-যে থিলা সিকিউরিটি গার্ড সে হেইচি ক্যাশিয়ার। আউ কণ এক্সপেক্ট করুচ্ছত্তি। টেবিলের ওপাশ থেকে পিয়নটির প্রতি নির্দেশ এল।
—অন্তা, এ অন্তা, দেখি শলা কণ করুচি। ঘস্টে লাগি গলা কোড়ি হজার টংকা গোণিবাবু।
অনন্ত উঁকি মেরে দেখতে গেল কুড়ি হাজার টাকা গুনতে এক ঘণ্টা লাগছে কেন। লাইনের মাথায় ক্যাশের সামনে অপ্রস্তুত মুখ মহিলা। এতক্ষণে হাতে টাকাটা পেলেন। গুণতে সুরু করেন লাইন থেকে সরে গিয়ে।
অমল ঘরের চারিপাশে তাকায়। একজন ভদ্রলোক কাউন্টারে কেরানির সামনে একটি চেক রাখলেন। কেরানি চেকটিতে চোখ বুলিয়ে তৎক্ষণাত ভদ্রলোককে ফেরত।
—পাঁচ হজার টংকা। আউ এত্তে দেই হবনি। মাডাম পরা একাবেলে কোড়ি হজার টংকা নেই গলে।
অপ্রস্তুত মুখ মহিলা টাকা গোনা থামিয়ে সসংকোচে বললেন, কণ করিবি। পুঅটা জিদ্দি ধরিচি স্কুটার ন হেলে কলেজ আসিনি। আমে ওয়ার্কিং মাদার সবু বেলে সমস্তকু খালি হাত জোড়ি কিরি অছু। আপনমানে তো বুঝু নাহান্তি।
সকলে চুপ। ছেলের স্কুটার কেনার বায়না মেটানো চাকুরে মায়ের প্রতি কারও কিছুমাত্র সহানুভূতি দেখা গেল না। ভদ্রলোকও যেন কিছু শুনতে পাননি এমনভাবে মিনমিন করে বললেন।
—দেই হব নি? আইজ্ঞা, বড় দরকার থিলা।
–দরকার? টেবিলের ওপরে থেকে ইনচার্জের গলা।
–মদনা, আরে এ মদনা, দেখিলু কেত্তে অছি ক্যাশরে। বাবুকু দুই হজার দেই হব? অমল স্তম্ভিত। যেন জমিদারের তহবিল থেকে দয়া করে দুঃস্থ প্রজাকে দান খয়রাত করা হচ্ছে। অমল নিজে একটা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, তাই না বলে পারে না।
—ভদ্রলোকের অ্যাকাউন্ট-এ টাকা আছে। দেবেন না মানে? বিদেশে এরকম কথা বললে ব্যাঙ্কে রান হয়ে যায়।
ইনচার্জ ভদ্রলোক সবিস্ময়ে উত্তর দেন,
—ব্যাঙ্কটা কণ ক্রিকেট খেল যে রন হব? আসস্তা কালি বাকি তিনি হজার নেই যিবে, এত্তে কণ অছিম।
যথেষ্ট উষ্ম কণ্ঠে, যেন কাস্টমারের টাকা তুলতে চাওয়াটাই অপরাধ। গ্রাহক তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন।
—হুঁ, হঁ। ঠিক অছি। টিকি এ অসুবিধা হব যে, তা চলাই দেবি। চেকটা শুধরে কেরানিকে দিয়ে টোকেন হাতে উল্টোদিকের লম্বা বেঞ্চে গিয়ে বসেন। তাঁর পালা আসতে অনেক দেরি।
সাধারণ বিশেষ করে একটু বয়স্ক ওড়িয়াদের এমন নির্বিকার স্থৈর্য অমলকে প্রথম প্রথম বিস্মিত করত। এখন ওড়িয়া জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখে। আরেকজন মাঝবয়সি ভদ্রালোক কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে গলা লম্বা করে ইনচার্জের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন।
—আইজ্ঞা। উত্তর নেই। -আইজ্ঞা, টিকিএ শুনিবে।
–কণ? গম্ভীরভাবে প্রশ্ন।
—আইজ্ঞা মু গোটি এ আকাউন্ট খোলিথান্তি সেভিংস।
—কেবে খোলিবে?
