বিনা বাক্যব্যয়ে সবচেয়ে কাছের দোকান আপার ক্রাস্ট থেকে একটি কেক কেনে অমল। খেতে কেমন হবে কে জানে, দামে অন্তত বনেদী পার্ক স্ট্রিটের ফুরিজকে ধরে ফেলেছে। প্যাকেটের বোঝা হাতে দুজনে ট্যাক্সিতে ওঠে, রাস্তায় মৈত্রেয়ীকে নামিয়ে দিয়ে যাবে। না, আজ আর তার বাড়িতে বসবে না। বসাটা এমনিতেই কোনওদিন প্রীতিপদ নয়। পরিবারের পরিবেশে অমলের কেমন অস্বস্তি হয়। মৈত্রেয়ীর ছেলে যখন ছোট ছিল তখন পুজো-জন্মদিন ইত্যাদিতে বিধিমতো উপহার হাতে হাজির থেকেছে। প্রায়ই জামার মাপ ঠিক হয়নি, রঙচঙে মোড়ক খুলে দেখা গেছে খেলনাটা বার্বি ড (অমলের দোকানে গিযেএত বছরের বাচ্চার জন্য এত দামের মধ্যে ভাল কিছুদিন তোবলার ফল)। মৈত্রেয়ীর বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন তার সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তাই বলতেন না। মা তবু ওরই মধ্যে একটু ভদ্রতা বজায় রাখেন। কিন্তু আজ কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। বালীগঞ্জ ফঁড়ি ছরাস্তার মোড় এবং বলাবাহুল্য বিশাল যানজট। ঘামে অমলের সার্টটা পিঠের সঙ্গে চেপ্টে গেছে। একদিকে মিনিবাস, অন্যদিকে মারুতি জিপসি, মাঝখানে অমলদের অ্যামবাসাডার ট্যাক্সি। জৈষ্ঠ্যমাসের সন্ধ্যা। পড়ন্ত রোদে তাতা ঘরবাড়ি রাস্তা, সঙ্গে অসংখ্য গাড়ির চালু ইঞ্জিনের তাপ। যেন নিঃশ্বাস ফেলা দায়। অমল ভাবে কলকাতাবাসীদের মরার পর স্বর্গলাভ সুনিশ্চিত। নরক ভোগ তো এখানেই হয়ে যাচ্ছে। মুখ ফস্কে বলে ফেলে,
-উঃ এশহরটা একেবারে বাসের অযোগ্য। ভুবনেশ্বরে ফিরতে পারলে বাঁচি। মৈত্রেয়ী কলকাতার হয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করার আগে হঠাৎ সামনে থেকে ড্রাইভারটি বলে,
—আপনি ওড়িশার লোক? উচ্চারণ ওড়িসারঅ লোকর।
—প্রায় তাই বলতে পার। তোমার দেশ তো ওড়িশা মনে হচ্ছে। কোন্ জেলা? কটক না বালেশ্বর?
—আজ্ঞে ঢেনকানল। জানেন ঢেনকানল ডিস্ট্রিক্ট?
–জানি বই কি। তা তোমার নাম কী? কতদিন ট্যাক্সি চালাচ্ছ কলকাতায়?
–আজ্ঞে, বংশীধর জেনা। ট্যাক্সি আমার নয়। বদলিতে চালাচ্ছি। তবে লাইসেন্স তিন বছরের। বাংলা উচ্চারণে ওড়িয়া টান প্রকট।
–থাক কোথায়? ভবানীপুরে ওড়িয়াপাড়ায়?
–না, গড়িয়া। ওখানে ঢেনকানলের অনেক ছেলে আছে। –তাই নাকি। কত?
–বহুৎ। হজার হজার।
–বটে! কী করে তারা সব?
–এই ড্রাইভারি।
অন্য রাজ্যের হাজার হাজার যুবক কলকাতায় গাড়ি চালাবার লাইসেন্স পায়। হবেও বা। বেঙ্গলে সিপিআইএম-ই বল আর কংগ্রেস-ই বল, বাঙালি ছেলেদের মুখের অন্ন কেড়ে নিতে সকলে এক। এই না হলে আর হারামির জাত বাঙালি।
—তা তুমি কটক ভুবনেশ্বর রুড়কেল্লা না গিয়ে কলকাতায় আছ কেন? ওসব জায়গায় তো ড্রাইভারের খুব অভাব। বিশেষ করে ভুবনেশ্বরে।
—এখানে ছোটকাল থেকে অছি। ওড়িশার কিছি জানি না।
—প্রথমে কী কাজ করতে?
