আজকে ঘরে ঢুকেই বলেকি,
—তা সেই কুমার ভানুর মেগাফাংশানের পর কী হইল? আপনি খালি চটেন ক্যান? আমি কি অত সরকারি আইনকানুন কিছু বুঝি? বুঝি খালি রোগী আর গল্প। আপনি হইলেন গিয়া রোগী, আর আপনার কাহিনীটা হইল গিয়া অ্যাকটা গল্প। বলেন বলেন।
চেয়ার টেনে ছোট মেয়ের মতো কাগজকলম নিয়ে অমলের সামনে বসে যায়। অগত্যা। ফিয়ারলেস কোম্পানির উৎসাহ অমলের পরবর্তী অনুষ্ঠানের প্রেরণা। তবে এম ডি অভিজিৎ গুপ্তর প্রবাসী বাঙালি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যা ধারণা তাতে চলে বাংলা আঁতেল নাটক, রবীন্দ্রসঙ্গীত নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল অতুলপ্রসাদ, সাহিত্যসভা ইত্যাদি। অমলের কাছে গানটান ঠিক আছে। কিন্তু অন্যগুলো বিশেষ করে গ্রুপ থিয়েটারমার্কা নাটকে তার অ্যালার্জি। খালি সেই গরিবের শ্ৰেণী-সংগ্রাম শোষণ অথবা বিলিতি নাটকের কপি। তার চেয়ে বাবা আদি অকৃত্রিম স্টার রঙমহল কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চ, বিজন থিয়েটারের জমাটি পালা ভাল। অর্থাৎ যাকে আঁতেলরা ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেন বাণিজ্যিক রঙ্গমঞ্চ। অমল বা মৈত্রেয়ী এবং একতার বেশির ভাগ সদস্য নবনাট্য আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে না। তবে সৌম্যেন রণজিৎ এক্স-প্রেসিডেন্সি। তারা ওসব জানে ফানে। বিভিন্ন সংস্থার নাম টামও কণ্ঠস্থ। এ একটা জগৎ অমলের সম্পূর্ণ অচেনা। সে বম্বে মাদ্রাজ এমন কি ঢাকা থেকেও সুপারস্টার আর্টিস্ট এনেছে। কিন্তু নিজের রাজ্যর কোনও উচ্চকোটি নাট্যসংস্থার সঙ্গে সে রকম যোগাযোগ হয়নি। একতার সদস্যদের মধ্যে জানাশোনা কার আছে খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ল কলকাতার শুভম গোষ্ঠীর পরিচালক নাট্যকার সরোজ মিত্রের সঙ্গে একক্লাসে পড়ত রিজিওনাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির কৃষ্ণেন্দুব্যানার্জি। ব্যস হয়ে গেল। কৃষ্ণেন্দুকে কলকাতায় পাঠানো হল সরোজ মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ, কথাবার্তা বাজেট, আনুমানিক তারিখ ইত্যাদি আলোচনা ধাপে ধাপে এগোতে থাকে। ক্রমে বলাবাহুল্য অমলের সঙ্গে টেলিফোনে শুভ নাট্যসংস্থার সভাপতি সুরজিৎ চক্রবর্তীর যোগাযোগ হয়।
এরই মধ্যে কোন এক পর্যায়ে জানা গেল মৈত্রেয়ীর স্কুলের টিচার ছন্দা বিশ্বাস নাকি শুভম গ্রুপে আছে, সাইড রোল করে। মৈত্রেয়ীর উৎসাহ দেখে কে। নিজে অগ্রণী হয়ে সরোজ মিত্রের সঙ্গে আলাপ করে ফেলে, বলা বাহুল্য ছন্দা বিশ্বাসের মারফত। তারপর প্রায়ই অমল টেলিফোনে শোনে নাট্যকারের মাহাত্ম্য বর্ণনা, তার কোন নাটক কী পুরস্কার পেয়েছে, বাংলায় যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন নাট্যকার মৌলিক নাটক লেখেন ইনি তাদের মধ্যে প্রধান, এঁর সব নাটকে সামাজিক ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান ইত্যাদি। প্রায়শই নাটক পর্যালোচনা অমল শোনে। যদিও সে আদার ব্যাপারী, জাহাজ সম্বন্ধে মাথাব্যথা নেই। তার চিন্তা এঁরা কজনের দল, সেট কী ভাবে আনবেন, ট্রেনে না বাসে। ট্রেনে হলে সকলেই কি সেকেন্ড ক্লাস নাকি মুখ্য কজনের এসি চেয়ার বা স্লিপার। কদিনের থাকার বন্দোবস্ত। কেউ ভেজ আছে কি না ইত্যাদি। ভুবনেশ্বরের সব গেস্ট হাউস অমলের জানা। তবে এত লোককে রাখতে হলে একটু কাঠখড় পোড়াতে হবে। অর্থাৎ কারা একতাকে, মানে অমলকুমার দাসকে সুবিধা দিতে রাজি এবং কী মূল্যে? কোন সুযোগ বা কী সাহায্য পাবার পরিবর্তে বা আশায় সেটা পরিষ্কার থাকা দরকার।
