অথচ ছড়ানো ছিটানো আধুনিক শহর। বড় বড় রাস্তা, কোথাও উঁচু কোথাও রা নিচু। রিক্সাচালকের অতিরিক্ত শ্রম ও যাত্রীর অতিরিক্ত ব্যয়। সবচেয়ে বড় কথা রাত দশটায় চার নম্বর ইউনিটের রবীন্দ্রমণ্ডপ থেকে সেই পুরনো ভুবনেশ্বর বা শহীদনগর আচার্য বিহার যেতে রিক্সা আদৌ পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। ফাঁকা নিঝুম রাস্তাঘাট, নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। এখন আর সে ওড়িশা নেই, হিন্দি সিনেমা টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে চুরি ছিনতাই নারীঘটিত অপরাধ আকছার। এতএব, এ শহরে সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ ও অনুষ্ঠানাদি একান্তভাবে শ্রেণীনির্ভর। যাদের গাড়ি আছে বা গাড়ি জোগাড়ের ক্ষমতা আছে সেই মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারই প্রথম সারির দর্শক। বাকিতে আমজনতা, সাইকেল স্কুটার আরোহী ছেলেছোঁকরা লফংগা-চ্যাংড়ার দল। বাংলা নাটক তো দুরের কথা কটা ওড়িয়া নাটক টিকিট বেচে ওড়িশার রাজধানীতে হয়। অন্তত অমলকুমার দাসের মনে পড়ে না।
হঠাৎ ছায়া দেবনাথ বাধা দেয়।
—এইটা কী বলতাসেন? ওড়িয়ারা নাটক-ফাটক করে না। তাই কি কখনও হয়। এই শহরে পাড়ায় পাড়ায় যে ব্যাঙের ছাতানার্সিহোমগুলা, সেইখানে গিয়া দ্যাখেন কামকরতাসে কত ওড়িয়া নার্স। যারা এত শিক্ষা পাইতাছে দ্যাশের বাইরে যাইতাসে আর নাটক কখান লিখব না। এটা কি অ্যাকটা কথা হইল।
–উঃ ছায়া। তুমি তো দিনকে দিন আরও বাঙাল হয়ে যাচ্ছ। একটা লাইনও ঠিকমত বলতে পার না। এদিকে খসখস করে আবার লিখছ। মা গঙ্গাই জানেন কী লেখ। বুদ্ধিতা বাঙালের মতো। দেশের বাইরে কাজের সঙ্গে নাটকের সম্পর্ক কী?
–বাঃ, সম্পর্ক নাই? যে জাত যত দ্যাশবিদ্যাশ দেখে সেই তো পাঁচটা নূতন জিনিসের স্বাদ পায়। নূতন বিদ্যা শ্যাখে, নূতন চিন্তাভাবনা মাথায় আসে। নিজেরে বদলাইতে চেষ্টা করে। বদল মানেই তো আগাইয়া চলা। সেই যে শ্রীচৈতন্যদেব বাহির হইলেন মায়ের কোল ছাইড়া, দক্ষিণযাত্রা, উত্তরযাত্রা, সেই তো হইল বাঙ্গালি জাতির অগ্রগতির শুরু।
বাব্বা। এতো সাধারণ মেয়ের মতো কথাবার্তা নয়। ভাল করে ছায়ার দিকে তাকায় অমল। না সেই এক চেহারা। ছোটখাটো শ্যামলা, দাঁত উঁচু। কোথাও কোনও বৈশিষ্ট্যের ছাপ নেই। তাহলে বাংলাদেশের ইস্কুলে শ্রীচৈতন্যদেব সম্পর্কে এসব পড়ায় না কি। হবেও বা। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার জন্য বাঙালিত্বের মহিমা উপলব্ধির চেষ্টা। অথচ গত পঞ্চাশ ষাট বছরের কথা বললে যেন শুনতেই পায় না। এই বাংলাদেশিরা সত্যি অদ্ভুত, তাল পাওয়া যায় না।
—তুমি এত বড় বড় কথা শিখলে কোথা থেকে?
