অমল কোনও উত্তর দেয় না। থেকে থেকে কী যে তার হয়। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ইচ্ছে করে না। মরুক গে যাক ছায়া দেবনাথ।
—কী আবার চইট্যা গ্যালেন নাকি? আপনার সাথে কথা কওন যে কী ঝকমারি, আচ্ছা বাঙ্গালির কথায় আজ নাই। ন্যান্, আপনার আর মৈত্রেয়ীর কাহিনীটাই চলুক।
—অন্য দিন হবে। আজ আর ভাল লাগছে না।
৬. রোগীর সঙ্গে বন্ধুত্ব
ছায়া দেবনাথের গবেষণা, কেস নং ৯
রোগীর সঙ্গে এখন আমার অর্থাৎ অল্প শিক্ষিত বাঙাল নার্সরূপী আমার বেশ বন্ধুত্ব। নড়বড়ে হলেও যোগাযোগের একটা সেতু স্থাপন করা গেছে। একদিন তা নিয়ে বিকট পরিহাসও হল। তুমি যদি দীপ জ্বেলে যাই মার্কা সেবিকা হতে চাও তাহলে খোমাটা আগে পালিশ করে আনন। কোথায় সুচিত্রা সেন আর কোথায় ছায়া দেবনাথ। হরিদ্বার আর গুহ্যদ্বার। হাসিমুখে শুনি। জানি মুখ খারাপ করা যৌন অবদমনের লক্ষণ।
রোগীর স্মৃতিমন্থনে একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি। অতীতের কোনও কোনও অংশে একটা নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতি যেন ফ্লাড লাইট পড়ে–দৃশ্যটি আদ্যপ্রান্ত সমস্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ এক বারে জীবন্ত হয়ে ওঠে যেন অতীত নয় বর্তমান, এখনই ঘটছে। আবার জীবনের এক বিরাট অংশে ঘোর অন্ধকার। জানি স্মৃতি মহাফেজখানা নয়। জীবনের সব অভিজ্ঞতা অনুভূতি যথাযথ সংরক্ষণ সম্ভব হয় না। ঝাড়াই বাছাই বাদ-ছাদ স্বাভাবিক। সুস্থ মানুষ বেদনাদায়ক ঘটনাগুলি মনে রাখে বটে কিন্তু তার যন্ত্রণাটা আর বোধ করে না। সেগুলি যেন বহুকালের পুরনো অস্ত্রোপচারের দাগ, শুধু চিহ্ন, ব্যথা কবে সেরে গেছে। অমলকুমার দাসের কাছে স্মৃতি পুনরুদ্ধার এত দুরূহ নে?
সেদিন ছায়া দেবনাথ ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন করল,
–আচ্ছা এই যে আপনারা বিয়া-সাদিকরলেন না অথচ আপনার হিরোয়িন ভুবনেশ্বরে আইস্যা বাড়িতে থাকে। এদিকে আপনি ব্যাচেলার মানুষ একলা, কেউ কিছু বলত না?
