.
একদিকে অমলের রবীন্দ্রমূর্তি স্থাপনা ও শুভ নাট্যসংস্থার ভুবনেশ্বরে অবস্থানের জোগাড়যন্ত্র, অন্য দিকে কলকাতায় মৈত্রেয়ীর মূর্তি প্রস্তুতকার শক্তি রঞ্জন পাল ও নাট্যকার পরিচালক সরোজ মিত্রর সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগ পাল্লা দিয়ে চলছে। কোমর বেঁধে লেগে গেছেএকতার কার্যনির্বাহী সদস্যরা। দেখতে দেখতে মূর্তি তৈরি, সেটি সপ্তাহান্তে পাঠানো স্থির, কারণ মৈত্রেয়ীও সে ট্রেনে থাকবে। পেল্লাই প্যাকিং বাক্সটি ভুবনেশ্বরে নামাতে জনা ছয়েক কুলি হিমসিম। কোনওক্রমে তাকে এনে ফেলা হল অমলের গ্যারেজে—ভাগ্যে অমলের ফিয়াট গাড়ি, গ্যারেজে খানিকটা জায়গা ছিল। সাবধানে প্যাকিং বাক্স কেটে খড় ছাড়িয়ে যখন মূর্তিটি উদঘাটিত হল উপস্থিত সকলেরই এক প্রতিক্রিয়া—এই ভাস্কর্য কীর্তিটি প্রাচীন ভারতের যে কোনও মুনি ঋষির মূর্তি বলে চালানো যায় যা বিশাল দাড়ি ও দশাসই বক্ষ। ওয়াই অর্থাৎ সৌম্যেন আর রণজিত একসময়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়েছে তাই ফোড়নকাটা ওদের দুজনেরই বদঅভ্যেস। এদেরই মধ্যে কে যেন মন্তব্য করল, মুখের সঙ্গে রবিঠাকুরেরমিল তেমন নেই, আরেক জন টিপ্পনি কাটল ব্যাসদেব বাল্মীকি ও কবিগুরুর পাঞ্চ। অমল গায়ে মাখে না। সাধারণত কে কি বলে তাতে ওর কিছু এসে যায় না। বলুক না বলুক, কাজটাতো হয়ে গেছে। রবীন্দ্রমূর্তির ভুবনেশ্বরে অর্থাৎ অমলের গ্যারেজে আগমন উপলক্ষে রাতে একটা ছোটখাট গেটটুগেদার হল। সেখানে মৈত্রেয়ী একেবারে টপফর্মে। শুভ-এর পরিচালিত নাটকের অংশবিশেষ অভিনয়, অবশ্যই ক্যারিকেচার, যারা নাটকটি কলকাতায় আগে দেখেছে তাদের উৎসাহ দেখে কে। যারা দেখেনি তারাও দিদিভাইয়ের গুণমুগ্ধ। বিশেষ করে দিদিভাইয়ের হাতে রান্না লেটেস্ট ম্যাক্স-রসুন আর পুদিনা বাটা দিয়ে আলুর শুকনো দম—পেটের ভেতর দিয়ে মরমে পশেছে। এমন সময় হঠাৎসুজিত মনে করিয়ে দিল,
-মূর্তি তো এসে গেল। এদিকে আমরা যে গভর্মেন্টকে আবেদন দিয়েছিলাম মূর্তি বসানোর অনুমতি চেয়ে তার কিন্তু কোনও উত্তর আজও এল না।
অমল গায়ে মাখে না।
—আরে ওটা একটা ফরম্যালিটি। চিফ মিনিস্টার নিজে বলেছেন স্ট্যাচু করতে দাও। তাছাড়া অনিলেন্দু আছে। ও ঠিক হয়ে যাবে। আমি নেকস্ট যেদিন সেক্রেটারিয়েট যাব, হাতে হাতে অর্ডার নিয়ে আসব। নাথিং টু ওয়ারি। লেন্স হ্যাভ অ্যানাদার রাউন্ড। গান কে করবে? পার্টি চলল যথারীতি। রবীন্দ্রমূর্তির সম্মানে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত। শেষে অবশ্যই একজাতি একপ্রাণ। আজ চার্চিলও সভ্য, কারণ ওকে বিশেষ মুখরোচক মশলাদার খাবার দেওয়া হয়নি। সভ্যতা এবং খাদ্যের নিবিড় সম্পর্ক কে না জানে, অন্তত ইন্ডিয়াতে সবাই।
