আমাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দুরত্বের প্রবলস্রোতে উজান ঠেলে উৎসে ফিরতে চেয়েছিলাম। যেনতেন-প্রকারেণ। যাকে বলে সর্বাত্মক চেষ্টা এমন একটা প্ল্যান চাই। এমন একটা কার্যক্রম যাতে দুজনে মেতে যাব একসঙ্গে পাশাপাশি আবার কাজ করব। কাজের মধ্যেই তো এক হওয়া যায়। একটা মেগাফাংশান দরকার যেখানে আমার কৃতিত্ব, আমার গৌরব সব কিছু ছাপিয়ে যাবে। যার পটভূমিতে আমার ইমেজ হবে একটা বিশাল, লার্জার দ্যান লাইফ কার্ডবোর্ডে টেকনিকালার চিত্র, যেন জয়ললিতা কি অমিতাভ বচ্চন। তাই তো
প্ল্যান করলাম কটকে ইনডোর স্টেডিয়ামে বম্বের টপস্টারকে নিয়ে বিচিত্রানুষ্ঠান, অ্যান ইভনিং উইথ কুমার ভানু। বাঙালি ভবেন চক্রবর্তী বম্বে গিয়ে অর্থাৎ ন্যাশনাল স্টার হতে গিয়ে নামটাকে বদলে ফেলেছে যাতে বাঙালিত্ব প্রকট না হয়। ছোঁকরা এখন একেবারে টপে–এই নিয়ে পরপর কবার ফিল্মফেয়ার অ্যানুয়েল বেস্ট মেইল সিংগার অ্যাওয়ার্ড পেল। তাকে ধরা কি চাট্টিখানি কথা। কতমাস আগে থেকে এই কুমার ভানুর পেছনে পেছনে লেগে আছি। হেড অফিসে ট্যুর ফেলে ফেলে তাকে বারবার খোশামোদ ওনলি ফিস-এ খাতির যত্ন কলকাতায় তার প্রোগ্রামের সময় সেখানে ছুটি নিয়ে গিয়ে ধরা। শুধু ধরা নয় কোয়ালিটি-ইন-এ ভেটকি পাতুরি আর চিংড়ি-মালাইকারি খাওয়ানোনা, কুমার ভানুর টাকার অভাব নেই। সে কি আর এসব খেতে পারে না। এসব হচ্ছে দস্তুর। কুমার ভানুকে ওড়িশায় আনার পিছনে যে লম্বা ইতিহাস তাতে খরচের চেয়ে বড় কথা ঝামেলা। যাই হোক সব প্রোগ্রাম পাকা।
এমন সময় কিনা মেন স্পন্সর গীতা থাপারের টি আই এল আমাকে পথে বসালে। ভেরি সরি মিঃ দাস। কিন্তু দেখছেন তো কোম্পানির একটার পর একটা লাগাতার ক্রাইসিস। ইনকামট্যাক্স রেইড, ফেরা ভায়োলেশানের চার্জ, শেয়ারবেচাকেনা নিয়ে এনকোয়েরি…।
গীতা থাপারের ঠোঁটের রং কিন্তু তেমনি অত্যাধুনিক গাঢ় খয়েরি অর্থাৎ কি না মাটির রং বা আর্থকালার রয়েছে। গলে ফ্যাকাশে হয়নি একটুও এত সংকট সত্ত্বেও। বিজ্ঞান ও কারিগরির কী মাহাত্ম।
গীতা থাপার পিছু হটল। উপুড় হাত চিত হল। তবু আমি কুমার ভানুকে ওড়িশায় আনতে পেরেছিলম। কী ভাবে যে শুধু আমিই জানি। টিকিট বিক্রির টাকায় অনুষ্ঠানের খরচ ওঠে না, আর কটক ভুবনেশ্বরে কীইবা এমন বিক্রি। আমজনতা কেনে সবচেয়ে সস্তার টিকিট। যারা সমাজের উপরতলার মানুষ অর্থাৎ রেস্তদার, বেশিদামের টিকিট কিনতে পারেন তারা বিনে পয়সার নিমন্ত্রণ পেতে অভ্যস্ত। অগত্যা অজন্তা টি ভি আর রুবার্ড রেফ্রিজারেশান, এ দুটো কোম্পানির আনুকুল্য জোটাতে হল। দুটোরই স্থানীয় প্রতিনিধি একজর সদস্য, তাছাড়া দুটো সংস্থাই ওড়িশায় অদূর ভবিষ্যতে কিছু করতে চায় এবং আই পি বি আই অর্থাৎ আমার সাহায্যপ্রার্থী।
