হ্যাঁ, সেই ফিয়ারলেস-এর এম ডি স্বয়ং অভিজিৎ গুপ্ত, যাঁর সমস্ত ভারতবর্ষে নাম আর্থিক লেনদেনের যাদুকর, তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ক্ষতির অঙ্কটি পূরণ করলেন। অবশ্য গুপ্তর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তার আগে বছর পাঁচেক ধরে। বহু বার ওঁর কাছে গিয়েছি যথাসম্ভব করেছি। তবুও সাহায্য করাটা ওঁর তো সম্পূর্ণ মর্জির ওপর। মুশকিল হল টাকাটা দেওয়ার সময় আমাকে একটা কথা বললেন,
–এসব মেগা ফাংশান টাংশান কী করেন? প্রবাসী বাঙালি সংস্থা বম্বে থেকে আর্টিস্ট এনে হিন্দি ফিল্মের নাচগান করছে কেন? বাংলা গানের অনুষ্ঠান করুন। বাংলা নাটক আনান। কত ভাল ভাল গ্রুপ থিয়েটারের দল রয়েছে কলকাতায়। অনেক কম খরচ। খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতি। কী এসব হিন্দিফিন্দি করেন। টিকিট বিক্রি হবে না ভাবছেন? না হোক। শুধু ইনভিটেশানে অনুষ্ঠান করুন। আমি স্পনসর করব।
অভিজিৎ গুপ্তর এনথু পেয়েই কি আমার ভুবনেশ্বরে অবস্থিতির শেষ পর্যায়ে বাংলা বাংলা করে মেতে ওঠা? না কি মনে হল এবং কাজে দেখলাম এই একটা ক্ষেত্র যেখানে মৈত্রেয়ী ও আমি আবার পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারি? ও সাহিত্যের ধার ধারে না, আমি না, তা হলে? হ্যাঁ, প্রচুর বাংলা গান, আধুনিক রবীন্দ্রসঙ্গীত অতুলপ্রসাদ ফোক, ওর কণ্ঠস্থ। আমিও গানটান শুনি। দু-চারকলি মনেও থাকে। মাছভাত খাই। শরৎকালে নীল আকাশ দেখলে পুজোর বাজনার জন্য প্রাণটা অস্থির অস্থির করে। শুধু এই কি বাঙালি অস্তিত্ব যেখানে আমরা দুজনে মিলিত হই? এমনতো কত কোটি বাঙালির।
.
অমল দেখে ছায়া দেবনাথের আজকাল আর কাজেকর্মে মন নেই। আগে তবু এসে নিয়মমাফিক টেম্পারেচার দেখত, রক্তচাপ মাপত, ওষুধ পত্র এগিয়ে দিত। তারপর তার ছায়াবাজি নিয়ে বসত, এখন সেসব উঠে গেছে। এইতো আজ ঘরে ঢুকেই চেয়ারে বসে পড়ে জিজ্ঞাসা,
-আচ্ছা, ভুবনেশ্বরে আপনার একতা ক্লাবের শেষ ফাংশান কোন্টা বললেন না তো? যেন অমলের জীবনকাহিনী লিখে যাওয়াই তার একমাত্র কাজ। আর কোনও কাজ নেই। অমল না বলে পারে না,
—তা তোমার কী সর্বদা ওই এক চিন্তা? আমার জীবনে কী ঘটেছিল?
–আহা, গল্প একটা চলতাসে। তারপর কী হইল জানুম না?
