রবিঠাকুর কবি সাহিত্যিক মানুষ, যদিও তিনি আঁকা-ফঁকা নাচ গান নাটক থেকে শুরু করে বাটিক গ্রাম উন্নয়ন অনেক কিছু করেছেন। বাংলা ভাষা তার আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম, গ্যেটের যেমন জার্মান, টলস্টয়ের রুশ, শেক্সপিয়ারের ইংরিজি। গ্যেটে টলস্টয় শেক্সপিয়ারের ছবি বা মূর্তির তলায় কি পরিচয় লেখা হয় না জার্মান রুশ ইংরিজি ভাষার লেখক? অমল এইখানে ভারতীয়আখ্যার মানে বুঝতে পারে না। তবে সে তো আঁতেল বা জাতীয়তাবাদী নয়, ব্যাঙ্কার। লাভ-ক্ষতি নিয়ে তার জীবন। তার দৃঢ় বিশ্বাস কোনও এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কোনওরকম ফায়দা ওঠাবার জন্যই রবিঠাকুরের বাঙালি পরিচয়টি লোপ পেয়েছে।
একজিকিউটিভ কমিটি মিটিংএ কেন জানি না অমল কথাটা প্রকাশ করতে পারে না। দ্বিবেদী ও মহান্তির উপস্থিতি কি তার মুখ বন্ধ রাখল? কে জানে। তবে সেদিন বেশি রাতে এসটিডিতে ধরে মৈত্রেয়ীকে।
-জানো পেডেস্টালের তিন দিকে ইংরিজি হিন্দি ওড়িয়া ভাষায় রবি ঠাকুরের নাম লেখা হচ্ছে। আমি বলছিলাম কি ফোর্থ সাইডে বাংলায় দিলে হত না?
-কথাটা মন্দ নয়। পেডেস্টালের তো চারটে দিক। না হয় বাংলাটা মুর্তিটা পেছন দিকেই থাকল। আফটার অল তিনি তো সারাজীবন বাংলাতেই লিখেছেন। তবে দেখো ওরা আবার বাংলা বানান টানান ঠিকমতো লিখতে পারবে তো? অবশ্য বাংলা বানানের এখন কোনও মা বাপ নেই, সবাই সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবু টিভির বাংলা বিজ্ঞাপনের মতো আসোল অপনার যেন না হয়।
—ভাবছি মূর্তিস্থাপন উপলক্ষে একটা পুরোপুরি বাঙালি অনুষ্ঠান করব। এখন তো আমরা বাঙালি অনুষ্ঠান শুধু নিজেদের মধ্যে করি, সব বাই ইনভিটিশান। আর টিকিট করে পাবলিক ফাংসান মানে তো ইংরিজি হিন্দি গান, বড়জোর ক্লাসিক্যাল ডান্স।
-কথাটা মন্দ নয়। তবে সাবধানে ভেবেচিন্তে কর বাবা। মনে আছে সুমিতকুমার আর মীনা পায়েলা মঞ্চে বাংলা বলছিল বাংলা গান গাইছিল বলে কী রকম আওয়াজ দিল অডিয়েন্স?সুমিতকুমার ঘাবড়ে গিয়ে হিন্দিতে সুইচ আর বাংলাদেশি মীনা সাবাস কালান্দার গেয়ে তাড়াহুড়ো করে প্রোগ্রাম শেষ।
–তবে ভুবনেশ্বরের অডিয়েন্স জব্দ হয়েছিল বেলিয়াপ্পার বাংলা গানে, মনে আছে? ওই বিশাল কালো দশাসই চেহারা ইয়া চওড়াপেড়ে কাঞ্জিভরম,নাকে কানেহীরে। এককেবারে সেদো তেঁতুলাম্মা, সে কিনা গলা খুলে গাইতে লাগল কলকাতা তুমি কত অপরূপাসবাই দিব্যি সোনামুখ করে শুনল।
-যা বলেছ। আর ঐ ছোঁকরা পাঞ্জাবি প্রীত সিং আনন্দ যখন পাগড়ি মাথায় কুর্তা–চোস্ত গায়ে পরিষ্কার বাংলায় নিজের পরিচয় দিয়ে ধরল আমি বাঙালি হব?
–হা হা হা হা।–হা হা হা হা।
–এবারে শোনো,বাঙালি বাংলা বলবে বাংলা গাইবে। মূর্তিস্থাপন খাঁটি বাঙালি অনুষ্ঠান হবে।
—জানো,ভাবছি একজিকিউটিভ কমিটির মেম্বারের স্ত্রী বাড়ির মেয়েরা সবাই লালপাড় কোরা শাড়ি পরবে,সঙ্গে লাল ব্লাউজ,কপালে লাল টিপ।
–এখন থেকে সবাইকে বলে দিতে হবে। আজকালকার মেয়েদের লালপার শাড়ি আছে কি না সন্দেহ। চেয়ে চিন্তে যেমন করে তোক জোগাড় করবে। করতেই হবে। বেশ ভাল দেখাবেকী বল? একেবারে টিপিকাল বোং। ভুবনেশ্বরে মোস্ট পোবাবলি এটাই আমার শেষ ফাংশান।
–কেন,বদলির কিছু শুনলে নাকি?
