-সেআ পরা প্লান। শহীদনগরে ঘর দেখুচি। ডেন্টিস্ট্রির ইকুইপমেন্টগুড়া বহুৎ এক্সপেনসিভ। আমে চাকরিয়া লোক, একাবেলে এত্তে টংকা কোউ পাইবা। ভাবুচি জিপিএফরু উঠাইবাকু পড়িব। আউ কণ করিবি।
অমল মনে মনে ভাবে ওড়িশার কজন আমলা ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার সত্যি সত্যি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে ছেলের চেম্বার সাজিয়েছে একবার জিজ্ঞাসা করে। ঢপ মারবার জায়গা পায়নি। মুখে অবশ্য বলে,
—সে তো স্যার করতেই হবে। এটা তো একসপেন্স নয়, ইনভেস্টমেন্ট। কবছর যেতে না যেতে টাকা সুদে আসলে ফিরবে। প্র্যাকটিস একবার জমুক না। ভুবনেশ্বরে তেমন ভাল ডেন্টিস্টকটা?শহীদনগর স্যার ভেরি ওয়াইজ সিলেকশান। প্রাইভেট চাকুরেতে ভর্তি। একতার প্রচুর মেম্বার ওখানে। সব আপনার ছেলের ফিউচার পেশেন্ট..ইত্যাদি।
আমড়াগাছি। মিষ্টি কথা আশ্বাস পেলে চিড়ে ভেজানোর চেষ্টা, শেষে বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ ফর আ ড্রিংকস্যার। অতঃপর পিটিশানটা একটু তাড়াতাড়ি ফরওয়ার্ড করে দেবেন। চিফ মিনিস্টার ইজ ভেরি কীন। ওঁর ইচ্ছেতেই তো স্ট্যাচু করতে দিয়েছি। মোক্ষম অস্ত্রটি ঝেড়ে উঠে পড়ে।
সে তো বেশ কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল এর মধ্যে কোনও খবরাখবর নেই। সাধারণত পট্টনায়েকের কাছ থেকে সপ্তাহে একবার অন্তত টেলিফোন আসে। কণ খবর মিঃ দাস, একতার প্রোগ্রাম কিছি নাহি কি? নিয়মিত ফরম্যাল ডিনারগুলিতে অতিথি, দু-চারবার অমলের বাড়ির পার্টিতেও এসেছেন। উপলক্ষ ছাড়াও আসেন বসেন, কয়েক পেগ হুইস্কি খান। অনেক ভারতীয় ক্ষমতাসীন পুরুষের মতো তারও পছন্দ অন্যের বাড়িতে অন্যের পয়সায় পানভোজন। অমল এসব মাইন্ড করে না। যে পুজোয় যে নৈবেদ্য। তবে এতদিন সাড়াশব্দ নেই দেখে উদ্বিগ্ন হয়নি। বোধহয় কাজকর্মে ব্যস্ত। তাছাড়া যা গরম চলছে। এর মধ্যে অফিস থেকে ফিরে সন্ধেয় আবার বেরুনো রীতিমত শক্ত। সবাই ধুকছে।
—দাদা আজ সন্ধেয় বাড়ি আছেন? একদিন অফিসে সুজিতের টেলিফোন।
-কেন বলো তো?সন্ধ্যায় সচরাচর অমল বাড়িতে থাকে না। ক্লাবে হোটেলে পার্টিতে তার নিমন্ত্রণ লেগেই আছে। সেদিন সামার কুইন সিলেকশান হোটেল স্বস্তিতে, অমল একজন জাজ। ভুবনেশ্বরে সব সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অমল বিচারক। এ নিয়ে একতায় প্রচুর ঠাট্টা তামাসা চালু।
-একটু জরুরি কথা ছিল।
—ঠিক সাড়ে ছটায় এসো। আমি ছটা নাগাদ ফিরে রেডি হয়ে নেব। সাতটায় বেরুব। তার মধ্যে এলে কথা হবে।
-আসব।
সাড়ে ছটার আগেই সুজিত হাজির। বিমর্ষ মুখ।
–এদিকে একটা কাণ্ড হয়েছে। দাদা জানেন কিছু?
—না তো। কী ব্যাপার?
—দুদিন আগে দৈনিক খবরপত্রিকায় ফ্রন্ট পেজ-এ একটা বিশাল প্রতিবেদন বেরিয়েছে একতাকে নিয়ে। দেখেছেন?
