—টিকিট না কার্ড?
—রবীন্দ্রমণ্ডপে আপনাকে আমাকে সবাই চেনে। তাছাড়া পট্টনায়েক আপনার এত বন্ধু সে একটা ব্যবস্থা করবে না?
করল। অমল ও দিলীপ যথাসময়ে হাজির রবীন্দ্রমণ্ডপে। এত অল্প সময়ের নোটিসে একতার অন্যান্যদের জন্য ব্যবস্থা করা যায়নি। অতএব শুধু তারা দুজন। সে এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। মঞ্চ জমজমাটি। কলকাতা থেকে বেশ বড় দল এসেছেন। সঙ্গে এক জাঁদরেল মন্ত্রী। নামকরা সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়, অত্যন্ত বিখ্যাত ও অগ্রণী কয়ার গ্রুপ, মুক অভিনেতা সোমেশ দত্ত আরও অনেকে। সামনে রবীন্দ্রমণ্ডপের ওপর তলায় নীচে সারি সারি আসন। সব শূন্য। হল এত খালি যে মাইকের কথা গান প্রতিধ্বনি হতে লাগল। ফার্স্ট রোতে কজন দর্শকশ্রোতা, সকলেই অমলের চেনা। জনা তিনেক বাঙালি আই এ এস সপরিবারে, নামী ওড়িয়া কবি সাহিত্যিক আমলা মিলিয়ে জনা আষ্টেক। একবার একটা বিখ্যাত অ্যাবসার্ড ড্রামার কথা অমল শুনেছিল—দ্য চেয়ার্স। সেখানে দর্শকের বদলে পর পর চেয়ার বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নাটকের মর্মার্থ হল যা বলতে চাই যা দেখাতে চাই তা শোনবার কেউ নেই। অমলকে বুঝিয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাল ছেলে ওয়াই অর্থাৎ সৌম্যেন। অমল অবশ্য নাটকটার কোনও মাথামুণ্ডু পায়নি। আজকে চোখের সামনে দেখল। গাইয়ে বাজিয়ে বলিয়ের দল একের পর এক নিজেদের যা করণীয় স্বভাবসিদ্ধ নিপুণতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করে গেলেন। শোনার দেখার কেউ নেই।
ভাগ্যে ছিল না। প্রধান অতিথি সি পি এম মন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে তার দীর্ঘ ভাষণে প্রচুর ব্যাখ্যা করলেন। ওড়িশা ও বাংলার দীর্ঘদিনের প্রীতির সম্পর্ক, দুই রাজ্যের একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইত্যাদি। তারপর ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের নেতৃত্বে শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটতে যাচ্ছে, তার ফলে হাজার হাজার নতুন চাকরির সংস্থান হবে এবং সেগুলির সুযোগ গ্রহণ করবার জন্য ওড়িশা থেকে দলে দলে কর্মপ্রাথীকে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে পশ্চিমবঙ্গে আমন্ত্রণ জানালেন।
অমলের পাশে বসা অশোক ঘোষ আই এ এস বাগবাজারের ছেলে। মন্ত্রীর ভাষণ শেষ হলে বলে ফেললেন,
–লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলে বেকার। স্টেট তাদের চাকরি দিতে পারে না, স্টেটের বাইরে তাদের জায়গা নেই। আর তুমি শালা সি পি এম এখানে এসে ইন্ডিয়া মারাচ্ছো।
কংগ্রেসি হয়েও সেদিন অমল বামফ্রন্ট সরকারের অপূর্ব কর্মকুশলতার প্রশংসা না করে পারেনি। ভাগ্যে সিট সব খালি ছিল। ভাগ্যে এই উদার ভারতীয় আহ্বান ওড়িয়া বেকারদের কানে পৌঁছয়নি। এদিকে তারা তো এমন পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত বামপন্থী স্বাগত অভ্যর্থনা ছাড়াই লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় হোয়াইটকলার কালার সবরকম কাজ করে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দিব্যি করে খাচ্ছে। মাস গেলে মানিঅর্ডার পাঠায় কটক বালেশ্বর ঢেনকানলে। অমল কটি বাঙালি মজদুর, বাঙালি নার্স, বাঙালি ডাক্তার ওড়িশায় দেখেছে? তবে তার এত মাথাব্যথাও নেই। এসবকথা ভাববে সরকার রাজনৈতিক দল। সে ব্যাঙ্কার, তাছাড়া বাঙালি জাতটার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। তবুও আজকের সন্ধ্যায় শূন্য হ-এ বঙ্গসংস্কৃতি চর্চায় উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান শেষে অশোক ঘোষকে জিজ্ঞাসা না করে পারে না।
—স্যার, এরকম একটা কেলেঙ্কারি ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট করলেন কী করে?
