কী নেই এই চারমাথায়। দুনিয়ার ভোগ্যপণ্যের পশরা। চামড়া-সোয়েড ফোমের ভ্যানিটি ব্যাগ, স্লিং ব্যাগ পার্স, চট ও পাটের ক্যারিব্যাগ বিগশপার, সর্ববিধ রঙের শাড়ি ফলস্ প্রসাধন কেশবিন্যাসের অজস্র প্রকরণ, ধাতু পাথর প্লাস্টিক টেরাকোটার কস্টিউম জুয়েলারি, শোওয়ার পোশাক বাড়ির আটপৌরে হাউসকোট, সালোয়ার কামিজ, দোপাট্টা, সায়া ব্লাউজ ব্রা, বাচ্চাদের বাবাস্যুট, ফ্রক, সোফাসেট টিভি-রসুচিশিল্পশোভিত বা লেসের ঢাকনা,কমদামি শাড়ি ধুতি, ব্লাউজের কাটপিস, লম্বাহাতা ছোটহাতা সুতি তত টেরিভয়েল টেরিসিল্কের প্লেন কাজ করা ছাপা কথাচ্চি বিভিন্ন রকমের পাঞ্জাবি সুতি টেরিট, প্লেন আলিগড়ি পাজামা, বিভিন্ন বয়সের বাচ্চা ছেলেদের সেলাই করা ধুতি ও মানানসই পাঞ্জাবি, বালিশের ওয়াড় বিছানার চাদর ঢাকা ভোয়ালে,নারী ও পুরুষের ভিন্ন সাইজেরকমারি সুতি-সিনথেটিক তোয়ালে, রুমাল, চটিজুতো, হাওয়াই, গ্লাভস্, মোজা, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, প্যান্টি, ভাঙে বা ভাঙে না, আটপৌরে বা শৌখিন কাপডিশ, বাটি, চায়ের সেট, ডিনার সেট, ফুলদানি, অ্যাশট্রে, কাঁচের গেলাস, স্টেনলেস স্টিলের কাঁটাচামচ, হাতা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয়, শুধু সাজানোর হাজারটা টুকিটাকি। লোহার সাঁড়াশি থেকে টেরাকোটা গণেশ।
পুরনো বইয়ের স্টলগুলোতে ভাড়া খাটছেরুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ-চেজ কার্টার-ম্যাকলিন্স ব্যাগলে ও রগরগে উত্তেজক রবিনস-কলিনস্-শেল্ডন-আর্চার বা বিলিতি সাময়িক পত্রিকা—টাইম, নিউজ উইক, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি; অন্যত্র ছোটদের নতুন বাংলা বই—বড়দের জন্য নতুন বাংলা প্রায় নেই। এদিকে সার বেঁধে ফলের দোকান, কাঁচা বাজারের দিনগত ময়লার স্তূপ, কয়লার ভোলা উনুনে গরম গরম তেলে ভাজা ও চা। অপর ফুটপাতে একসারি স্ন্যাক্স বারে জ্বলছে গ্যাস, হাতে তৈরি মটন-চিকেন এগরোল, ফিশফ্রাই, ভেজিটেবল চপ বা চাউমিন। যেখানে খাওয়া সেখানেই ফেলা উচ্ছিষ্ট। মুখোমুখি জমিয়ে বসেছে বয়মে পলিথিনের সারি সারি আচার। একপাশে ফুল, সবুজ পাতার ঝোপে লাল-হলদে গোলাপকুঁড়ি, সিঙ্গল-ডবল সাদা রজনীগন্ধার গুচ্ছ, ছানারজল যুঁইয়ের বৃত্তাকার গোড়ে মালা।
ভটভট ভটাভট চলছে জেনারেটর। ডিজেলের কালো ধোঁওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে অভিজাত দোকানঘরগুলির শীততাপ যন্ত্র থেকে নির্গত গরম হাওয়া। পথচলতি বাস-ট্যাক্সি ইত্যাদির স্বাস্থ্যবিধিকে কলাদেখানো ডিজেল-পেট্রোলের পোড়া গ্যাসে সম্পূর্ণ পরাস্ত মাটনবোল আচার গোলাপের জীবন-মুখী সম্ভার। ইন্দ্রিয়ের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণ আসছে রাস্তার দিকে পিঠ হকারদের স্টল ও আরোহীহীন স্থিতু গাড়িগুলোর মাঝখানের সামান্য একান্তে স্বল্পপরিসর নালায় রিকসাওয়ালা কুলীব্যাপারী পথচারীদের দিনভর মূত্রত্যাগের ঝঝ, যার কাছে হার মানে ট্রামবাসে ভিড়ঠেলা জনতার গায়ের ঘাম। শুধুহার মানেনা একটি ফুটপাতের মাথায় পথসভার কানফাটানো চিৎকার—অদূর ভবিষ্যতে হকার-উচ্ছেদ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে গরম গরম বক্তৃতা।
