এ দু বছর নাটকও আর হয় নি। কার স্ত্রীকে ক লাইনের বেশি কলাইনের কম রোল দেওয়া হয়েছে সে নিয়ে মেয়েদের মধ্যে রেষারেষি। স্বামীদের মুখভার, গেট টুগেদার-এ ড্রিংক ফ্রিংক করে কথা কাটাকাটি। এই জন্যই তো বাঙালিদের কিছু হয় না। আরে তোমার স্ত্রীর রঙ ফর্সা, তোমার স্ত্রীর মুখোনা সুন্দর, তাতে কি হল?অভিনয় করতে জানে মৈত্রেয়ীর মতো? হিংসে করার কোনও লজিক্যাল বেস-ই নেই। যাই হোক এসবের পর ইনহাউস নাটক বন্ধ। ফলে অমল আর মৈত্রেয়ীর কাছাকাছি হওয়াটা কমে গেল। মৈত্রেয়ী ইদানীং কেমন নির্বিকার। ভুবনেশ্বরে আসাটা যেন সপ্তাহান্ত রুটিন, বাকি পাঁচ দিন যেমন স্কুল, কাজ।
অমলের অস্বস্তি হয়। মাঝে মাঝে গভীর রাতে নেশা কেটে গেলে ঘুম ভেঙে যায়। তখন অন্ধকারে কেমন ভয়ানক একা লাগে। ভয় করে। বাকি রাতটা আর ঘুম আসে না। সকালে অফিসের জন্য তৈরি হতে কী ভীষণ ক্লান্তি। মনের মধ্যে খচখচ করে মৈত্রেয়ী কি সত্যি উদাসীন হয়ে পড়েছে? অমল কী করে না করে তাতে যদি তার কিছুই এসে যায় না তাহলে তাদের সম্পর্কের জোড়টা কী রইল? নাকি সম্পর্ক মানে শুধু রিচ্যুয়েল, নিত্য অভ্যাসমত আচার অনুষ্ঠান মাত্র? নাঃ, এমন একটা ফাংশান করতে হবে যার কর্মযজ্ঞে দুজনে আবার একসঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। আবার আগেকার মতো।
একদিকে মৈত্রেয়ী, অন্যদিকে একতার একজিকিউটিভ কমিটি, মাঝখানে সেতুঅমল। দুদিকে আলোচনা করে স্থির হল ঘটা করে রবীন্দ্র জন্মোৎসব করা যাবেনা। সময় খুব কম। এদিকে সামনের বছরের জন্য ফেলে রাখা অসম্ভব, তখন অমল কোথায় থাকবে তাই ঠিক নেই। অতএব, ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনে মূর্তির আনুষ্ঠানিক স্থাপনা। অর্থাৎ আবরণ উন্মোচন।
কে করবেন? প্রথম ক্যান্ডিডেট রাজ্যপাল (বাঙালি আই এ এস উপদেষ্টারা যদি ব্যবস্থা করে দিতে পারেন), না পাওয়া গেলে মুখ্যমন্ত্রী। অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীকে ডাকতেই হবেইন এনি কেস। প্রথমে বাইরে অনুষ্ঠান পর্দা সরানো–এখানে টিভির লোকদের ভাল করে ব্রিফিং দরকার। মৈত্রেয়ীর নেতৃত্বে লালপাড় লাল ব্লাউজ পরা মেয়েরা ঘিরে থাকবে। তারপর সবাইহ এবসবে—এইসময় একটু প্যান্ডোমোনিয়াম হবার সম্ভাবনা, তার জন্য ভল্যান্টিয়ার চাই, পুলিশ তো থাকবেই। উদ্বোধনীরবীন্দ্রসংগীত হবে কোরাসে—গান মৈত্রেয়ী বাছবে। রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী ছাড়াও মঞ্চে থাকবেন উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওড়িয়া বিভাগের প্রধান বিশ্ববিন্ধু শতপথী। কে যেন বলছিল ওঁর গবেষণার বিষয় ওড়িয়া কাব্যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব। বইটইও নাকি আছে। ভাষণ সব শেষ হলে সমাপ্তি সঙ্গীত। সমুখে শান্তি পারাবার গাইবে এক্স। তারপর পাঁচ মিনিটের বিরতি। এবারে কলকাতার বিখ্যাত নাট্যগোষ্ঠী শুভম-এর বহুসমাদৃত নাটক পরিবেশন কাহিনী বেগম সাহেবা।
একটু তাড়াতাড়ি অর্থাৎ বিকেল পাঁচটায় আরম্ভ। ভাষণের সময় তো এমনিতেই লোকে আসে না, নাটকটা যাতে সাড়ে ছটায় শুরু হয়ে যায়। কারণ সেই রাতেই শুভ ফিরে যাবে কলকাতা জগন্নাথ এক্সপ্রেসে,দশটা পঁয়তাল্লিশ রাইট টাইম তবে এগারোটার আগে কখনও আসেনা। সঙ্গে প্যাকরা ডিনার। ব্যস। একজিকিউটিভ কমিটির মিটিং ডেকে সব পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আলোচনা করে চূড়ান্ত হল, কে কোন্ দায়িত্ব নেবে শুভম-এর থাকা খাওয়া ট্রান্সপোর্ট এদিকে রবীন্দ্রমণ্ডপে গেস্টদের রিসেপশন, এমন কি লাল পাড় কোরা শাড়ি পরা কেউ না কেউ খবরদারি করবে। দু-একজন অবশ্য জিজ্ঞাসা করেছিল,
– কোরা শাড়ি কী?