–গতবার যখন অর্ডার এসেছিল, দেখলে তো কত কাঠখড় পুড়িয়ে ধরা করা করে বন্ধ করলাম। কী না করেছি বল। কটক ভুবনেশ্বরের তিন তিনটে স্পেশালিস্ট সার্টিফিকেট দিয়েছে অসুস্থ বিধবা মা আমার কাছে, চিকিৎসা চলছে, তার যা শরীরের অবস্থা তাতে নড়ানো চড়ানো যাবে না। এ ছাড়া চিফ মিনিষ্টারকে দিয়ে প্রাইম মিনিষ্টারের অফিসে পারসোনাল রিকোয়েস্ট করিয়েছি। যাকে বলে নো স্টোন আনটানড। এম ডি আগরওয়াল কী বলে জানো? আমি নাকি শুধু একতাক্লাব আর ফাংশান নিয়েই থাকি, ব্যাঙ্কের কাজকর্ম কিছুই করিনা। ব্যাটা হরিয়ানভি কালচারের কী বোঝে? সবাই ভেতরে ভেতরে আন্টিবেংগলি।
-আচ্ছা, তোমার সেই এ সি চ্যাটার্জি, তাঁর না এম ডি হবার কথা? সেবার ভুবনেশ্বরে এলেন। তুমি কত খাতির করলে, বড় রাস্তায় ব্যানার ওয়েলকাম টু এ সি চ্যাটার্জি।
–তিনি আর হলেন কই। আগরওয়াল অপোজিট ক্যাম্পের সেই লেংগিটা মেরে উঠল। তাই তো আজ আমার এত দুশ্চিন্তা। সবাই তো জানে এক স্টেশনে একনাগাড়ে বারো বছর কেউ পায় না। হেড অফিস আগরওয়াল গ্রুপ পেছনে লেগে গেছে আর কি। রুলফুল দেখাচ্ছে।
– এবারে তুমি কদিন কলকাতা ঘুরে যাও। ভুবনেশ্বর যা গরম, আমি বর্ষা আসলে পর যাব।
– ভাল কথা মনে পড়ল। পরশু দিন সকালে অফিসে ঢুকেছি, প্রাইভেট সেক্রেটারি বিভু মহান্তিকে জানো তো? ও একগাল হেসে বলল,
–সার,আম ভুবনেশ্বর বিব্বিসিরে আসিলা। কালি কণ নিউজরে দেইথিলা, সার শুনিলে? আমি তো অবাক। ভুবনেশ্বরে হঠাৎ এমন কি ঘটল যে বি বি সি নিউজে দেবে। আর এত ইম্পর্টেন্ট ঘটনা আমি জানি না।
উত্তর দিলাম, না তো শুনি নি। কী বলল কী? সগর্বে মহান্তি উত্তর দিল,
–গত দুইদিন ধরি সার ভুবনেশ্বর ইজ দ্য হটেস্ট প্লেস ইন সাউথ এশিয়া। সতে সার বিব্বিসিরে দেলা।
–হো হো হো। -হা হা হা—
–এবার ছাড়ি। তোমার ব্যাঙ্ক তত ফতুর হয়ে যাবে এসটিডি বিল দিতে দিতে।
ব্যাঙ্ক টেলিফোন বিল দেয় বলে যে অমল এতক্ষণ ধরে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে এসটিডি-তে কথা বলে সেটা ঠিক নয়। ব্যাঙ্ক না দিলেও বোধ হয় করত। এত মন খুলে কথা বলছে তারা। এত হাসছে। প্ল্যান করছে একসঙ্গে কিছু করার, এটাই তো বিরাট লাভ। গত বছর দুয়েক কেমন একটা ভাটা এসেছিল তাদের সম্পর্কে। আগে আগে তারা একসঙ্গে হত নাটক করতে। না, গ্রুপ থিয়েটার মার্কা আঁতেল বা গরিব দেখানো নাটক নয়। অফিস ইউনিয়নের জমাটি প্লে। মৈত্রেয়ী কত কলকাতা থেকে এসে এসে রিহার্সাল দিয়েছে। যার জন্য নাটক মঞ্চস্থ হত বিচ্ছিরি সিজনে, জুলাই আগস্টের ঘোর বর্ষায়। স্কুলের গরমের ছুটিটা পুরোদমে মহড়ায় লাগানো হত তো।
