অমল ভাবে উত্তর দেবে টাকাটা কারও না কারও তত লাভ হয়েছে, উবে তা আর যায়নি। অর্থাৎ প্রচুর সংখ্যায় ব্যক্তিবিশেষের সেবা। তা ব্যক্তিকে নিয়েই তো সমষ্টি। এই তত একবার ওড়িশার জঙ্গলে বহু দামি গাছ নির্বিবাদে চোরাগোপ্তা কেটে ফেলা হয়েছে বলে সবাই হৈ হৈ করে উঠলে উচ্চতর পর্যায়ে জঙ্গল বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত আমলা না কি বলেছিলেন, কাটা গাছ তো আর ফেলা যায়নি। জনসাধারণেরই কাজে লেগেছে, এতে ক্ষতি কী হয়েছে। এরকম একটি কৈফিয়ত অমলও তো বম্বে হেড অফিসে পাঠাতে পারে। ফলাফল অবশ্য সুখকর হবে না। যদিও সেই গরিষ্ঠ আমলাটির কর্মজীবনে কোনও দাগ পড়ে নি, শুধু তদানীন্তন মেজাজি মুখ্যমন্ত্রীর স্বভাবসিদ্ধ চলিত ওড়িয়ায় তার বর্ণনাটি সবার মুখে মুখে ফিরছে—লোকটা মাই নুহ কি গাই নুহ অর্থাৎ এতই অপদার্থ যে না মাগী না গাই।
সন্ধ্যায় একতার মিটিং। সকলের একসঙ্গে কথা, উত্তেজনা, রাগারাগি। সব সময় বেটারা কৌশল করছে। আপনি দাদা মিছিমিছি এদের ভাল ভাল বলেন। খবরের কাগজের লোক এত খবর পায় কী করে? সেক্রেটারিয়েটে কে ফাঁস করেছে? নিশ্চয়ই কোনও মতলবে লেখা। রাজধানীর নাগরিকরা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ না ঘেঁচু। এদের জীবনে খাওয়া ঘুম পরনিন্দা ছাড়া আর কিছু আছে…। অমল বাধা দেয়।
—মাথা গরম করে লাভ নেই। শান্ত হও। এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে? একতা একটা সাংস্কৃতিক সংস্থা, তার কার্যকলাপ তো গোপন কিছুনয়। আমরা যে চিঠি গভমেন্টকে দিয়েছি সেটাও কনফিডেনশিয়াল নয়। আলোচনা হতেই পারে।
-সেক্রেটারিয়েটে কত শত শত পিটিশান পড়ছে। কই তার কটা নিয়ে পাবলিক মাথা ঘামায় বলুন তো? না। না, এর ভেতরে গভীর চক্রান্ত আছে।
–রণজিৎ ঠিক বলেছে। আমাদের বেলায় শুধু বদমায়েসি।
—ঈর্ষাও আছে। দেখছেন না লিখছে আমরা নাকি বম্বের আর্টিস্টদের দিয়ে লাখ লাখ টাকা রোজগার করছি!
–নিজেরা কখনও এ স্কেলে ফাংশান করে না তো তাই জানে না হাউ মাচ প্যাডি মেক্স হাউ মাচ রাইস। লাখলাখ টাকা রোজগার! তাও আবার কটক ভুবনেশ্বরে। যেখানে টিকিট বিক্রি করাই দুঃসাধ্য। স্পনসর খুঁজতে হন্যে হতে হয়।
—আগের বারের কুমার ভানুর ধাক্কা সামলাতে ফিয়ারলেসের পায়ে পড়তে হয়েছিল। আর দেখুন আমরা যে একটা ক্ল্যাসিকাল গানেরও ফাংশান করেছিলাম সেকথা দিব্যি চেপে গেছে।
-থামো থামো। এসব কথা আলোচনা করে কী হবে? আমরা বললে বা হিসেব দিলে কেউ বিশ্বাস করবে ভেবেছ? একটা কনস্ট্রাকটিভ কিছু সাজেস্ট কর। কী সুজিত, তুমি তো সেক্রেটারি। তোমার কী বক্তব্য?