—প্রথম প্রথম আমি সম্পর্কের বোন বলতাম। কলকাতা হলে আমি দাস মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী আমাদের আগের জেনারেশানে জাতপাত না মেনে বিয়ে থা হয়েছে বিশ্বাস করানো সোজা ছিল না। আসলে কি জানো বিদেশে থাকার এইটাই মস্ত সুবিধা, তুমি নিজের সমাজ থেকে দূরে, আবার যেখানে আছ সেখানকার সমাজের ভেতরেও ঢাকনি। প্রবাসী মানেই প্রাবাসী। ভুবনেশ্বরে আমার পরিচয় ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশানের ম্যানেজার। জাতে বাঙালি, ব্যস। দুটি মাত্রাই সব। আমার ব্যক্তিগত জীবন পরিবার শিক্ষাদীক্ষা সংস্কৃতি জীবনযাত্রা মতামত, এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। মৈত্রেয়ী সম্বন্ধেও তাই। হ্যাঁ, একতার সদস্যদের কৌতূহল ছিল সন্দেহ নেই। তারা ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে সহজে। হয়তো মৈত্রেয়ী মাঝে মাঝে আসত বলে। আসল কথা সময়। এসবে আসতে আসতে আমাদের দুজনেরই যৌবন গতপ্রায়। মৈত্রেয়ীর বাবা স্বর্গে, মা সম্পর্কটা মেটে নিয়েছেন, ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে হস্টেলে। অতএব, ফ্রিডম অ্যাট মিডলাইফ। মৈত্রেয়ী মিশুকে মেয়ে তারপর হেডমিস্ট্রেস, একতার সবাইয়ের দিদিভাই হয়ে উঠতে দেরি হয় নি। তার চেষ্টা ছিল সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের। কারণ ভুবনেশ্বর তার কাছে একঘেয়ে ক্লান্তিকর চাকরি ও প্রাত্যাহিক সাংসারিক জীবন থেকে অব্যাহতি অবসর বিনোদন। এখানে সে আমার গাড়িতে চড়ে, ক্লাব-হোটেলে খায়, ভাল শাড়ি পরার সুযোগ পায়। রোজ পার্টি গল্পগুজব হৈ হৈ। আর ফাংশান থাকলে তো কথাই নেই। প্রতিবারেই মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে, হয় বিশেষ উপহার নিচ্ছে, নয়তো প্রধান অতিথিকে মালা দিচ্ছে। মোটমাট সি হ্যাজ ফান।
—তা হলে আপনি ছিলেন মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর উইকএন্ড। কিছু মনে করবেন না। তার জন্যই কি আপনার হিরোয়িন এতকাল টিকল না কি?
অমল চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না। খানিক পর আস্তে আস্তে বলে,
–তুমি এখন যাও। আর কথা বলতে ভাল লাগছে না।
বেশ কদিন অমলের কথা বলতে ভাল লাগল না।
.
মৈত্রেয়ীকে ভুবনেশ্বরে আনার জন্য আমি এত ব্যগ্র থাকতাম। যখন ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে অল্পবয়সি মেয়েদের গায়ের গন্ধ শুকতাম, তখনও। যদিও ও বেশির ভাগ সময় কলকাতায় থাকত, তবু ওর অনুপস্থিতিতে কেন যেন আমার নারী সংসর্গে লোভ হত না। ও যখন কাছে আসত, তখনই আমার অন্য স্ত্রীলোকের প্রয়োজন। ওকে কষ্ট দিয়েই কি আমার উত্তেজনা, ওর যন্ত্রণা ওর অপমান আমার কাছে পালঙ্কজোড় বটিকা। নিজের কাজে নিজেকে ওর নিশ্চয় হেয় লাগত। অবশ্য এমন একটা বিন্দুতে কখনই পৌঁছতে চাইনি যেখানে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছেদ হয়। আমার বরাবর ধারণা নারী-পুরুষের ভালবাসার ভিত্তি দেহজ কামনা। ওবেরয় ভুবনেশ্বরে মৈত্রেয়ীর সেই কাণ্ডতে বুঝলাম ওটা প্রায়ই একটা অস্ত্রমাত্র, ধ্বংস করে, জোড়া লাগাতে পারে না।
আমরা একে অন্যকে দেখতে পাই, উপস্থিতি অনুভব করি, কিন্তু ছুঁতে পারি না। দুজনেই দুজনের নাগালের বাইরে। অ্যাকশান ফিল্মে যেমন দেখা যায় রোমহর্ষক দৃশ্য। নায়ক নায়িকা পাহাড়ি খরস্রোতা নদীতে পড়ে গেছে, প্রবল স্রোতে পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ক্রমে দেখা যাচ্ছে একজনের হাত অন্যজনের মাথা, প্রাণপণ চেষ্টা দুজনেরই স্রোতের বিরুদ্ধে যাবার। এদিকে সামনে আসছে এক বিশাল ঢল, নদী শতধারায় জলপ্রপাত হয়ে পড়ছে সেই কতনীচে, তার তরঙ্গাভিঘাতেনায়ক নায়িকার অস্তিত্ব কোথায়? তবে সিনেমায় তো এসব ক্ষেত্রেও চমৎকার কাকতালীয় কিছু ঘটে, শেষরক্ষা হয়। বাস্তবে নায়ক নায়িকার কী হয়?