একতার পক্ষ থেকে সরকারকে আবেদনটি সবাই মিলে বেশ যত্নের সঙ্গে মুসাবিদা করেছিল। বক্তব্য ও ভাষা অতি বিনীত। পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার দীর্ঘ প্রীতির সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতার সম্মানে একতার তরফ থেকে ওড়িশাবাসীদের বিনম্র উপহার। রণজিতেরর ইলেকট্রনিক টাইপরাইটারে ঝকঝকে ছাপার অক্ষরে তৈরি। অমল নিজের হাতে নিয়ে গিয়েছিল ডিরেক্টর অফ কালচার অনিলেন্দুপট্টনায়েককে পৌঁছাতে। তার ঘরে তো অমলের অবারিত দ্বার।
—স্যার একটা রিকোয়েস্ট ছিল। এমন কিছুনয়। টাকাপয়সা চাই না। শুধু পারমিশান একটা করে দিতেই হবে।
অনিলেন্দু পট্টনায়েক অমলের তুলনায় এমন কিছু উচ্চপদস্থ নন। বয়সেও কাছাকাছি। এতদিনের যাতায়াত, একত্র কত পানভোজন গল্পগুজব। বলতে গেলে বন্ধু। তবু ওড়িশায় আমলাতন্ত্রের সর্বাত্মক প্রতিপত্তিকে ওড়িয়াদের মতোই সমীহ করে চলে অমল। রোমে রোমানদের অনুসরণই বিধেয়। অতএব, উঁচুনিচু মাঝারি সব আমলাই তার কাছে স্যার।
–আসন্তু মিঃ দাস, বসন্তু। কণ খবর? চাহা পিবে?
—নো নো, থ্যাংক ইউ স্যার, জানেনই তো নো মাইনর ভাইসেজ। তারপর আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে। ভদ্রলোক চুপ করে শোনেন। আবেদনটি হাতে নিয়ে চোখ বোলান। তারপর বললেন,
–হউক মুপঠাই দেবি। তারপর গভমেন্ট ডিসিসন নেবে।
অর্থাৎ ডিপার্টমেন্ট-এর সেক্রেটারিরহাতে সিদ্ধান্ত। সেটা অমলেরও জানা। কিন্তু ডিরেক্টর জোরকলমে সুপারিশ করলে সেক্রেটারি সাধারণত একমতই হন। অমলের একটু খটকা লাগে। যখনই কোনও আমলা বলেন, তার হাতে ক্ষমতা নেই উধ্বতনই সব, তার মানে কাজটি করার ইচ্ছে নেই। আমলাতন্ত্রের স্তরবিন্যস্ত কাঠামোয় বাস্তব ক্ষমতা তলায় ও মাঝের ধাপের কর্মচারীদের, তারাই বিষয়টি পরীক্ষা করে মতামত দেয়। তাদের মতের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ওপরওয়ালার আবার নতুন করে নোট তৈরি করতে হয়। কে এই ঝামেলা নেবে, আর কেনই বা। একযুগ ওড়িশায় কাটিয়ে সেক্রেটারিয়েটের অন্ধিসন্ধি অমলের জানা। অতএব, অন্য রাস্তা নেয়।
-ছেলের খবর কী? কেমন লাগছে কলকাতা?
অর্থাৎ পট্টনায়েকের ছেলে যে অমলকুমার দাসের সাহায্যে পিছনের দরজা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী মন্ত্রীর স্পেশাল কোটায় কলকাতার ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিল সে কথাটা মনে আছে তো।
পট্টনায়েক স্মিত হেসে জবাব দিলেন।
—ভল। সি এ তো আউ কালকাটারে নাহি, ফেরি আসিচি, কোর্স সরিলানি।
-বাঃ একেবারেফুলি কোয়ালিফাইড ডেন্টিস্ট। ভেরি গুড। তা কোথাও চেম্বারটেম্বার করে বসিয়ে দিচ্ছেন না?