অনুভূতির ওপর সর্বাত্মক আক্রমণে অমল দিশেহারা। তবে তার পথচলার সমস্যা নেই। জনতার অবিরাম স্রোতে ভেসে থাকলেই হল। আপনিই এগিয়ে যায়, প্রায় বিনা চেষ্টায়। বিউটি সেলুনচর্চিত যে মৈত্রেয়ী অমলের দিদি বউদি বোনেদের তুলনায় আধুনিক ও ফ্যাশনদুরস্ত, তার কিন্তু দুর্গন্ধে-গরমে ভিড়ে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। একেবারে ইন্দ্রিয়বিজয়িনী বৈদিকযুগের নারীঋষি। সার্থকনামা মৈত্রেয়ী যার কাছে পার্থিব সংশ্রব তুচ্ছ। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ভিড়ের অগ্রগামী স্রোতকে অনায়াসে ব্যাহত করে সোৎসাহে তার দরাদরি চলছে। সালোয়ার কামিজ হ্যান্ডব্যাগ-কুইজবুক।
–ছেলেদের জন্য কিছু উপহার কেনা যে কী শক্ত। একটা কাজ করো না। প্রত্যেককে আলাদা কিছু না দিয়ে সকলের জন্য একটা বড় কেক বা এক বাক্স রকমারি পেস্ট্রি নিয়ে যাও না। কাছেই আছে আপার ক্রাস্ট হটব্রেড মংগিনি। তোমাদের পাড়ায় বোধহয় ওসব তেমন পাওয়া যায় না।
দক্ষিণ কলকাতার আধুনিক আভিজাত্য সচেতন মৈত্রেয়ীর কাছে অমলের পরিবারের সব খামতি সেকেল আউটডেটেড উত্তর কলকাতার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, সঁকড়ি নীলষষ্ঠী থেকে গামছাকলতলা। অমল অবশ্য কোনওদিনই তর্কবিতর্কে যায় না। সর্ববিষয়ে দক্ষিণের শ্রেষ্ঠত্বে তার নিজেরও বিশ্বাস, শুধু মিষ্টির দোকান ছাড়া। এই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে জরুরি গড়িয়াহাট থেকে নিষ্কৃতি। উচ্চ মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনচর্যার পীঠস্থানের যদি এই ছব্বা তাহলে সনাতন হাতিবাগান শ্যামবাজারে তো পা ফেলাই যাবে না। মৈত্রেয়ী যেন তার মনের কথা বুঝতে পেরেই বলে,
-এখানে আর কী ভিড় দেখছ। গত বছর পুজোর সময় স্কুলে পাঁচজন বলল চলুন মৈত্রেয়ীদি একসঙ্গে পুজোর বাজার করি। নর্থ ক্যালকাটায় তাঁতের শাড়ি সায়াব্লাউজ সব এই সাউথের চেয়ে সস্তা। একদিন কষ্ট করে চলে যাই। গেলাম আমরা জনা চারেক হাতিবাগানে। বিকেলবেলা। সেদিন আবার কী কারণে ট্রামগুলো দাঁড়িয়ে গেছে, ইলেকট্রিক লাইনে গণ্ডগোল। এদিকে সিনেমা ভেঙেছে। রাধা মিত্রা মিনার থেকে পিলপিল করে লোক বেরুচ্ছে। রাস্তায় পর পর ট্রাম, বাকি জায়গায় হকারদের স্টল। সে এক ভয়াবহ অবস্থা। শেষে কী করলাম জানো? একটা খালি ট্রামে উঠে বসে রইলাম। ভীড় কমলে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যে যার বাড়ির দিকে। পুজোর বাজার মাথায় উঠল।
