-পেডেস্টালের খরচ কে দেবে? সুজিতের অতিপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। দোকানদার তো, মাটিতে পা ছুঁড়ে আছে সবসময়। এইজন্যই ওকে সেক্রেটারি রাখা।
-আমরা দেব। নালকো উইল প্রোভাইড দ্য পেডেস্টাল, তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলেন নালকোর এম ডি বিশ্বেশ্বর দ্বিবেদী, একতার উনি অন্যতম উপদেষ্টা। ভাগ্যে সেদিন বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শুধু খরচই নয়, নালকো কালো গ্রানাইটের পেডেস্টাল একেবারে তৈরি করে দেবে ঠিক হল।
অতঃপর অমলের জীবনের স্বর্ণযুগ ভুবনেশ্বরবাসের শেষ অধ্যায়ের শুরু রবিঠাকুরের মূর্তি স্থাপন কর্মপরিকল্পনা। টেলিফোনে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে সে উপলক্ষে কথাবার্তা। তার স্কুলের টিচার মৃদুলা পাল-এর জানাশোনা বেরুল কুমারটুলিতে।
-দুর! ওরা তো কুমোর, প্রতিমা তৈরি করে ঠিক আছে। কিন্তু এটাতো মাৰ্বল স্ট্যাচু হবে, ওরা পারবে কেন।
-আরে না না। ওদের মধ্যে আজকাল কেউ কেউ মূর্তিফুর্তি করছে। শুনলাম ভালই করে। আমরা তো চাইছি মাস তিনেকের মধ্যে মূর্তি রেডি হোক, তাই না? নামকরা ভাস্কর কেউ কখনও এত অল্পসময় করে দিতে পারবে না। পারলেও সেই অনুপাতে মোটা টাকা চাইবে। তাছাড়া আমাদের কারও সঙ্গে তো চেনাজানা নেই। হঠাৎ পাব কোথায়?
দু-তিনবার আলোচনার পর ঠিক হল শক্তিরঞ্জন পাল রবীন্দ্রনাথের আবক্ষমূর্তি মাস দেড়েকের মধ্যে প্রস্তুত করে ট্রেনে ভুবনেশ্বর পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দেবে। তাকে ভুবনেশ্বর স্টেশনে নামিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব একতার।
এদিকে মূর্তি স্থাপনের প্রাথমিক কার্যক্রম আছে। রবীন্দ্রমণ্ডপের লবির আয়তন অনুপাতে বেদিস্তম্ভের উচ্চতা ও পরিধি হওয়া চাই। তাছাড়া ঠিক কোথায় বসানো হবে জানা দরকার। খোঁজখবরের জন্য অমল চলল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলতে। তখন শ্রীদেবেন্দ্র পানিগ্রাহী টেকনোক্র্যাট সেক্রেটারি, অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার। উনি প্রস্তাব শুনে একটু বিস্মিত হলেন, তবে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর অভিলাষ জেনে অধঃস্তনদের ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে দেরি করলেন না। তারপর অমলকে বললেন,
–দেখুন মিঃ দাস, আপনি বললেন মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছে আমি মেনে নিলাম। কিন্তু রিটুন অর্ডার এবং সেটা প্রপার চ্যানেলে না আসলে কিন্তু কাজটা হতে পারবে না।
-অর্ডার কি চিফ মিনিস্টার নিজে দেবেন?
