–ঘটনা আবার কী? এমন কিছু অসাধারণ, নিয়মের বাইরে তো কিছু ঘটে না। সবই গতানুগতিক, প্রতিদিন প্রত্যেকের জীবনে কমবেশি যা ঘটে তাই। দৈনন্দিন নিত্যকর্ম।
–আহা, কাহিনীর একটা আগে-পরে ব্যাপার নাই? আগে এই ঘটেছিল, তারপর এই ঘটল। এইভাবেই তো কাহিনী এগোয়।
কে জানে, আমি তো আর উপন্যাস-গল্প লিখি না। জীবনের কথা বলতে পারি। তাও শুধু নিজের জীবনের কথা।
—আরে তাই তো বলসেন। তা সেটা সাজাইয়া লইয়া প্রধান প্রধান ঘটনা পর পর বলবেন তোত।
স্মৃতি তো স্ফটিক স্বচ্ছ খরস্রোতা নয়, তাকালেই স্পষ্ট, তার নুড়িপাথর সব দেখা যাবে। জীবনের স্মৃতি একটা সমুদ্র, তার গভীরে তো আলো পৌঁছয় না। কত কী অস্পষ্ট আবছা থাকে। বিচিত্র লতাপাতা উদ্ভিদ প্রাণী। সে এক অন্য জগৎ। কখনও কখনও সমুদ্রের ওপরে ভেসে ওঠে ইতস্তত। খাপছাড়া অসংলগ্ন টুকরো টুকরো।
যেমন সম্পূর্ণ অকারণে অমলের সেদিন মনে পড়ে গেল ভুবনেশ্বরে একটা ব্যাঙ্কে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। সে সময় কলকাতা থেকে অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধুনিক গানের অনুষ্ঠান আয়োজনে অমল ব্যস্ত। সাধারণত কলকাতা থেকে আর্টিস্ট এলে থাকা-খাওয়ার ঝামেলা বিশেষ নেই, ধৌলিতে দুপুরে ভুবনেশ্বরে পৌঁছে লাঞ্চ বিশ্রাম সন্ধ্যায় শো, রাত এগারোটায় জগন্নাথে তুলে দেওয়া সঙ্গে প্যাক করা ডিনার। পরিষ্কার হিসেব। পান্থনিবাস কি নালকোর গেস্ট হাউসে একটা ঘর হলেই চলে।
সেবার হল কি আর্টিস্ট খবর দিলেন তিনি সপরিবারে আসছেন। দিন তিনেক থাকার ব্যবস্থা চাই, পুরী-কোনারক যাবেন। ব্যবস্থা হল। তবে অমল তৎক্ষণাৎ দক্ষিণার অঙ্কটা কমিয়ে ফেলল। টাকা তো আর আকাশ থেকে পড়বে না একতা ক্লাবও ট্রাভেল এজেন্সি খোলনি। তাছাড়া একটা সমস্যাও দেখা দিল, তিন দিনের জন্য ডাবল বেড রুম কোথায় পাবে, অর্থাৎ প্রায় নিখরচায় কে দেবে। দিলীপের কোম্পানি একটা মাঝারি গোছের গেস্ট হাউস রেখেছে, সেখানে বলে-টলে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তারই অন্তিম পর্যায়ে অমল দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে গেস্টহাউসের ঘরটর স্বচক্ষে দেখতে বেরিয়েছে। যদিও কলকাতার আর্টিস্ট তার হিসেবে নেহাতই সেকেন্ড ক্লাস, কেউ স্টার নয়, তবুও অতিথি বলে কথা। পুরনো ভুবনেশ্বরে দিলীপের বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিতে দিলীপ বলল,
—দাদা আমার ব্যাঙ্কে না গেলেই নয়, পকেটের অবস্থা খুবই খারাপ, কদিন সমানে ভুলে যাচ্ছি। আজকেও যদি টাকা না তুলি তবে বউ বাড়ি ঢুকতে দেবে না।
-যাওয়ার পথে পড়বে?