—এই টুকটাক। গ্যারেজে কাজ শিখেছি। আসলে আমর বাপ এখানে, তাই।
–বাবা কী করে?
–তেলেভাজা দুকান।
দুপুরুষে দিব্যি উঠেছে শ্রীমান বংশীধর জেনা। দেখতে দেখতে গড়িয়া উৎকল সমাজের কেষ্ট বিষ্ণু হয়ে যাবে। আর এদের অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তিভূমি যে মাটি তার কী হাল করে রাখছে! মনিঅর্ডার তো চলে যাচ্ছে পরিবারে, নিজের গাঁয়ে, অন্য রাজ্যে। খায় দায় পাখিটি বনের পানে আঁখিটি।
ট্রাফিক সিগন্যাল বদলায়। সামনের গাড়িগুলো চলতে শুরু করেছে। বংশীধর জেনাও স্টার্ট দেয়। মৈত্রেয়ী এতক্ষণ নির্বাক শ্রোতা। এখন রাস্তা বাড়ায়।
—ডানদিকে।
পরদিন সন্ধ্যায় কোথায় দেখা হবে, ডিনার কোন রেস্টুরেন্টে ইত্যাদি ঠিক করে মৈত্রেয়ীকে বাড়ির দরজায় নামিয়ে দেয়।
—মাসিমাকে বলো আজ আর দেখা করতে পারলাম না। কাল আসব।
মৈত্রেয়ী ঘাড় নাড়ে। ঠোঁটের কাছটা যেন একটু শক্ত হল। সত্যি অমলের উচিত ছিল নেমে অন্তত পাঁচ মিনিট মৈত্রেয়ীর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলা। ভদ্রমহিলার শরীর ভাল নেই। কিছুদিন আগে মধ্য কলকাতার একটি নার্সিং হোমে ছিলেন কদিন। কী যেন অপারেশান হল, অমলের ঠিক খেয়াল নেই। এসব ডাক্তারি ব্যাপার-স্যাপার আবার তার মনে থাকে না। তবে মৈত্রেয়ীর নার্সিং হোম সমালোচনাটা ভোলেনি, পয়সার শ্রাদ্ধ, ডাক্তারদের বেআক্কেলে ব্যবহার নার্সের অভাব ইত্যাদি। আসলে এই নার্সের প্রসঙ্গতেই অমলের মনে পড়ে যায় মৈত্রেয়ীর মায়ের অপারেশানের কথা। নার্সগুলো সবই অল্পবয়সি, আনাড়ি একেবারে কিছু জানে না। নালিশ করতে মেট্রন জানিয়েছিলেন তিনি নিরুপায়। সব সাবস্ট্যান্ডার্ড নার্স জেনেশুনে রাখা হয় কারণ পশ্চিমবঙ্গে নার্সি পড়া এত কঠিন, এত কম মেয়ে নার্সিং-এ ঢুকতে পারে, এত প্রতিযোগিতা যে প্রচুর বাইরের রাজ্যের নিম্নমানের মেয়েরা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। দুঃখ করে বললেন, দেখুন বাইরের কি ভেতরের সেটাতো কোনও কথা নয়। আসল হচ্ছে সার্ভিস, সেটা ঠিক দিতে পারছে কি না। এরা নিজেদের রাজ্যে কিস্যু শেখে না খালি সার্টিফিকেট ধরে আসে। এখানে আমরা হাতে ধরে একেবারে বেসিক থেকে শেখাই। বললে বিশ্বাস করবেন না রোগীর বিছানার চাদর বদলাতে পর্যন্ত জানে না। অথচ যেই নিজেদের স্টেটে একটা পোস্ট খালি হয়, অমনি ব্যস চম্পট। আরেক আনাড়ি আসে তার জায়গায়, আমরা আবার তাকে শেখাই। এইভাবে কী সার্ভিস আমরা আপনাদের দেব বলুন? মৈত্রেয়ীর এত পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণের একটি কারণ ছিল। সব বলেটলে প্রশ্ন,
