ভোরের শহর। রাস্তায় এখানে ওখানে শুকনো পচা শাকপাতা,বাতিল সবজি, গতকালের বেচাকেনার পরিশিষ্ট। প্রচুর তাপ্পি লাগানো এবড়ো খেবড়ো হাওড়ার ব্রিজে বিকৃত মুখ বদমেজাজ ট্যাক্সিড্রাইভারের গাড়ি চালানো পরীক্ষা। এবার গঙ্গার এপারে। দুদিকে শ্রীহীন জরাজীর্ণ বাড়ির সারি। স্পষ্টত আদ্দিকালের ভাড়ায় মালিকের স্থাবর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ বহুকাল ধরে আর লাভজনক নয়। আর ভাড়াটেদের অধিকার প্রচুর, দায়িত্বের পাট নেই। অতএব এখন গৃহগুলি বেওয়ারিশ মালের মতো যদৃচ্ছ ব্যবহৃত।
ফুটপাত জুড়ে পলিথিনে মোড়া হকারের পশরা। এখনও রাতের ঢাকা খোলা হয়নি। মালিকদের অনেকে প্রাতঃকৃত্য সেরে রাস্তার কলে স্নানে ব্যস্ত। বাকিরা ফুটপাতে নির্বিঘ্নে নিদ্রায় আচ্ছন্ন। অমলের ইংরেজভক্ত ঠাকুরদা, জাতীয়তাবাদী বাবা অর্থাৎ যারাই ভারত নামে একটি আইডিয়াগ্রস্ত, তাদের কাছে এরা হয় শিল্পায়নের অবশ্যম্ভাবী ফল, নয়তো গ্রামীণ সমাজচ্যুত অভাগার দল। অমলের চোখে এরা অভিশাপ। এদের চোদ্দোপুরুষ চাষবাস হাতের কাজ কিছুই ভালভাবে রপ্ত করতে পারেনি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এরা আকাশের নীচেই কাটিয়েছে। বরং ইংরেজ এবং আধুনিকতার দৌলতে পাচ্ছে হাতের কাছে কলের জল, জাতপাত থেকে রেহাই, বাঁধানো ফুটপাত। কলকাতার রাস্তা এদের স্বর্গ। আর এঁদেরই জন্য অমলের মতো শহরের আদি বাসিন্দাদের কাছে রাস্তা হয়ে উঠেছে। নরক। আচ্ছা, ছেলেবেলায় তো কই এতটা শ্বাসরোধকারী হয়ে ওঠেনি। হয়তো মনে-মনে ভুবনেশ্বরের কাফকা সবুজেঘেরা চমৎকার চওড়া চওড়া পরিষ্কার রাস্তাঘাট তার কাছে স্বাভাবিক সুস্থ নগরায়ণের মাপকাঠি। দুঃস্বপ্নের নগরী যার জন্মস্থান, প্রবাসেই তাকে বেঁচে থাকতে হয়।
তবু বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতিতে পা দিয়ে কেমন যেন নিশ্চিন্ত লাগে। সরু গলি গায়ে-গায়ে সামনে-পেছনে বাড়ি, সূর্যের অবাধগতি প্রচণ্ড তাপ থেকে সুরক্ষিত। আগেকার তৈরি মোটামোটা দেওয়ালের ঘর, গরম তাতেও খানিকটা আটকায়। তার ওপর লাল সিমেন্টের মেঝে দুবেলা মোছায় ঠাণ্ডা তেলালো। তিন পুরুষের আশ্রয়ে আরাম। তবে পরিবারের বিভিন্ন শাখা বিস্তৃত হয়ে অন্য মাটিতে ঝুরি নামিয়েছে। জ্যাঠারা যে যার নিজস্ব বাড়ি করে উঠে গেছে বহুদিন। হরিচরণ দাস বি এ বি এল যাননি কারণ ভেবেছিলেন আমৃত্যু তার স্কন্ধে জাতীয় কংগ্রেসের স্থানীয় দায়িত্ব ন্যস্ত। ভুল ভাঙতে খুব বেশি বছর লাগেনি। প্রৌঢ়ত্বে আবার ওকালতিতে ফেরবার করুণ প্রচেষ্টা করেছেন।