—আইজ্ঞা, আজি, যদি হেই পারিব।
—আজি! আজি পরা গুরুবার, আজি কিমিতি হব। অমলের খটকা লাগে। গুরু অর্থাৎ বৃহস্পতিবার অ্যাকাউন্ট না খোলার কোনও নির্দেশ আছে বলে তো তার জানা নেই। ভদ্রলোক কিন্তু সলজ্জ মুখে বললেন,
—সতরে। মোর তো খিআল না থিলা। আজি তা হেলে হেই পারিব নি। আচ্ছা, আসস্তা কালি—কথা শেষ হল না। ইনচার্জ হাহা করে উঠলেন।
—নাহি নাহি কালি আসন্তু নাই। কালি শুক্রবার মু টিকিএ বিজি থিবি। মোর পুরার মঙ্গন। যিবাকু পড়িব, কেত্তে বেলে আসিবি কেত্তে বেলে যিবি কিছি ঠিকানা নাই।
ইনচার্জের ভাইপো—তা আবার নিজের কি জ্যাঠতুতো খুড়তুতো মাসতুতে পিসতুতো কে জানে—তার আইবুড়ো ভাত। সেজন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হবেনা, আশ্চর্য। আরও আশ্চর্য অ্যাকাউন্ট খোলা যার অভীষ্ট তার প্রতিক্রিয়া। হাসিহাসি মুখে ভদ্রলোক বললেন,
-ওহো, আপনংকর পুরার মঙ্গন। নিশ্চয় যিবে, নিশ্চয় যিবে। তা কণ করুচি পুতুরা? বাহা কোউঠি হউচি?
ভাইপোর যোগ্যতা চাকরি মাইনে, কন্যার রূপগুণ বংশমর্যাদা, বিয়েতে বিশাল খরচের নিশ্চিত সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে ক মিনিটের সাগ্রহ আলোচনা। লাইনে দাঁড়ানো বাকিরাও উৎসাহী শ্রোতা। অতঃপর ভদ্রলোক আবার আস্তে করে,
-আচ্ছা, তা হেলে শনিবার আসিবি কি?
—শনিবার হাফ ডে। আমর তো মেন অফিসরু আসু আসু দশটা পঁইতাল্লিশ এগারটা হেই যাউচি, বারোটারে বন্ধ। আউ কেত্তে বেলে আকাউন্ট খোলিবি কহিলে?
ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ মেনে নিলেন।
-হঁ, সে ভি গোটিএ কথা বটে। আচ্ছা, সোমবার আসিলে হওন্তা?
-দেখন্তু সোমবারটা মু মানে, সেদিন উপাস, সাদা খাইবা, শিবংকর পূজাপূজি। সোমবারটা কাইন্ডলি আসন্তু নাই। অমলের মেজাজ গরম হয়ে যায়। বাঃ শিবের পুজো সোমবার উপোস নিরামিষ খাওয়া অতএব ব্যাঙ্কের কাজ হবেনা। মামাবাড়ি নাকি। ভদ্রলোক কিন্তু অবিচলিত।
-হউক, সোম্বারটা যাউক। তাহলে মঙ্গলবার আসুচি?
ইনচার্জ ভদ্রলোক এতখানি জিভ কাটলেন।
—আরে ছি ছি। কণ এত্তে বয়স হেলা আপনংকর কিছি খিআল নাহি। প্রথম কথা মঙ্গলবার দিনটাহি খরাপ, তার উপর সেদিন পরা অমাবস্যা দিন যাক, জানি নাহান্তি কি? মঙ্গলবার অমাবস্যা আউ আকাউন্টটা খোলি দেবে! ভদ্রলোক এবারে ভারী লজ্জিত।
—বয়স হউচি বুঝিলে, কিছি মনে রহুনি। আপন মতে রক্ষা কলে। আচ্ছা বুধবার আসিলে?
—হুঁ। এইটা ঠিক কহিছন্তি। আসন্তা বুধবার আকাউন্ট খোলি দিঅন্তু। উদারহৃদয় জমিদার যেন দয়া করলেন। এক সপ্তাহ লাগে একটা সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলতে। ভদ্রলোক বিগলিত।