–সরকারের হাতে কালচার এইরকমই হয়।
—না স্যার, এটা আমি মানতে পারি না। ওড়িশা সরকার বাইরে কোনও স্টেটে যদি ওড়িয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন তাহলে এই ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে বলে ভাবেন?
-ওয়েল। পারহ্যাপস্ নট। আপনাদের লেফটফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে ব্যুরোক্রেসির বোধহয় কোনও কম্যুনিকেশন নেই।
-ওসবকম্যুনিকেশান ফ্যুনিকেশান বড়বড় কথা। মোদ্দা জিনিস বেসিক এফিসিয়েন্সি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেটাই তো নেই। আচ্ছা স্যার আপনি আজকের এই ফাংশানের কথা আদৌ জানলেন কী করে? ভুবনেশ্বরে তো কেউ জানে না। আমি তো খবর পেয়েছি ওড়িশা সরকারের সূত্রে। একটা পাবলিক ফাংশান হতে যাচ্ছে কোনও ব্যানার নেই, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন নেই, লিফলেট বিলোয়নি। লোকে তো ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারবে না কারণ কেউ কিছু জানেই না। যদি পাবলিসিটি না দিতে পারে তো পাবলিক ফাংশান করা কেন?
–ওখানকার ডিপার্টমেন্ট অফ কালচার-এর সেক্রেটারি আমার ব্যাচমেট, প্রেসিডেন্সিতে আমরা একসঙ্গে পড়তাম। আজ সকালে ও আমাকে টেলিফোন করে বলল এরকম একটা ফাংশান হচ্ছে, চলে আয়, আর আমাদের প্রেসিডেন্সির দু চারজন যারা এখানে পোস্টেড তাদেরও একটু খবর দিয়ে দে। ফ্যামিলিট্যামিলি নিয়ে যেন সব আসে। ওই যে সামনের বেঞ্চ-এ যে কজন বসেছিল সব তারাই।
–ওঁর নিশ্চয় খুব খারাপ লেগেছে। পাবলিক রেসপন্স তো নি।
–কিস্যু না। আমাকে এক্ষুনি বলল ও লিস্ট বার্ড। ওর বউ পুরী কোণারক দেখেনি তাই ভুবনেশ্বরে এই প্রোগ্রামটা করেছে।
.
অ্যাকদিন বাঙ্গালি সিলাম রে, গান গেয়ে ওঠে ছায়া দেবনাথ। সেই অসহ্য বাঙাল উচ্চারণে।
—আপনারা মানে ওয়েস্ট ব্যাঙ্গলের বাঙ্গালিরা অ্যাককেবারে মইর্যা গ্যাছেন গিয়া। কিনাই আপনাগোনা আছে কামকাজ, না আছে ভাষা। না আছে মানসম্মান জ্ঞান। খালি রাম-শ্যাম-যদু-মধুর পায়ে পড়তাসেন। দেখেন আমরা কত ইন্ডিয়ান, বিশ্বাস করেন আমরা শুধুই ইন্ডিয়ান।