তবে তিনি যেখানে হেরে গেছেন সেখানে জিতেছেতার বড় ছেলে। জ্যেষ্ঠের উত্তরাধিকার সম্পর্কে অতিসচেতন অমলের বড়দা সুবিধামত ওকালতি এবং রাজনীতি করে। কংগ্রেসের নবতম ফাটলে ফায়দা তোলায় সে সিদ্ধ। মেজদা প্যাথলোজিস্টআর জি কর-এ। সপরিবারে এখানেই বাস। সেজদাও ইঞ্জিনিয়ার পোস্টেড দুর্গাপুরে। দিদি বহুকাল বিবাহিত। প্রতিষ্ঠিত তার সংসারে। বাদ বাকি অমল, তিনতলার একটি ঘর তার জন্য বরাদ্দ। যতদিন মা জীবিত সেখানে তার মৌরসি পাট্টা। প্রায়ই শোনা যায় ঘরটাতো পড়েই আছে। অমল তো ন মাসে ছমাসে দুদিনের জন্য আসে। বুলুবুলা-খুকু-খোকা কারও কাজে লাগতে পারত। মা শুনেও শোনেন না, কখনও বা দেন ঘরখানা খুলে।
তিনতলার ঘরখানায় এসে ছোট ভিআইপি সুটকেসটা রাখে। সেই পুরনো তক্তপোশে বিছানা পাতা। আদ্দিকালের টেবিল চেয়ার বইয়ের র্যাক। ছাত্রাবস্থায় অমল ও তার সেজদার বই থাকত। একদিকে আলনা। তলায় জুতো রাখার ব্যবস্থা। একটা পুরনো সেকেলে আলমারি সেগুন কাঠের। জানালায় স্প্রিং দেওয়া পর্দা একটু ঝুলে আছে। অমল জানে মৈত্রেয়ী এটা দুচোখে দেখতে পারে না। অমলের প্রত্যেকটি বাড়িতে সে হয় কাঠের পেলমেট নয়তো অ্যালুমিনিয়াম রডে রিং দিয়ে পর্দা ঝোলায়। এ বাড়িতে এখনও তা ঢোকেনি।
হরিচরণ দাস বি এ বি এল-এর সন্তান সন্ততি প্রবাসী অপ্রবাসী মিলিয়ে যে যৌথ পরিবার সেখানে বলাবাহুল্য ঐক্য নেই, তবুও কোথাও একটা একাত্মতা আছে। হয়তো পারস্পরিক সমালোচনা তারই একটা রূপ। পুরোপুরি অচেনাকে নিয়ে কারও মাথাব্যথা থাকে না। অমল একেই প্রবাসী তায় অবিবাহিত। অতএব পারিবারিক চিরন্তন ঠাণ্ডাযুদ্ধে তার বর্ম অনাসক্তি যা কোনও শ্লেষ, কোনও ঠেশ দিয়ে কথা ভেদ করতে পারে না। বড়দার মেয়ে কার সঙ্গে রেজিস্ট্রিকরেবসেছে, মেজদার ছেলের এতগুলো টিউটার কোন উপার্জনের পয়সায় রাখা, সেজবউদির সাজপোশাক ফ্যাশান দেখলে কী মনে হয় ইত্যাদি বিষয়ে জোরালো বা মৃদু কোনও গ্রামের আলোচনাতেই অমল নেই।
তবে রবীন্দ্র মূর্তি প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত ওড়িয়া প্রতিবেদনটির কথা অমল বড়দার কাছে পাড়ে। শত হলেও জ্যেষ্ঠ, পরিবারের কর্তা। তাছাড়া রাজনীতি করেন, হেমেন মিত্তিরের সঙ্গে বিলক্ষণ আলাপ। সব শুনেটুনে বড়দা বললেন,
—দ্যাখ রবীন্দ্রনাথের একটা মূর্তি ভুবনেশ্বরে বসল কিনা বসল তাতে কী আসে যায় ব? তিনি তো সমস্ত পৃথিবী থেকে হায়েস্ট রেকগনিশান পেয়ে গেছেন। বাংলায় লিখেছেন, আমরা বাঙালিরা চিরকাল ওঁর লেখা পড়ব। ব্যস। আর কী চাই?
-কিন্তু বড়দা, প্রশ্নটা তো তা নয়। রবীন্দ্রনাথকে তো শুধু বাঙালি বলা হয় না। তার তো ন্যাশনাল ইম্পর্টেন্স আছে। তার লেখা গান ন্যাশনাল অ্যানথেম। আমরা ইন্ডিয়ানরা তো একটা নেশান? অন্তত হতে তো চাই। তাহলে তার মূর্তি ইন্ডিয়ান একটা স্টেট ক্যাপিটেলে থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যেমন ধর ইউ এস এ। সেখানে ইয়োরোপের ভিন্ন ভিন্ন জাতের লোক আছে। কিন্তু সব স্টেটই তো জর্জ ওয়াশিংটন বা আব্রাহাম লিংকনকে ন্যাশানাল ফিগার হিসেবে সম্মান করে। আমেরিকান লেখকও তো সব স্টেটেই সমান সম্মান আদর পান।