—না তো। একতাকে নিয়ে? আশ্চর্য। কই আমি তো কিছু ছাপতে দিইনি।
ওড়িয়া অনেক পত্রিকায় মাঝে মাঝে সংবাদ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট পক্ষের ইচ্ছেমতো ছাপা হয়, বলা বাহুল্য কোনও কিছুর বিনিময়ে। অমল নিজেও একতার অনেক বিজ্ঞাপন খবর হিসেবে এই রাস্তা ধরেই ছাপিয়েছে।
-আপনার ছাপতে দেওয়ার প্রশ্ন উঠছেনা। কাগজের লোকেরাই করেছে। সুজিতের মুখ আরও গম্ভীর।
—ব্যাপারটা কী খুলে বলতো। কাগজটা এনেছ? পড় দেখি কী লিখেছে। সুজিত বগলদাবা করা কাগজটি বের করে খুলে পড়তে শুরু করে দেয়।
ভুবনেশ্বর ২২ শে মে, আম্ভে অতি বিশ্বস্ত সূত্রে জানিঅছু–
—আরে আমি কি তোমাদের ওড়িয়া জানি নাকি। বাংলায় বল মোদ্দা কথাটা কী। অতঃপর ওড়িয়া প্রতিবেদনের বাংলা সারাংশ শোনায় সুজিত।
রাজধানীর একটি অনওড়িয়া সংস্থা রবীন্দ্রমণ্ডপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ওড়িয়া ভাষায় বহু বহু বড় বড় কবিসাহিত্যিক আছেন। তাদের কজনের মুর্তি ওড়িশায়, বিশেষ করে রাজধানী ভুবনেশ্বরে এ পর্যন্ত স্থাপিত হয়েছে? শহরে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি প্রেক্ষাগার আছে সেটাই কি যথেষ্ট নয়? সেখানে আবার তার মূর্তি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা কী? উল্লেখিত অনওড়িয়া সংস্থাটি বম্বে থেকে আর্টিস্ট আনিয়ে হিন্দি ফিল্ম সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করে ওড়িশায় মাটিতে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করছে। এরকম একটি সংস্থার এই মূর্তিস্থাপনের উদ্যোগ কী উদ্দেশ্যে? রাজ্য সরকার যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি স্থাপনে এতই ইচ্ছুক তাহলে কি সরকারি টাকায় সেটি করা যেত না? আমাদের রাজ্য কি এতই দরিদ্র যে অনওড়িয়া সংস্থার দান গ্রহণ করতে হবে? রাজধানীর নাগরিকরা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ যে রাজ্য সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট নীতি নেই ইত্যাদি।
শুনতে শুনতে অমলের মনে হয়, সে যেন একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছে। এখনই জেগে উঠবে, এ সব মিথ্যে হয়ে যাবে। কিছু লেখা হয়নি, কোনও বিরুদ্ধতা শত্রুতা শ্লেষ নেই। সুজিতের সারাংশ পুরো শোনার পরও খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে অমল। বেটা ক্যারা উল্টোপাল্টা অনুবাদ করে অমলকে তাতাতে আসে নি তো।
–দাও দেখি কাগজটা। এটা আমার কাছে এখন থাক।
—আমাদের তো দাদা কিছু একটা করতে হয়।
—একজিকিউটিভ কমিটির মিটিং ডাক। ইমিডিয়েটলি। কালইবসা যাক। একটা প্রোটেস্ট পাঠাতে হবে। তারপর দেখা যাক কী হয়।
অমল আর কিছু বলে না। পরদিন অফিসে পৌঁছে প্রাইভেট সেক্রেটারি মহান্তিকে ডেকে দৈনিক খবরকাগজটি দেয়। প্রতিবেদনটির আক্ষরিক ইংরিজি অনুবাদ চাই। সারাটা দিন আর কাজে মন লাগে না। জরুরি কত কী পড়ে আছে। হেড অফিসের চিঠি। যে সব কোম্পানিকে সরকারি টাকা ধার পাওয়ার উপযুক্ত বলে সে সুপারিশ করেছিল তাদের কশতাংশ ব্যবসায়ে সফল, কটা লালবাতি জ্বেলেছে, কটাইবা জ্বালব জ্বালব করছে তার পুরো হিসেব দিতে হবে। সে পাবলিক সেক্টর আভারটেকিং-এর ম্যানেজার। এই গত দশক তার জীবনের স্বর্ণযুগ। সে যুগে জনগণের সেবা কতদুর করতে পেরেছে?
