-হউক। নমস্কার আইজ্ঞা। কিছি খরাপ ভাবিবেনি।
এই আভূমিনত বিনয়, অসীম ধৈর্য, অবিচল শান্তি যা সাধারণ গড়পড়তা ওড়িয়া চরিত্রের লক্ষণ বলে মনে হয় তার সঙ্গে যুগযুগান্তের সামন্ততান্ত্রিক দাসত্বের ও শাসকভীতির সম্পর্ক আছে কিনা অমল ভাবছে এমন সময় গটগট করে হাতে দু চাকা বাহনের হেলমেট নিয়ে একটি সপ্রতিভ তরুণের প্রবেশ। কাউন্টারে হাজির।
—বালান্সটা, পাশ বই বাড়িয়ে দিল। কেরানি পাশ বইটা নিয়ে একতাড়া কাগজগুলো কী দেখে পাশ বইতে একটা এন্ট্রি করে ইনচার্জের টেবিলে রেখে বলে, সই। ইনচার্জ তখন ব্যাঙ্কের নবতম ক্লায়েন্ট হতে ইচ্ছুক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা শেষ করতে ব্যস্ত। অতএব, না দেখে তাতে একটা আঁচড় কাটলেন। কেরানি মারফত চলে এল সপ্রতিভ তরুণটির হাতে। তিনি সানন্দে বললেন,–বা বহুত জলদি হেই গেলা।
—সবুপরা কম্পিউটার হেই যাইচি। গম্ভীর সগৌরব জবাব। কাস্টমারের চক্ষু বিস্ফারিত।
–কম্পিউটার!
কাঁই কম্পিউটার? চারদিক অবলোকন। কেরানি তেমনই গম্ভীরভাবে জানায়,
–বাপুজী নগর মেন ব্রাঞ্চে।
ইতিমধ্যে তরুণটির পাশবই খুলে ব্যালান্স চেক করতে গিয়ে আর্তনাদ,
—এ কণ? গলা তিনি মাসর ট্রানজাকসন কই? আপন তো খালি আজির বালান্সটা লেখিলে।
–খালি আজির বালান্স পাইবে। কম্পিউটার পরা হেই যাইচি।
—কিন্তু ট্রানজকশান ন দেখাইলে কিমিতি হব? মোর পরা সেইটা দরকার। তিনিটা চেক বহারে পাঠাইছি পরা।
–বাপুজিনগর যায়। সেইটি ডিটেল পাইবে। নির্বিকার মুখে কেরানির উপদেশ।
-মানে? এই খরারে মু পুনি সেইঠি কহিকে যিবি। এইঠি মোর অ্যাকাউন্ট আর স্টেটমেন্ট পাই মতে অন্য কৌঠি যিবাকু পড়িব। আপনমানে কণ ঠট্টা করুছন্তি?
যাক, ওড়িশা জেগেছে। এতক্ষণে একজন দেখা গেল যার ব্যাঙ্কিং সম্বন্ধে অ আ ক খ জ্ঞান আছে। এত রং দেখাচ্ছে যখন নিশ্চয় বি জে বি কলেজের লেকচারার। তাদের হাতে তো ওড়িশার মাথা মাথা পরিবারের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ, কাজেই মেজাজ তো হবেই। একটা ব্রাঞ্চে অ্যাকাউন্ট আর স্টেটমেন্টের জন্য অন্য ব্রাঞ্চে যেতে হবে তাও এই দুপুরের গরমে। অমলের এবারে মজা লাগে, মন দিয়ে দেখে। এদিকে সমান উঁচু ইনচার্জের গলা।
—এটা কণ ব্রাঞ্চ। এটা পরা এক্সটেনশন কাউন্টার। মেন ব্রাঞ্চে কম্পিউটার বসিচি। সেই সবু দিন সবু আকাউন্টর বালান্স আসে। আমে সেয়া দউ। আমকাম সেদ্ভিকি।
ব্যস খতম। কম্পিউটারাইজেশানের ফলে গ্রাহকদের সুবিধা হল কিনা কে খবর রাখে। কাজ তত বেড়েছে বই কমেনি। প্রতিদিন প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স পাঠাতে হচ্ছে। অযথা কাগজ নষ্ট। এদিকে লেনদেনের রেকর্ড নেই। অতঃপর সপ্রতিভ তরুণটি রাগে গরগর করতে করতে বেরিয়ে গেল। ইনচার্জের মুখও থমথমে।
ইতিমধ্যে মধ্যবয়সি এক ভদ্রমহিলা তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে। চেহারা পোশাক-আশাকে উচ্চশিক্ষা ও ভাল অবস্থার ছাপ স্পষ্ট। হাতে ব্যাঙ্কের পাশবই চেকবই ও একটি কাগজ। তাঁর দিকে তাকিয়ে ইনচার্জের মুখের ভাব ভঙ্গি বদলে গেল। এখন ভদ্রতা ও বিনয়ে বিগলিত।
-নমস্কার মাডাম, বসন্তু বসন্তু, চেক জমা দেবে তো?