-না। আপনাদের ক্লাব ডিপার্টমেন্ট অফ কালচারের সেক্রেটারিকে একটা পিটিশান পাঠাবে। ডিরেক্টর অফ কালচারের মারফত। আপনারা অনুরোধ জানাবেন যে রবীন্দ্রমণ্ডপে আপনাদের রবীন্দ্রনাথের মূর্তি প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হোক। ওটাতে আপনারা স্পষ্ট উল্লেখ করে দেবেন যে নালকো অর্থাৎ ন্যাশনাল অ্যালয় করপোরেশন পেডেস্টাল দিতে রাজি নালকো থেকে সেই মর্মে একটা চিঠিও করে নেবেন যার কপি আপনাদের আবেদনটির সঙ্গে থাকবে। বুঝলেন রবীন্দ্রমণ্ডপ তো সরকারি সম্পত্তি, একটু নিয়মকানুন মানতে হবে।
-আচ্ছা মন্ডপটা তো সেন্ট্রাল গর্ভমেন্টের টাকায় হয়েছে তাই না? স্টেট গর্ভমেন্টের তো নয়।
হলেও, তার মেনটেনেন্স মানে দেখাশুনা রক্ষণাবেক্ষণ রাজ্য সরকারের। আমাদের তো একটা দায়িত্ব আছে।
-ঠিক আছে, তাই লিখি। কিন্তু স্যার দেখবেন কাজটা যেন আটকে না যায়।
-না না তা হবে না। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা এদিকে প্রিলিমিনারি কাজ সব করে রাখছি। রিটন অর্ডার এলে ইমিডিয়েট একজিকিউশান।
-থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার থ্যাঙ্ক ইউ। আমি সত্যি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। ওড়িশা সরকারের কাছ থেকে আমি সর্বদা কো-অপারেশান পেয়ে এসেছি। একেবারে পূর্ণ সহযোগিতা।
-এবারেও পাবেন। কিছু চিন্তা করবেন না।
—স্যার, অনুষ্ঠানে কিন্তু আপনাকে আসতেই হবে, ফ্যামিলি নিয়ে।
—যাব, নিশ্চয় যাব। কার্ড একখানা পাওয়া যাবে তো?
—কী যে বলেন স্যার, একখানা কি বলছেন কত কার্ড আপনার চাই আমাকে কাইন্ডলি বলবেন আমি নিজে এসে দিয়ে যাব।
-ঠিক আছে। সে হবে খন।
অতঃপর সেক্রেটারির পরামর্শ অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ার ওভারশিয়ারদের বগলদাবা করে অমল নিয়ে গেল রবীন্দ্রমণ্ডপে। মাপজোক প্ল্যান সব হল। বেদিস্তম্ভের কতটা উচ্চতা ও ঘের কাম্য জেনে দ্বিবেদীও কাজ শুরু করে দিলেন।
একতার একজিকিউটিভ কমিটির ঘন ঘন অধিবেশন বসছে আজকাল। প্রত্যেকটি পদক্ষেপ সবাইকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া। অমল যেন মনে মনে ধরেই নিয়েছেতার ভুবনেশ্বর বাসের বিবিধ কর্মকাণ্ডে রবীন্দ্রমূর্তি স্থাপন হবে উপযুক্ত পরম পরিণতি। আ ফিটিংক্লাইম্যাক্স। অন্যান্য সদস্যরা আপনি থেকে তার সঙ্গী। এবারে প্রশ্ন মূর্তির স্তম্ভমূলে কী লেখা হবে। সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হল একতাবানালকোরনাম থাকবেনা। শুধু লেখা থাকবেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১-১৯৪১। ব্যস। কী ভাষায় লেখাটা হবে? দ্বিবেদী অবাক হয়ে বললেন, -আংরেজি আউর হিন্দিমে। এ ক্যায়া সোঁচনে কো বাত হ্যায়।
একজিকিউটিভ এঞ্জিনিয়ার বিজয় মহান্তিকে সেদিন মিটিং-এ ডাকা হয়েছে। মতামতের জন্য। তার তৎক্ষণাৎ আপত্তি, ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরে একটা মূর্তি স্থাপিত হচ্ছে, ওড়িয়া ভাষায় নাম লিখতে হবে। সকলে সহমত। অমল একবার ভাবল, সবাইকে মনে করিয়ে দেয় স্তম্ভমুলের চারটি দিক, তিনদিকে তিনটি ভাষা তো হল। চতুর্থদিকে বাংলায় নাম লেখা হলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