-আমার আর আলাদা করে কী বলার আছে। সবাই যা ঠিক করবে, আমারও তাই মত।
উঃ এই ক্যারাদের এত অসহ্য লাগে। জীবনে কখনও মনের ভাব মুখে প্রকাশ করতে পারে না। কিসের এত ভয়, অ্যাঁ? সব সময় জুজু হয়ে আছে। মিটিং-এ প্রতিবাদের খসড়া ঠিক হয়। পরে টাইপ ও ওড়িয়া অনুবাদসহ পাঠানো।
কমাস ধরে অমলের কেমন যেন ক্লান্ত লাগছিল সব সময়। মৈত্রেয়ী বহুবার গজগজ করেছে হবেনা প্রতিদিন চারপাঁচ পেগ হুইস্কি আর ক্লাব হোটেলের খাওয়। এই করবে না সেই করবে না। ডাক্তার দেখাতে হবে। মৈত্রেয়ীর আবার কলকাতার ডাক্তার ছাড়া চলে না। অমল কানে তোলেনি। এই তো কসপ্তাহ বেশ চাঙ্গা লাগছে। হৈ হৈ করে রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠা ও শুভ নাট্যসংস্থার বাংলা নাটকের ব্যবস্থাট্যবস্থায় মেতেছে। কিছু অসুবিধে নেই। আজ হঠাৎ ভীষণ অবসাদ। প্রচুর হুইস্কি খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল রাত আড়াইটে নাগাদ। যথারীতি গলাটলা শুকনো, গা-টা কেমন গুলচ্ছে। চারদিক কী ভীষণ অন্ধকার। হাতেপায়ে জোর নেই, বেড সুইচটা পর্যন্ত জ্বালতে পারছেনা। কেমন দম আটকে আসছে। কী ভয়ানক একা। শোওয়ার আগে ভেবেছিল মৈত্রেয়ীকে ফোন করবে। করেনি, দৈনিক খবর-এ ব্যাপারটা বলার ইচ্ছে নেই। ওর সম্পাদককেও তো কতএকতার কত অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছে। মৈত্রেয়ীর আবার ওকে বরাবর অপছন্দ,
—ধুতি পাঞ্জাবি পরা ওড়িশার উড়ে ঠিক আছে। কিন্তু ওই দিল্লি এলাহাবাদ ঘোরা আলিগড়ি চোস্তপরা উড়ে ডেনজারাস। অমল অনেক প্রতিবাদ করেছে,
—আমি এবারে আলিগড়ি হাইনেক লম্বাঝুল পাঞ্জাবি পরব। আচ্ছা পোশাকে কি আসে যায় বলতো? বেচারিরা একটু স্মার্ট, একটু প্যানইন্ডিয়ান হতে চায়। এতে দোষের কী?
—প্যানইন্ডিয়ান না আরও কিছু। এরাই সবচেয়ে প্যারোকিয়েল। বাইরে বেরিয়ে তো বুঝতে পারে নিজে মালটি কী।
এ ধরনের টিপিকাল বোংমার্কা আলোচনা অমল একেবারে বরদাস্ত করতে পারে না। বাঙালিদের সাধে কি সবাই অপছন্দ করে। একতার সদস্যদের কানে পৌঁছে গেছেদৈনিক খবর-এর কীর্তি, অমলের কাছে টেলিফোন, দেখা হলে জিজ্ঞাসাবাদ। অমল জবাবই দেয় না অথবা ওটা এমন কিছু ব্যাপার নয়, বলে এড়িয়ে যায়। যেন প্রতিবেদনটি বেরোয়নি, যেন কিছুই ঘটেনি, যেন একতার সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লেখা দীর্ঘ প্রতিবাদটি দৈনিক খবর-এর শেষ পৃষ্ঠায় ছোট্ট এতটুকু চোখে না লাগা সংবাদে রূপান্তরিত হয়নি। যেন আমরা সকলে ভাই ভাই, সকলে ভারতীয় ভুবনেশ্বরে চেনাজানাদের কাছ থেকে অমল পালিয়ে বেড়ায়। নিজের কাছ থেকেও।
একটা ব্রেক, একটা চেঞ্জ দরকার। অতএব, জুন মাসের মাঝামাঝি কলকাতা। কদিনের জন্য। মৈত্রেয়ী তো বলেইছিল বৃষ্টি পড়ে ঠাণ্ডা না হলে ভুবনেশ্বর যাবে না। তাছাড়া ওর তো গরমের ছুটিও ফুরতে চলল। মাসান্তে দেখা-সাক্ষাতের চালু রুটিনে এবারে অমলের পালা। সেই পুরী এক্সপ্রেসে হাওড়া পৌঁছনো, ট্যাক্সির জন্য নিত্যনৈমিত্তিক দুটি উপায়ের একটি গ্রহণ—হয় সরকারি ব্যবস্থায় অনন্তকাল লাইনে দাঁড়ানো,নয় বেসরকারি উদ্যোগের দরকষাকষিতে হার-জিত। শেষোক্ত উপায়টিতে অর্থদণ্ড সুনিশ্চিত। কিন্তু এই গরমে শারীরিক কষ্টের রেহাই। অতঃপর কোনওক্রমে একটি লজঝর অ্যাম্বাসাডারে আধভেঁড়া সিটে বসে নিঃশ্বাস ফেলা। কলকাতা প্রত্যাবর্তনে ট্যাক্সি পর্বের অধ্যায়টি সমাপ্ত।