–বড় বড় কথা না কি? কে জানে কোথায় পড়সিলাম। নির্বিকার উত্তর।
–তা আপনাগো বাংলা নাটক কী হইল? আর বাঙ্গালি অনুষ্ঠান? কোনও প্রশ্ন উত্তর পাওয়া পর্যন্ত ছায়া দেবনাথ চালিয়ে যাবে। একেবারে বাঙালের গোঁ। অমল চুপ করে থাকে। খানিক পরে বলে,
-আজ আর কথা বলতে ভাল লাগছে না। কী হবে জেনে? কোথায় একটা বাংলা নাটক হল কি হল না তাতে পশ্চিমবঙ্গে কার কী এসে যায়? আর রবি ঠাকুর। তার ছবি মূর্তি তো ছড়াছড়ি। তাকে শ্রদ্ধা করলেও কিছু না, গালাগালি দিলেও কিছু না। বাঙালিদের কিছুতেই কিছু আসে যায় না। মনে মনে বলে শালা হারামির জাত, এই বাঙালি। সেদিনের মতো ছায়া দেবনাথের বিদায়।
.
কিন্তু প্রশ্নটা তো বিদায় নেয় না। স্মৃতি সর্বদাই সজাগ। ভুবনেশ্বরে অর্থাৎ ভারত নামে দেশের একটি রাজ্যের রাজধানীতে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থে নির্মিত রবীন্দ্রমণ্ডপে, অন্য একটি রাজ্যের কিছু অনাবাসীদের উপহার রবীন্দ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠা, একটি নাট্যগেষ্ঠীর বিশেষ ভারতীয় ভাষায় নাটক উপস্থাপনা, সেটা এমন একটা কী ব্যাপার যে আমার জীবনে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের শেষ পরিণতি হিসেবে চিরস্থায়ী হয়ে রইল?
সনাতন জীবনচর্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীইংরেজভক্ত বিষ্ণুপদ দাসের পৌত্র, জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসকর্মী হরিচরণ দাস বিএ বিএল-এর পুত্র, স্বাধীন ভারতের নাগরিক, জনগণের সেবায় সরকারিভাবে নিয়োজিত এই আমি শ্রী অমল কুমার দাস যার অস্তিত্বের তাৎপর্য একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত। অনুষ্ঠান ভাল হোক বা মন্দ হোক বা আদৌ না হোক একটি সময় ও স্থান বিশেষের ঘটনামাত্র। জীবন তত বহতা স্রোত, অথচ তার গতিপ্রকৃতি নির্দিষ্ট হয়ে গেল স্থানকালের মিলিত এক বিন্দুতে। আসল প্রশ্ন তো রয়ে যায়। যে ভীষণ দর্শন পুরুষের হাতের কাস্তেতে মানবজীবনের সব সম্পর্ক কর্মকীর্তির ফসল নির্মমভাবে কচুকাটা হয়, তার অনিবার্য কোপ কি এড়াতে পেরেছিল সামাজিক সমর্থন বঞ্চিত জীর্ণ শীর্ণ প্রেম?
এ প্রশ্নের উত্তর প্রাজ্ঞজনের জানা। তবু ছায়া দেবনাথের মতো সরল আগ্রহী শ্রোতা না শুনে ছাড়ে না। তার কাছে আদর্শ টিভি সিনেমার পর্দা, যেখানে খাদের ওপর দু আঙুলে ঝুলে থাকা নায়ক বেঁচে যায়, পাহাড়ের ওপর লাফিয়ে ওঠে, মহাবলে পরাস্ত করে ভিলেনকে। অতঃপর লক্ষ্মীনায়িকাটি বাহুবন্ধনে। হ্যাপি এন্ডিং, মধুর সমাপ্তি। অথবা একহাত ফেরৎ অতএব ততযোগ্য নয় নায়িকার কোনও কুমারী তরুণীর হাত নায়কের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যুবরণ, কাশীপ্রবাসটা এখন আর তেমন চলে না। মোদ্দা কথা হয় কমেডি নয় ট্রাজেডি। মিলন অথবা মৃত্যুর অপেক্ষা করে আছে ছায়া দেবনাথ।
