-বলো দেখি কোন রাজ্য থেকে এত নার্স আসছে?
–কেরালা?
—মোটেই না। তোমার উড়িষ্যা। সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের নার্সগুলো নাকি রয়ে যাচ্ছে।
অমল অবাক। তার ধারণা ছিল ওড়িশা থেকে গত কয়েকশবছর ধরে যে অবিরত কর্মপ্রার্থীরা বাংলায় আসেন তাদের সকলে না হলেও অন্তত সিংহভাগ অতি দরিদ্র ভূমিহীন নিম্নবর্গের মানুষ। এরা তো দিব্যি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। আজকে বংশীধর জেনার সঙ্গে সাক্ষাতে সামাজিক রূপান্তরের মানচিত্রটি যেন আরও সুস্পষ্ট।
–সার, সিআইটি দিয়ে শিয়ালদা হয়ে যাব?
–না, না বাইপাস ধর।
–তাহলে ভিআইপি উল্টোডাঙা হয়ে হাতিবাগানে আসতে হবে। সেখান থেকে—
–ঠিক আছে ঠিক আছে তাই চল। শেয়ালদায় এখন প্রচণ্ড জ্যাম হবে।
যেতে যেতে বংশীধর জেনার সঙ্গে আলাপ চালায় অমল। ওড়িশার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর যুবক এখন দক্ষিণ কলকাতার বস্তিগুলোতে, মনোহরপুকুর থেকে গড়িয়া। এক একটি ঘরে চার কি পাঁচজন মাথাপিছু ভাড়া একশো। খায় হোটেলে, সেটাও অনেক ক্ষেত্রে নিজের দেশের লোকের। এর ওর কাজে নিয়মিত বদলি খাটে। সকলেরই লক্ষ্য কোম্পানি বা কোনও কর্পোরেশনে স্থায়ী চাকরি। সেটা কারও নেই। সবাই প্রাইভেট, অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি বিশেষের গাড়ি চালায়। তাও নিজেদের মধ্যে পালা করে।
—পালা করে কাজ কর কেন? এক জায়গায় পার্মানেন্ট করলেই তো ভাল।
–রেট বাড়াতে হবে।
–কী করে রেট বাড়াও?
—যেমন ধরুন, অক্ষয়সাহু বারশ টাকার কাজ পেল। ও দশ-পন্দর দিন কাজে গেল। তারপর ছুটি নিল। বদলি পাঠাল রবি বেহুরাকে। রবি দুদিন গেল, তারপর দুদিন গেল না। মালিক এদিক হয়রান হচ্ছে। রবি তিন দিনের দিন হাজির। গম্ভীর মুখে বলল সে বদলির কাজ করিব নি, মাস-মাইনেতে করি পারে। বেশির ভাগ জায়গায় সাহেব কহন্তি, ঠিক অছি, কর কত চাই। তখন রবি রেট বঢ়ায় পরশ চায়। দরাদরিতে চৌদ্দশ। কদিন চালায়। আবার কামাই। এবার আসিব শংকু। শংকর মহান্তি। সে ভি চৌদ্দশ পাবে। মানে দুজনের রেট চৌদ্দশ হয়ে গেল।
-তোমার সেই অক্ষয় সাহুর কী হল? তার তো কাজ রইল না।
–থাকবে না কেন। সি এ পরা আউ কাহারো বদলিরে যাইচি। সেইঠি রেট বাড়াচ্ছে।
—তা তোমরা গোড়া থেকেই তো পনেরোশো কি আঠারোশো যার যা পোষায় বললে পার।
–সোজাসুজি কেই দিবনি। একেবারে বাজে কথা। অমল জানে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশানে দৈনিক হিসাবে ড্রাইভাররা ভাড়া খাটে আট ঘণ্টায় সত্তর টাকা। আসলে এরা কৌশলঅনা করে বাঁচতে পারে না। কি কর্মে কি চিন্তায়, সর্বদা সর্বত্র ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জীববিশেষের মতো আঁকা বাঁকা পথে এদের আনাগোনা। অফিসে রোজ দেখে কেউ যদি একদিন ক্যাজুয়ের লিভ চায় তার জন্য ঘণ্টাখানেক ধরে হাজারটা ছুতো দেখাবে। স্ত্রীর-মা বাবার-ছেলেমেয়েদের যায়-যায় অসুখ ও তার বিস্তারিত ইতিহাস। নিবিতো একদিনের সি এল, তোর প্রাপ্যেরই মধ্যে। অত ধানাই পানাই কি। স্বাভাবিক প্রবণতাই কপটতা।
—তা তোমরা বিয়েটিএ করলে বউ ছেলেকে কোথায় রাখ?