অতএব ঠিক দিনে শুভমুহূর্তে কুমার ভানু ও তার নবতম সঙ্গিনী হাজির। বাদ সাধল অর্কেস্ট্রা। দেনাপাওনার গণ্ডগোলে শেষ মুহূর্তে এসে পৌঁছল না। আজকালকার গাইয়েরা সম্পূর্ণভাবে অর্কেস্ট্রা নির্ভর। সেই কবে হারিয়ে গেছে শ্রী রামচন্দ্রের জমানা যখন শুধু হারমোনিয়ামটি কোলের কাছে, শিল্পীরা গেয়ে চলেছেন গণ্ডাগণ্ডা গান, সঙ্গতে সবেধন নীলমণি তবলচি এবং তাতেই আপামর শ্রোতাজনতা মন্ত্রমুগ্ধ ঘন্টার পর ঘণ্টা। এখন যত বড় আটিস্ট, যত নামকরা শিল্পী, সঙ্গে তত বেশি বাদ্যযন্ত্রের আসর। তত লেটেস্ট সাউন্ড সিস্টেম।
কটকের সে সন্ধের কথা মনে এলে এখনও ঘাম হয়। সেপ্টেম্বর মাস। বাইরে ভাদ্রের অসহ্য পচা গরম। একবার ইনডোর স্টেডিয়ামের ঠাণ্ডায় ঢুকছি পরক্ষণেই বেরোচ্ছি আর হাঁচছি। যদিও গেটের কাছে একতার দুজন একজিকিউটিভ কমিটির সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক মজুত। লোকজন এসে গেছে, স্টেডিয়াম প্রায় ভর্তি, কুমার ভানু ও কুমারী দীপিকার সাজপোশাক প্রসাধন সব শেষ। কিন্তু অর্কেস্ট্রা তখনও এসে পৌঁছয়নি। আমি তো চোখে অন্ধকার দেখছি, সুজিতের নার্ভাস ব্রেকডাউন হবার উপক্রম।
হঠাৎ মনে পড়ল কটকে শ্যাডোজ নামে স্থানীয় ছেলেদের একটা অর্কেস্ট্রা পার্টি আছে। একতার ছোট ফাংশান গেটটুগেদার-এ সর্বদা ডাকি। প্রতিবছর বেশ কবার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। সেদিন বিকেলে তাদের ডেকে বললাম এই একটা তোমাদের ওয়ান্স ইন এ লাইফটাইম চান্স। বোম্বের টপ আর্টিস্টের সঙ্গে বাজাবে। ওড়িশাতে আর কেউ তোমাদের কোনওদিন এ চান্স দিতে পারবে না। কী বল বাজাতে পারবে তো?
এদিকে নিজের বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছে। যদি না বলে তো কী করব? বলল না। ছেলেগুলি নিরীহ গ্রাম্য, মহানগরের গ্ল্যামার তাদের কাছে স্বপ্ন। হাজির হয়ে গেল মঞ্চে। যার যা সেরা পোশাক আছে বা শেষমুহূর্তে ধারটার করে জোটাতে পেরেছে, তাই পরে। হ্যাঁ, অনুষ্ঠান একখানা হল বটে। সারা ওড়িশায় কখনও এমন হয় নি। হিউজ সাকসেস। কিন্তু তার আগে এমন টেনশান যে এতবার বলেবলে মুখস্ত করা স্পিচটা অর্ধেক ভুলে গেলাম। কোনওক্রমে চ্যারিটির চেকটা মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ধরানো গেল। খবরের কাগজ টিভির ক্যামেরা অবশ্যই রেডি। তাদের কাজে ক্রটি হল না।
শুধু টেনশনই নয়। মেগাফাংশান করার আসল ড্যামেজ তো পকেটে, একতার ভাড়ে মা ভবানী। মোটা ডোনেশান দিয়ে আমার মুখ এবং একতার প্রাণরক্ষা করল বাঙালি ফিনানসিয়াল কোম্পানি ফিয়ারলেস, যারা কলকাতার স্ব মোক্ষম জায়গায়, ইএম বাইপাসে বিশাল বিশাল হোর্ডিং-এ বিজ্ঞাপন দেয় জনগণকে ছাড়া কাউকে ভয় পায় না ফিয়ারলেস।