মৈত্রেয়ীর সঙ্গে অমলের এ সব নিয়ে প্রায়ই কথা হয় টেলিফোনে। শোনে মৈত্রেয়ী ইতিমধ্যেনাট্যকার পরিচালকের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে শুভমসংস্থার দুখানা শো কমপ্লিমেন্টারি পাস-এ অ্যাকাডেমিতে দেখে ফেলেছে। একেবারে মোহিত মৈত্রেয়ী। অবাক অমল টেলিফোনে তার উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া পায়। সেরকম গরিব-টরিব নিয়ে আতলেমি, সি পি এম মার্কা জেহাদ না কি নেই। সব সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক। অমলের নিশ্চিন্ত লাগে। দীর্ঘ মনোমালিন্যের পর স্বামী স্ত্রী যেমন কোনও তৃতীয় ব্যক্তির প্রশংসা বা নিন্দায় এক হয়। জীবনটা কি সর্বদাই ত্রিভুজ। কেবল দুজন মানেই সংঘর্ষ, তৃতীয় বাহুর ওপর ভর করে ভারসাম্য বজায় থাকে।
মৈত্রেয়ীর বাংলা আধুনিক নাটকে উৎসাহের সঙ্গে অমলও এবারে পাল্লা দিতে নামে। বাঙালি সংস্কৃতি প্রচারে তার বরাবরের একটা বিশিষ্ট অভ্যাস আছে। গোটা কতক ইংরিজি গীতাঞ্জলি তার সর্বদা কেনা থাকে। যখনই ওড়িশায় কোনও মন্ত্রী, অধ্যাপক-সাহিত্যিকদের একতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিশেষ অতিথি সভাপতি হিসেবে নিমন্ত্রণ করতে যায় একখানা করে ইংরিজি গীতাঞ্জলি উপহার। সকলেই খুশি এবং অবধারিত মন্তব্য, মু তো অরিজিনাল বঙ্গলাটা পড়িছি। হউক। নোবেল প্রাইজ পাইবা বহি, খন্ডে আনিলে, ভল হেলা। অমল নিজে সত্যি কথা বলতে কি গীতাঞ্জলি বাংলা বা ইংরিজি কিছুই পড়েনি। তবে হ্যাঁ যে সব কবিতা গান হয়েছে, সেগুলোর ক্যাসেট অমলের কেনা। মাঝে মাঝে শোনে। এক আধটা কলি স্নানের সময় গুনগুন করে।
মন্ত্রিত্ব বদলে যাবার পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন হয়েছে। এবারেতাকে এককপি গীতাঞ্জলি দেবার কথা। সামনে ৮ই মে, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। সেটাকে ছুতো করে আলাপ-সালাপ আরও একটু ঘনিষ্ঠ করার ইচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর ইলেকশান ক্যামপেনে অমল বেশ কখানা গাড়ির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। প্রতিটি অ্যামসাভারের সঙ্গে ট্যাংক ভর্তি পেট্রোল ও ড্রাইভার। হাজার হলেও কংগ্রেস অমলের রক্তে, শিরায় শিরায়। পরিবারের সঙ্গে মৈত্রেয়ীকে কেন্দ্র করে মনকষাকষি যাই হোক না কেন এ কথা তো মুছে যায় না যে তারা উত্তর কলকাতায় বিশেষ করে তাদের ওই বিবেকানন্দ রোড কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের মোড়ের খাস ঘটি এলাকায় কংগ্রেসের খুঁটি। পশ্চিমবঙ্গে হাড়হাভাতে বাঙাল রিফিউজিদের জন্য সি পি এম আদি ঘটিদের কোণঠাসা করে রেখেছে। ওড়িশাতে তো নয়। এখানে অমলের একটা দাঁড়াবার জায়গা আছে। হাঁক দিলে পাঁচটা লোক শোনে। মন্ত্রিদের ঘরে তার অবারিতদ্বার। বিশেষ করে শিল্পমন্ত্রী তো তার পেছনে শক্ত দেওয়াল।
