এইতো প্রবাসী বাঙালির পারস্পরিক সম্প্রীতির নমুনা। কোনও মতবিরোধই মেনে নিতে পারে না। পান থেকে চুন খসল তো ব্যস সম্পর্কটাই কাটান হয়ে গেল। পাঁচটা বাঙালি একসঙ্গে হওয়া মানেই তিনটে সংস্থা, একের সঙ্গে অন্যের মুখ দেখাদেখি নেই। অবাঙালিরা তো হাসবেই। আর সুবিধাও নেবে। এই সিরকার-পর্বের আগে পর্যন্ত কত কষ্টে অমল একতা-কে এক করে রেখেছিল। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। যাই হোক এবারে বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠা আর শুভম-এর বাংলা নাটক তার ভুবনেশ্বরে শেষ অনুষ্ঠান। খাওয়ার পর মৈত্রেয়ীকে টেলিফোন করে। সত্যি গড়িয়াহাটে ওই ভীড়গরম আর যানজটে কথাবার্তাই হয় নি।
—আচ্ছা সরোজ মিত্তিরের সঙ্গে একবার কথা বললে হত। অবশ্য ওঁর গ্রুপের ম্যানেজারের সঙ্গে আমার শো-এর ব্যাপারে ফাঁইনাল কথা হয়ে গেছে। তবু–
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাকে বলে কার্টেসি কল। মৈত্রেয়ীর গলায় উৎসাহ উপচে পড়ে।
-কাল পরশুর মধ্যে কোন শো থাকলে দেখেও আসা যায়। আমি সরোজদাকে টেলিফোনে ধরি তারপর তোমাকে বলবখন। ওকে বেশি রাতের আগে পাব না। উনি তো সিনেমা-টিভি-সিরিয়েল সবেতেই অ্যাকটিং করেন। শুটিং নিয়ে সবসময় ব্যস্ত। এই তো এখন… মৈত্রেয়ী গরগর করে বলে যায় নাট্যকার অভিনেতা সরোজ মিত্রের বর্তমান দিনপঞ্জী।
–তুমি তো দেখছি খুব জমিয়ে ফেলেছ ভদ্রলোককে, অমল মন্তব্য করে। বছর দশেক আগেও মৈত্রেয়ী যদি অন্য কোনও পুরুষ সম্বন্ধে এতটা ওয়াকিবহাল হত বেশ একটা ঈর্ষা-কলহ মান অভিমানের তরঙ্গ উঠত তাদের স্রোতহীন নিশ্চয়তায়। একটা ফাঁইটিং সিন না হলে জমাটি কাহিনী কি। পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা বাজেনি, মৈত্রেয়ীর ফোন,
—সরোজদার সঙ্গে কথা হল। উনি ও দুদিনই খুব ব্যস্ত, আউটডোর শুটিং-এ যাচ্ছেন। ভারি দুঃখ করছিলেন তোমার সঙ্গে দেখা হল না। আচ্ছা শোনো উনি বলছিলেন যে, তুমি থাকতে থাকতে তো ওঁর কোনও শো নেই তবে ওঁর লেখা একটা নাটক বিজন থিয়েটারে শনি রবিবার অভিনয় হয়। উনি বারবার বলছেন, কাল মানে রোববার আমাদের দেখতে যেতে।
– টিকিট কাটাফাটার ঝামেলা–
—আরে—দুর। উনি তো আমাদের ইনভাইট করছেন। কাউন্টারে বলে রাখবেন। চল যাই দেখে আসি।
অর্থাৎ সে সন্ধেটাও মৈত্রেয়ীর সঙ্গে কথাবার্তা হবে না। অবশ্য বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। গেলেই হয়। অতএব, গেল। নাটক দেখা হল। ঠিক অফিস-ইউনিয়নের ড্রামার মতো নয়। তবে বেশি আঁতলেমিও নেই। গত শতাব্দির বাঙালি অভিনেত্রীর জীবন। কী করে তারা উঠল। নট ব্যাড। তবে অমলের সত্যি কথা বলতে কি হাসির প্লে-ই সবচেয়ে ভাল লাগে। নাটকের পর ফাঁড়িতে ঢাবার দোতলায় খেয়ে মৈত্রেয়ীকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এক ফাঁকে মৈত্রেয়ী প্রশ্ন করে,
–এ দিকে সোজদার সঙ্গে তো সব অ্যারেঞ্জমেন্ট কমপ্লিট। স্ট্যাচুও হাজির। ভুবনেশ্বরে তোমাদের ওদিকে সব ঠিকঠিক মতো এগুচ্ছে তো?