—পিলাপিলি গায়ে থাকে। আমরা সব বিহারীদের মত তিনিমাসঅ চারিমাসঅ গাঁ-এ চলে যাই না। চারি ছদিন কি বড়জোর পর দিন মাসে। অন্যেরা বদলি করে দেয়। জমি চাষঅর ভি সেআ করে।
সব পালা করে নিজেদের মধ্যে। অর্থাৎ চাকরির শর্ত-স্থায়িত্ব-বেতন-ছুটি সব কিছু মালিকের সম্পূর্ণ অজান্তে একটি পুরো নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত। এই জন্যই অমল ওড়িয়ালের প্রশংসা করে। এদের পারস্পরিক সহযোগিতা শুধু রক্তের সম্পর্ক বা গাঁয়ের ভিত্তিতে নয়, ওড়িয়া হিসাবে জন্মের জন্য। আর বাঙালিদের?
প্রতিটি ক্ষেত্রে একটিই চিন্তা, কী করে অন্য একজন বাঙালিকে ল্যাং মারবে। নিজভূমে তো বটেই প্রবাসেও। এই তো একতার মধ্যে কি কম খাওয়াখেয়ি। অমল থাকা সত্ত্বেও। বছর দুয়েক আগে বাঙালি মেয়েদের কাজ চাই কাজ চাই শুনে শুনে বিরক্ত অমল প্রস্তাব করল একতার একটা লেডিজ উইং খোলা হোক, সকলেই রাজি। স্ত্রীদের উপচেপড়া এনার্জিতে স্বামীরা তো বরাবরই ভীত। একটা চ্যানেলে বের করে দিতে পারলে সকলের শান্তি আর একতারই শাখা, অতি নিরাপদ, সংস্কৃতি নিয়ে থাকবে। চেয়ারপারসন হলো ইন্দ্রাণী, যার স্বামী জয়ন্ত সরকার (ইংরিজি বানান লেখেন এস আই আর সি এ আর, সিরকার)। ভদ্রমহিলা স্মার্ট, কনভেন্ট ইংরিজি বলেন। বাংলাও সুন্দর। তাঁর পরিচালনায় বেশ চলতে লাগল নানা রকম অনুষ্ঠান, বাচ্চাদের বসে আঁকা, মহিলাদের ক্যালোরিশুন্য রান্নাবান্না, উঠতি বয়সিদের জন্য কুইজ-ট্যুইজ। হলে হবে কি, দুদিন যেতে না যেতেই স্বমূর্তি প্রকাশ। প্রচণ্ড ইগো। পুজো উপলক্ষে ইনহাউস প্রোগ্রামে মেম্বারদের বাচ্চাদের কী নাটক করবে সে বিষয়ে মৈত্রেয়ী দুটো কথা বলেছিল—যেমন বরাবরই করে, এ বিষয়ে ওর চেয়ে ভাল আর কে জানে—ও বাবা, একেবারে কেউটে সাপের মতো ফনা তুলল ইন্দ্রাণী সরকার (ইংরিজি সিরকার)। কে মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী, উনি তো কলকাতায় থাকেন, একতার সদস্য পর্যন্তনন। তিনি কিনা লেডিজউইং-এর প্রেসিডেন্ট ইন্দ্রাণী সরকার (ইংরিজি সিরকার)-এর উপর ছড়ি ঘোরাতে এসেছেন ইত্যাদি। ব্যাপারটা এতদূর গড়াল যে শেষ পর্যন্ত জয়ন্ত ও ইন্দ্রাণী সরকার (ইংরিজি সিরকার) ছেড়েই দিল একতা। আর তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল অরুণ-মিতালী ও নিশীথবাঁশরী। অর্থাৎ ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদম্পতিরা।