–আরে অফ হোয়াইট, আসলে আনব্লিচড। জ্ঞান দান হল।
যদিও এর মধ্যে মৈত্রেয়ী শুভ গোষ্ঠীর সঙ্গে এমন জমে গেছে যে শুভ-এর পরের নাটকে কোনও ক্যারেকটার রোলে নেমে পড়তে পারে এমন অবস্থা তবুও অমল একতার সভাপতি হিসেবে একবার সরাসরি পাকা কথা বলবে স্থির হল।
দরকার বুঝলে দুদিনের জন্য কলকাতায় একটা ট্রিপ মেরে দেবে।
তার দরকার হল না। শুভ গোষ্ঠীর সম্পাদক অরিন্দম সেনকে টেলিফোন করতেই সব ফাঁইনালাইজ করে ফেলা গেল। তিনিই বললেন, আপনার এজন্য কলকাতায় আসার কী দরকার। মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে তো আমাদের সব কথা হয়েই গেছে। টাকাটাও মৈত্রেয়ীর মারফত হাতে হাতে পৌঁছে যাবে ঠিক হল। ওদের শুধু একটা বক্তব্য ছিল। মাত্র একটা শো-এর জন্য এত লোকলস্কর সেটিং লটবহর সব নিয়ে যাওয়া কি পোষায়, কটকে যদি আর একটা শো-এর ব্যবস্থা করা যায় বা ভুবনেশ্বরেই অন্তত দুটো তাহলে একতারও সুবিধে, ওদেরও খেটে তৃপ্তি। অমল চুপ করে শোনে। কিছু কথা দেয় না। তার তো বরাবর ওইটাই মাথাব্যথা। ভুবনেশ্বরে বাংলা নাটক দেখার দর্শক কজন? বিশেষ করে টিকিট কিনে। কোনওক্রমে কুড়িয়ে বাড়িয়ে একটি শো দাঁড় করানো যেতে পারে নইলে তো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গসংস্কৃতি অনুষ্ঠানের মতো শুধু চেয়ারই দর্শক থাকবে। ওটা দেখার পর থেকে অমলের কাছে বাংলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রায় দুঃস্বপ্ন। অথচ কেন কে জানে পাকেচক্রে আজ সেই বাংলা অনুষ্ঠানের জন্যই উঠে পড়ে লেগেছে।
তার তত ধারণা ওড়িশায় স্থায়ী বাসিন্দা বাঙালিদের ভরসায় ভুবনেশ্বরে বাংলা নাটক করা যায় না। তাদের দরদ তো স্থানীয় কালীবাড়ির যে কোনও অনুষ্ঠানেই দেখা যায়। এদের সবকিছুই প্রায় ওড়িয়াতে। চেহারা চালচলনে একশো বছর আগের বাঙালি কেরানিবাবু। এখনকার কলকাতায় কেরানিরা ঢের ঢের সংস্কৃতিমনস্ক। তাদের পরিবার অনেক সীমিত। সংসারের বোঝায় ঘাড় অতটা নুয়ে পড়ে না, দৈনন্দিনের যাবতীয় বাজার-দোকান-হাট ছেলেমেয়ের স্কুলকলেজ যাতায়াত তাদের দু-চাকাবাহনের ওপর নির্ভরশীলনয়। কলকাতায় অজস্র ট্রাম বাস মিনি অটো ট্যাকসি। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সচল। ভুবনেশ্বরে সে উপায় নেই। ভারতবর্ষের বোধহয় এটা একমাত্র স্টেটক্যাপিটাল যেখানে নিয়মিত সারাদিন যথেষ্ট সংখ্যায় জন-পরিবহণ নেই। অফিস টাইমে খাস দুতিনটে রাস্তায় যাও বা কিছু পাওয়া যায় বাকি সময় মফঃস্বল শহরের মতো সাইকেল রিক্সা সম্বল।