-–হুঁ। চিন্তা করার কিছু নেই। অমল প্রসঙ্গটার মধ্যে যেতেই চায় না।
–আচ্ছা সমতা চ্যাটার্জি সাউথ ক্যালকাটা থেকে দাঁড়ান, তাই না? আজকাল কি খুব ব্যস্ত? পাল্টা প্রশ্ন করে অমল।
-সমতা, মৈত্রেয়ী হেসে ফেলে, এক কাজ করলে হয় সমতাকে নিয়ে চল না প্রধান অতিথি করে। সবাই একেবারে বোমকে যাবে। ওড়িয়াদের শক থেরাপি। ওতো হাত পা ছুঁড়ে দাবি করবে বাইশে শ্রাবণ ছুটির দিন করা হোক। সমতার বক্তৃতা তো। আর সিপিএম রবীন্দ্রনাথের কী কী অসম্মান করেছে তার ফিরিস্তি পাওয়া যাবে। তা ক্ষতি কি। তোমার একতাতে ভর্তি কংগ্রেসি।
–দুর। ঠাট্টা করি না। আমি অন্য একটা ব্যাপারে ওঁর কথা ভাবছিলাম। আজকাল কী বলছেন, মানে ওঁর লেটেস্ট কী?
-ওমা জানো না? সামনের নভেম্বর ডিসেম্বরে নাকি বামফ্রন্ট সরকার কলকাতায় হকার উচ্ছেদ করবে। আমাদের সমতাদি হকারদের পক্ষে। এই তো রোজ পথসভা মাঠসভা চলছে। গতকাল গড়িয়াহাটে শুনলে না?
—আর বল না। একেই লোকের ভীড়ে দমবন্ধ হয়ে আসে তার মধ্যে আবার পথসভা। পথ কোথায় বাকি আছে ওখানে।
–আরে ওর মধ্যে। ওইতো ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি দোকানটার সামনে হচ্ছিল।
-কলকাতাতেই এসব চলে। ভুবনেশ্বরে তো সব ও ধরনের স্টল দুদিন যেতে না যেতে মেরে তুলে দেয়। কেউ কিস্যু করতে পারে না। বড়জোর একদিন বন্ধু। তা দে, তোদেরই ক্ষতি সরকারের কী। ওড়িয়ারাই ঠিক করে। দেখ তো ভুবনেশ্বর কেমন চমৎকার পরিষ্কার ঝকঝকে শহর।
-আর এদিকে যাদের মেরে তুলে দিচ্ছে তারা যাচ্ছেটা কোথায়? ভোট দিলেই যেখানে রাস্তায় যা খুশি তাই করা যায় সেখানে। তোমাদের সত্যনগর-এ স্টল ভাঙার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পত্রটি প্রাক্তন স্টল মালিকরা সেই লম্বা-চওড়া মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ধরালো কোথায়,
কলকাতায়। সত্যি ওদের হাতে বেগুনি ফুলুরি আলুরচপ না খেলে কি আমাদের আশ মেটে, না কি গাঁটের পয়সা খরচ করে সুন্দর ঝকঝকে শহর ভুবনেশ্বর না দেখলে প্রাণ জুড়োয়। আমরা যে সব উদার বাঙালি!
-তুমি সেই টিপিক্যাল কলকাতার বোং রয়ে গেলে। অমল মৃদু অনুযোগ করে, তোমাদের এরকম মেন্টালিটির জন্যই আমাদের বদনাম। ওড়িয়ারা কত উন্নতি করেছে। জান? বিদ্যাপীঠ ফিঠ পেয়েছে। আই এ এস তো সব ওরাই। এ ছাড়া ইঞ্জিনিয়র উকিল ডাক্তার পাবলিক সেকটর একজিকিউটিভ ছড়াছড়ি।