–উঃ তোমার ওই বাঙাল ভাষাটা একটু ভদ্রস্থ করবে। কানে লাগে।
—ভাষার কথা সাড়েন। আমরা তো তবু বাঙালি আছি। বর্তমান কাল। আপনারা তো বাঙালি সিলেন। অতীত কাল। একদিন বাঙালি সিলাম রে, সুর করে গেয়ে ওঠে ছায়া।
-ওই বোকাবোকা গানটা আমার সামনে গাইবে না। একদিন বাঙালি ছিলাম মানে? আজকে আমরা নই? অমল রাগরাগ স্বরে বলে।
-ওই, আপনাদের কি মেগাফাংশান করবার কথা ছিল। টি আই এল-এর গীতা থাপার স্পনসর, তার কী হল? শেষ পর্যন্ত ফাংশান হল? এখন কেমন দিব্যি স্বাভাবিক বাংলা বলছে। মেয়েটা বড্ড পাজি।
—হ্যাঁ, দিব্যি হল। অ্যান ইভনিং উইথ কুমার ভানু। কটক ইনডোর স্টেডিয়ামে কুমার ভানুর সঙ্গে একটি সন্ধ্যা। ইট ওয়াজ আ গ্র্যান্ড সাকসেস। কী ভাবো কী অমল কুমার দাসকে? কত গীতা থাপারকে আমি একহাটে কিনে অন্য হাটে বেচেছি। স্পনসরের অভাব আছে? ফিয়ারলেস কোম্পানি যেচে টাকা দিল। বিশাল ফিনানসিয়াল কোম্পানি ওই ফিয়ারলেস। কত স্টেট গভর্নমেন্টকে টাকা ধার দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল। জানো তো বাঙালির কোম্পানি?
—না আমি ওসব খবর রাখি না।
—তা রাখবে কেন। তোমরা বাংলাদেশিরা আছ কেবল পশ্চিমবঙ্গের খুঁত ধরতে। আচ্ছা তোমরা তো বিদেশি, এমন আরামসে কলকাতায় চাকরিবাকরি করছ কী করে? এদিকে আমাদের মেয়েরা তো কাজ পায় না। ছায়া দেবনাথের মুখের ভাব পাল্টে গেল।
-দেখুন আমি এখানে কী ভাবে আছি কোথাকার নাগরিক এ সমস্ত কথা আপনার সঙ্গে আলোচনা করব না। আপনি তো পুলিশ নন, পেসেন্ট। আপনার ওসব কথায় লাভ কী।
বাপরে। এ তো মেয়ে নয় নেতা নিশ্চয়। অমল ঠিক করে ফেলে পরের দিন ডাক্তার রাউন্ডে এলে কথাটা পাড়বে।
পাড়ে। না, কোনও পরিষ্কার জবাব নেই। মেট্রনের ভাষাভাষা উত্তর। পশ্চিমবঙ্গে নার্সিং ট্রেনিং-এ প্রবেশ বা ভর্তি হওয়াই এত শক্ত। পঞ্চাশ বছর আগে যা যযাগ্যতা চাওয়া হত এখনও তাই। তখন সাধারণ ঘরের মেয়েদের দুটিই জীবিকা ছিল–নার্সিং আর বাচ্চাদের ইস্কুলে টিচারি। তাই একটু ভাল পড়াশুনা জানা মেয়ে পাওয়া যেত। এখন মেয়েদের চাকরির ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। যে সব মেয়ের অত যোগ্যতা আছে তারা আরও অর্থকরী আরও সম্মানের কাজ পাচ্ছে। তা ছাড়া প্রচুর সংখ্যায় মেয়ে বাড়ির বাইরে বেরচ্ছে কাজের ধান্দায়। কাজেই প্রতিযোগিতা সাংঘাতিক।
অমল অবাক হয়ে মন্তব্য করেছিল, সেক্ষেত্রে বাইরের এত মেয়ে আসছে কী করে? তা ছাড়া রাজ্যের বাইরে থেকে আদৌ যদি নিতে হয় তা হলে কি বিদেশ থেকেও নেওয়া হবে? বাংলাদেশ তো আইনের চোখে অন্য দেশ না কি? ডাক্তার মেট্রন কথাটা শুনতেই পেলেন না। তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে গেলেন।
দুদিন ছায়া দেবনাথের পাত্তা নেই। কোনও ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় না তার অনুপস্থিতির। তিন দিনের দিন আবার হঠাৎ হাজির। সেই একমুখ হাসি। পরনে সেই এক সাদা কোট যা দেখে অমল প্রথম দিনই জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি নার্সের ড্রেস পর না? কোট তো ডাক্তাররা পরে।
-স্পেশাল পারমিশান, স্পেশাল পারমিশান। হৈ হৈ করে দুদ্দার কাজে লেগেছিল ছায়া।
