—তোর আর কোনওদিন জ্ঞানবুদ্ধি হল না। ইউ এস এ একটা মেলটিং পট সেখানে ইয়োরোপের ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষ গেছে বটে, কিন্তু কয়েক জেনারেশানে সব মিলেমিশে এক। সবাই ইংরিজি বলে, লেখে। নতুন দেশ, তাই অতীতটা ধুয়েমুছে শুরু করতে পেরেছে। আর আমরা যে যার জায়গায় কত শত বছর ধরে আলাদা ভাষা আলাদা কালচার নিয়ে আছি। আমাদের অবস্থাটা তো অন্য। ওড়িয়ারা বাঙালি লেখককে অতটা সম্মান দিতে রাজি না হতে পারে। তাদের সে অধিকার আছে। সবচেয়ে বড় কথা তুই এ সব ফালতু ঝামেলায় আদৌ যাস কেন? তুই আর কদিনই বা ভুবনেশ্বরে থাকবি, তোর তো বদলি বহুকাল আগেই হবার কথা। ঠেকিয়ে রেখেছিস কলকাঠি নেড়ে। ওসব একতা ফেকতা ছেড়ে ঠিক মতো চাকরি ক। সংসারি হ। এত বয়স হল এখনও স্থিতু হলি না….
এইবার অতিপরিচিত রেকর্ডের কেটে যাওয়া জায়গাটা, মৈত্রেয়ী প্রসঙ্গ। ওখানেই আটকে যাবে, চলবে আপসোস উপদেশের চিরন্তন পুনরাবৃত্তি। অমল উঠে পড়ে। আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। পাড়ায় বেরোয়। নেতাজী ব্যায়ামগারে ছেলেদের সঙ্গে কী-রে কেমন-আছিস করা যাক।
-এই যে অওঁলদা কদ্দিন বাদে। আবনি তো দাদা আঙাদের ভুলেই গ্যাচেন,
—আওঁরা ভাবছি আঙাদের অওঁলদা ও দেসে বাড়িফাড়ি কোরে বসে গিয়েছেন,
—সেসমেস বাংলাফাংলা ভুলে আঙাদের অওঁলদা উড়ে ভাসা বোলবে রে…
-আরে দূর। কোম্পানির চাকর। কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম বুঝিস না। যতদিন যেখানে রাখবে ততদিন সেখানে থাকার মেয়াদ। একি আমার হাতে।
—তা অওঁলদা, দেসূসে আর ফিরবেন না?
—কে বলেছে ফিরব না। তোরাও যেমন। জন্মভূমি বলে কথা। বঙ্গলক্ষ্মীতে আরম্ভ, বঙ্গলক্ষ্মীর কোলেই শেষ।
-হা হা হা। বেস বোলেচেন মাইরি।
অমল অবশ্য ইচ্ছে করেই কলকাতায় স্থায়ীভাবে ফেরার কথাটা বলে। যদিও জানে সেটা স্তোকবাক্য মাত্র। হাওড়া থেকে বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতিতে আসতেই অমলের অবস্থা কাহিল। এ শহরের যা ছব্বা। ছেলেগুলোকে তো আর সে কথা বলা যায় না। এদের সে জানে এতটুকু বয়স থেকে। সব ঝড়তিপড়তির দল। কোনওক্রমে স্কুলের চৌকাঠ ভিঙিয়েছে কি ডিঙোয়নি। দুচারজন কবারের চেষ্টায় পাসকোর্সের বি এ তে ঢুকেছিল, বেরতে পারে নি। এ রাজ্যে যে ধরনের প্রতিযোগিতা তাতে চাকরি এদের নাগালের বাইরে। আর অন্য রাজ্যে তো সেখানকার ভূমিপুত্রের সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার। প্রতিবেশী রাজ্যে এমনও অমল দেখেছে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে সব নিয়মকানুন মেনে একটি চাকরিতে একজন বহিরাগতের নাম ইন্টারভিউর জন্য সুপারিশ করাতে ভাঙচুর মারধোর হয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষিত ও অর্ধ-শিক্ষিতদের স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ এই সোনার বাংলা। অতঃপর অমলকেও বাঙালি সাজতে হয়। সেও একই পাড়ার ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার ব্যাংক ম্যানেজার, বাইরে চাকরি করে ভাল থাকে। মিঠুন চক্রবর্তীর মতো স্টার না হলেও ছোটখাটো হিরো।
—তা তোমরা এখন কার দলে? হেমেনদার না সমতাদির?
