অতএব, নির্ভয়ে অমল মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ঢুকে ইংরিজি গীতাঞ্জলিখানা তার টেবিলের ওপরে রেখে বলে,
-আ স্মল অফারিং স্যার, ফর দ্য কামিং বার্থডে অফ টেগোর।
মৃদু হেসে বইটি হাতে তুলে নেন মুখ্যমন্ত্রী। ধুতি পাঞ্জাবি কটকি উড়নিতে টিপটপ পোশাক, মুখে সর্বদা স্মিতহাসি, গলা একই গ্রামে, কখনো ওঠে না, সকাল থেকে মধ্যরাত কাজ করেন, অসম্ভব পরিশ্রমী।
—ইংরাজি গীতাঞ্জলি আনিলে। হউক। নোবেল প্রাইজ পাইথিলা। মু কিন্তু পিলা বেলরুবঙ্গলাটা পড়িছি। মোর পাখে পরা রবীন্দ্ররচনাবলী পুরা সেট অছি। অমল তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়,
–নিশ্চয় থাকবে। ও তো জানা কথা। আপনি বাংলা ওড়িয়া সংস্কৃতে এত বড় স্কলার। তবুও আনলাম। খুশবন্ত সিং কী কমেন্ট করেছে দেখেছেন তো? তা স্যার আপনার কী ওপিনিয়ন?
মুখ্যমন্ত্রী আবার মৃদু হাসলেন।
—দূর! খুশবন্ত সিং কণ টাগোর পড়িবে আউ বুঝিবে? তাঙ্ক কথা ছাড়ন্তু। এমানন্ধু জানিছন্তি? টেবিলের বাঁ দিকে দুটি চেয়ারে বসা ভদ্রলোকেদের দিকে সঙ্কেত। অমল চেয়ে দেখে চেনা মুখ। একজন পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের চাঁই হেমেন মিত্তির যার সঙ্গে অমলের বিলক্ষণ চেনাজানা, আর একজন বাংলা খবরের কাগজ প্রত্যহর মালিক নুটু দত্ত। এর সঙ্গেও অমলের সামান্য আলাপ আছে। হেমেন মিত্তির অমলকে দেখে এতক্ষণে বলে উঠল,
-এই যে, অমল এখানে। খুব যে রবি ঠাকুরের গীতাঞ্জলি উপহার দিচ্ছ, এদিকে ভুবনেশ্বরে রবীন্দ্র মণ্ডপটা কী করে রেখেছ অ্যাঁ?
রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত রাজ্যকে রবীন্দ্রনাথের নামে সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মের জন্য একটিস, প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের অর্থ দিয়েছিলেন। অতএব ভুবনেশ্বরেও একটি রবীন্দ্রমণ্ডপ তৈরি হয়েছে। মঞ্চ অত্যন্ত নিরেস, হও তেমনই, বসার সিটগুলো শক্ত, সরু সরু। শীততাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেকবার গানবাজনার অনুষ্ঠান করতে তার সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। তবু একটা হল তো,নইলে আগে তো কিছুই ছিল না। কাজেই অমল ওড়িশার পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ করে,
–কেন, দিব্যি ভাল হ। চারিদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বিরাট জায়গা আপনাদের পুরো রবীন্দ্রসদন, নন্দন কমপ্লেক্স ধরে যায়।
-না, না সে সমস্ত সব ঠিক। বলি রবীন্দ্রনাথের নামে হত্ অথচ কোথাও তার ছবি বা মূর্তি নেই। অন্যান্য সব এরকম হ ট এ যেন কিছু না কিছু চিহ্ন আছে বলে মনে পড়ে।
নুটু দত্ত এবারে মুখ খোলেন,
—অমলবাবু তো কি সাংস্কৃতিক সংস্থা টংস্থা করেছেন। চিফ মিনিস্টার আপনার কথাই বলছিলেন এইমাত্র। খুবনাকি অ্যাকটিভ অর্গানাইজেশান। তা আপনারা একটা রবীন্দ্রনাথের মূর্তি করে দিতে পারছেন না? দক্ষ ফিল্ডার অমল তৎক্ষণাৎ সুযোগটা লুফে নেয়।
–নিশ্চয় পারি। একতা উইল ফিল অনার্ড টু ডু সো। স্যার, এবারে মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে,
—স্ট্যাচু তৈরি করতে দিই?
