচের ঘেরাটোপে আলো। ইতঃস্তত টেবিল চেয়ার কিছু খালি কিছু ভর্তি। উর্দিপরা বেয়ারার ডান হাত্রে তালুতে ট্রেবসিয়ে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা। চারদিকে স্বল্প পরিচিত অপরিচিত সব মুখ। এই হচ্ছে ভদ্রলোকের মতো বাঁচা। গড়িয়াহাট বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতি, কলকাতা একটা দুঃস্বপ্ন। অমল ফিরে আসে তার নিশ্চিত স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে। খাও পিও জিও। মানুষের আর কী চাই।
—আপনার লাইফ হিস্ট্রির আবার ফিলজফি আছে দ্যাখসি। ছায়া দেবনাথ টিপ্পনি কাটে।
—ফিলজফি আর কি। যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।
–সেতো বটেই। কারণ এই জীবনই একমাত্র জীবন, একবার মরে গেলে আর মানুষ এ পৃথিবীতে ফেরে না। যা ভোগ করবার আজই, এখনই।