তৎক্ষণাৎ নির্ধধায় সমস্বরে উত্তর,
—আর এমেনদা টেমেনদা নয়। ক্ষেপেছেন? এখন সব সতাদিদি। কী ফাঁইটটা দিচ্ছে দিদি দেকেচেন? দিদি না থাকলে সল্লা সিপিএম কবে আঙাদের সেস্ কোরে দিত।
ও তাই হেমেন মিত্তিরের ভুবনেশ্বরে রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে বড়দার এত অনাসক্তি। এরা তো শুধু পড়শী নয়, বড়দার সক্রিয় রাজনীতির কর্মীবাহিনী। বাড়িতে আর অমল মূর্তিপ্রসঙ্গ তোলে না। বিকেলে মৈত্রেয়ীকে নিয়ে বেরোয় দোকান বাজারে। সচরাচর অমলের যাকে যা দেবার মৈত্রেয়ী একাই কেনে। এবারে অমল ভাবল বহুদিন গড়িয়াহাটে বাজার করা হয়নি, কলকাতার সেরা পছন্দসই জিনিস নাকি সেখানেই পাওয়া যায়। তাছাড়া দুজনে একসঙ্গে কিছু একটা করা যাবে। মৈত্রেয়ীর সাগ্রহ সম্মতি।
প্রথমে মায়ের ইঞ্চিপাড় সাদা শাড়ি এবং মৈত্রেয়ীর বহু আপত্তি সত্ত্বেও তার জন্য লাল পাড় কোরা ঢাকাই কাজের টাঙ্গাইল। কেনার পর ঢাকেশ্বরী থেকে বেরুতে না বেরুতে শোনে খুশিখুশি মন্তব্য ২২শে শ্রাবণ ভুবনেশ্বরে রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠার দিন পরা যাবে কী বল। অমল বিনা বাক্যব্যয়ে মাথা হেলায়। দৈনিক খবরের ওড়িয়া প্রতিবেদনটির বৃত্তান্ত মৈত্রেয়ীকে জানায়নি। কী দরকার। মিথ্যে দুশ্চিন্তা। হয়তো আপনি থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো সেরকম গুরুগম্ভীর ব্যাপারই নয়। একতার সদস্যরা মিছিমিছি তিলকে তাল ভাবছে—মাইনরিটি কমপ্লেক্স। ভারি তো একটা ওড়িয়া দৈনিক তাও ওড়িশার সবচেয়ে প্রাচীন সমাজ পত্রিকা নয়। কী বা তার গুরুত্ব, কজনইবা পড়ে। চুপচাপ থাকলে ঘোলা জল আপনি থিতিয়ে যাবে। অতঃপর অমল ভাইপো-ভাইঝিদের জন্য কিছু কেনাকাটার চেষ্টায় লাগে। পায়ে হেঁটে এ দোকান ও দোকান।
সন্ধে সাড়ে ছটার গড়িয়াহাট। আলোয় আলো চারমাথার মোড়। হ্যালোজেন নিয়ন বা। থিক থিক লোক, ছেলেবুড়ো নারী-পুরুষ। অফিস ফেরত মানুষ দোকান বাজারের ক্রেতা ও উদ্দেশ্যবিহীন পথচারী যারা চোখে লাগলে জিনিস কিনবে, খাবার শখ হলে খাবে অথবা কিছুই না করে খানিকটা সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। চারটি দিকে প্রতিটি ফুটপাতের ওপর রাস্তায় সারি সারি পরস্পর মুখোমুখি হকারদের স্টল অর্থাৎ দোকান। দুটি সারির মাঝে আকাশ প্রায় দেখা যায় না। মেঝেতেও ইতঃস্তত বসা কিছু জিনিস।