—হউক। দিয়স্ত। হেই সারিলে মতে থরে দেখাই নেবে।
—নিশ্চয়।
একতার কার্যনির্বাহী কমিটির পরের অধিবেশনেই কথাটা পাড়া হল–অধিবেশন তড়িঘড়ি ডাকাই হয়েছিল সেইজন্য। সবাই হইহই করে একমত। শুধু সেক্রেটারি সুজিত যেন একটু চিন্তিত।
—কী হল সুজিত, তোমার যেন অনিচ্ছা মনে হচ্ছে?
-না না, দাদা, অনিচ্ছার প্রশ্নই উঠছে না। আমি খালি ভাবছি রবীন্দ্রমণ্ডপের বিল্ডিং এ ঢুকে সামনে যে জায়গাটা তার দেওয়ালে তো রবীন্দ্রনাথের একটা বিশাল রঙিন ছবি রাবর টাঙানো ছিল। সেই পরিচিত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো, সেটা গেল কোথায়?
-রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিল না কি? কবে ছিল? কই আমরা ভুবনেশ্বরে এসে অবধি তো দেখি নি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছিল, তোমরা তো সেদিন এসেছে, আগে ছিল, সুজিত ঠিকই বলছে পি ডবলিউ ডি চুনকাম টুনকাম করতে গিয়ে বোধহয় নামিয়েছে, তারপর হয়তো খেয়াল নেই লাগাতে। সরকারি বাড়ি কে এতো দেখে. সদস্যদের মধ্যে আলাপ আলোচনায় সুজিত একেবারে চুপ। সে তো সবচেয়ে বেশি বকবক করে। অমলের খটকা লাগে। ওড়িয়াদের ও বোঝে, কিন্তু এই ওড়িশা প্রবাসী বাঙালি অর্থাৎ ক্যারাদের বোঝা তার সাধ্যে নেই। কী যে সবসময় ভাবে কে জানে। আরে মনের কথাটা মুখ ফুটে বললেই তো পারিস, অত ঢাকচক গুড়গুড় কিসের। না সেটি হওয়ার জো নেই। সব সময় মনের মধ্যে কী প্যাঁচ কষছে। একতার সেক্রেটারি হয়ে ব্যাটার লাভ কম। যত বাঙালি মেম্বার সব ওর গাঙ্গুরাম থেকে দইমিষ্টি কেনে। প্রায়ই গেট টুগেদার পিকনিক আউটিং-এ ও সাপ্লাই করে। দিব্যি একখানা সেকেন্ডহ্যান্ড বাড়ি কিনে ফেলেছে শহীদনগরে, মারুতি জিপসি হাঁকাচ্ছে। বড্ড বিরক্ত লাগে অমলের। বলে,
-তাহলে একজিকিউটিভ কমিটি কী ঠিক করল? মূর্তি করা হবে কি হবে না?
–কে তৈরি করাবে এবং কোথায়? চার্জ কে নেবে?
এবারে সুজিত মুখ খোলে।
-কেন, কলকাতায় দিদিভাই তো আছে, তাকেই দাদা ভারটা দিন না।
সবাই একবাক্যে হ্যাঁ হ্যাঁ। আইডিয়াটা প্রথম থেকেই অমলের মাথায় ছিল, তবে প্রস্তাবটা অন্য কারও কাছ থেকে আসা ভাল। সুজিত এদিকে খুব চালু।
-ঠিক আছে, আজ রাতেই বাড়ি ফিরে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে কথা বলব। আচ্ছা, কী রকম মূর্তি হলে ভাল হয় বলতো? ফুল ফিগার না বাস্ট? কিসের তৈরি ব্রোঞ্জ না…
আলোচনার পর ঠিক হল শ্বেত পাথরের আবক্ষমূর্তি। কালো গ্রানাইটের স্তম্ভের ওপর বসানো থাকবে।