—নাহি। মু অসিছি অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করিবাকু।
–কাঁহিকি মাডাম ক্লোজ করিবে? পারলে যেন পায়ে মাথা রাখে এমন গদগদ ভঙ্গি।
–মু তো রিটায়ার কলি। ফ্যামিলি অছন্তি কলিকাতারে। ঘর সেইঠি, ভাবুছি সেইঠি সেক্স করিবি। অ্যাকাউন্টটা এইটি রখি কণ আউ হব? সেইঠি ট্রান্সফার কলে কাম দেব।
শুনতে শুনতে ইনচার্জের মুখে বিনীত নম্র ভাবটি অন্তর্হিত। ঘাড়ও যেন সোজা শক্ত হয়ে ওঠে। গম্ভীর মুখে বলেন,
—সে আপনংকর ডিসিসন। তেবে মু আগরু কহি দউচি কালকাটারে মাডাম ওয়ার্ক কালচার কিছি নাহি। পছরে কহিবেনি…
—এই যে দাদা, হয়ে গেছে। চলুন। বাব্বা, আজকেই এমন ভিড়। দিলীপ টাকা পেয়ে গেছে। দুজনে বেরিয়ে যায়।
সিনেমার দৃশ্যের মতো এখনও অমলের স্মৃতিতে পরপর ঘটে যায়। অথচ এই অকিঞ্চিৎকর ঘটনাটির সঙ্গে বাহ্যত তার জীবনের এই কাহিনীর কোনওই যোগ নেই। নেহাতই অবান্তর। তবু এত জ্বলজ্বল করে কেন? অফিসার ইনচার্জ ভদ্রলোকের মুখের অভিব্যক্তি এত বছর পরেও স্পষ্ট, মনের পর্দায় একেবারে সেভেন্টি এম এম স্ক্রিনের ক্লোজ আপ। কানে গমগম করছে স্টিরিওফোনিক সাউন্ডে কালকাটারে ম্যাডাম ওয়ার্ককালচার কিছিনাহি নাহি নাহি। আস্তে আস্তে মুখটা ছোট হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে পর্দায় লোকটার বাকি শরীর টেবিল চেয়ার অন্য লোকজন ব্যাঙ্কের কাউন্টার। একটা লং শট। আবছা হয়ে আসে। ফেড আউট। এরপরে লেখা থাকার কথা সমাপ্ত। সেটাই শুধু নেই।
.
কারণ বাস্তব তো সিনেমা নয়, সেখানে সমাপ্ত হয় না কোনও কাহিনী। টি ভি-র সোপ সিরিয়েল-এর মতো অনন্তকাল ধরে চলে স্টার প্লাস-এর দ্য বোল্ড অ্যান্ড দ্য বিউটিফুলবা সান্টা বারবারা। এমন কি ডি ডি সেভেন-এ জন্মভূমি পর্যন্ত। কাজেই ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে রাস্তায় যেতে যেতে দিলীপ যে খবরটা দিল সেটাও আজ অমলের মনে আছে।
—শুনেছেন দাদা পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাকি এখানে বঙ্গ সংস্কৃতি সন্ধ্যা করছে?
–তাই নাকি? কোথায় কবে? কই কোনও বিজ্ঞাপন টিজ্ঞাপন দেখিনি তো।
–ওইরবীন্দ্র মণ্ডপে আবার কোথায়। কাল রবিবার সন্ধেবেলা। আপনার বন্ধু অনিলেন্দু পট্টনায়েক ডিরেক্টর অফ কালচার। তার সঙ্গে আমার বস্ নিত্যানন্দ মহান্তির আত্মীয়তা আছে তো, তা বস্ গতকাল আমাকে বলছিলেন।