—হ্যাঁ হ্যাঁ। এই তো সামনে একটু যেতে হবে মেন রাস্তা থেকে। বি জে বি কলেজের মধ্যে ছোট্ট ব্রাঞ্চ। পাঁচ মিনিটের ব্যাপার।
বক্সি জগবন্ধু কলেজ ভুবনেশ্বরের তথা সমস্ত ওড়িশার এখন সেরা কলেজ। সব পরীক্ষায়, হায়ার সেকেন্ডারি বি এ বি এসসি বি কম-এ প্রথম বিশ জনের মধ্যে ষোলো জনই বি জে বির ছাত্রছাত্রী। তবে কলেজের চেহারা সেরকম কিছুই নয়। এটা নাকি বয়েজ হাইস্কুল হিসেবে করা হয়েছিল। অর্থাৎ সেরকম প্ল্যান করা দারুণ চেহারার প্রিমিয়ার ইনস্টিটিউশন নয়। পাকেচক্রে কটকথেকে ভুবনেশ্বরে রাজধানী উঠে আসার পর ধীরে ধীরে এ শহর ওড়িয়া সমাজের ওপরতলার বাসিন্দাদের বাসস্থান হয়ে ওঠায়, তার আজকের এই রূপান্তর। বলাবাহুল্য ছেলেমেয়েদের রেজাল্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি অনুদান বাড়েনি। কাজেই বিল্ডিংও কম্পাউন্ডে চিরাচরিত সরকারি অবহেলার ছাপ। মেন বিল্ডিং-এর পেছনে গাছপালা আগাছার খুদে জঙ্গল, তার মধ্যে একপাশে কাটা তারের বেড়ার ধারে একটি একতলা বাড়ি যার একদিকে পোষ্টাফিস, মাঝখানে বেশিরভাগ সময় বন্ধ কলেজ ক্যান্টিন, আরেকদিকে স্টেট ব্যাঙ্কের একটি এক্সটেনশন কাউন্টার। প্রায় জরাজীর্ণ অবস্থা। খণ্ডগিরি উদয়গিরির প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে তাল রেখেছে আরও অনেক ওড়িশা সরকার নির্মিত গৃহের মতো এই নির্মাণটিও। ভবিষ্যতে ট্যুরিস্টেদের কাছে এগুলি চিহ্নিত হবে ওড়িয়াদের অধীনে ওড়িশার স্থাপত্যকীর্তির নিদর্শনরূপে।
দিলীপ খবর দিল ব্যাঙ্ক আগে বাড়িটার উত্তরদিকের একটি ঘরে ছিল। বর্ষায় প্রচুর জল ও তার সঙ্গে সাপ ঢাকায় দক্ষিণের ঘরে উঠে এসেছে। অমল চমৎকৃত। টাকাপয়সা দলিল ইত্যাদির যথোপযুক্ত সুরক্ষার কী ব্যবস্থা। সে প্রশ্ন ওঠেনা কারণ উপশাখাঁটিতে আসবাবপত্র ছাড়া আর কিছুই থাকে না। প্রতিদিন স্টেট ব্যাঙ্কের বাপুজিনগরশাখা থেকে টাকা দরকারি কাগজপত্র সব বড় বড় ট্রাঙ্কে বন্দী হয়ে কর্মচারিদের সঙ্গে মারুতি জিপসিতে আসে। তখন উপশাখাঁটি ভোলা হয়। আবার ব্যাঙ্কের ঝাঁপ ফেলার সময় বাক্সবন্দী হয়ে বাপুজিনগর শাখায় ফেরত যায়। এমন ব্যাঙ্ক অমল বাপের জন্মে দেখেনি।
এবার ব্যাঙ্কে ঢোকা। মেঝের জায়গায় জায়গায় সিমেন্ট চটা, দেওয়ালে ড্যাম্পের নীলচে নীলচে ছোপ। ছাদের পলেস্তারা খাবলা খাবলা খসে গেছে। দরজার সামনে সিঁড়ির প্রথম ধাপই ভাঙ্গা। প্রায় অন্ধকার ঘর, হয় লোডশেডিং বা অন্য কোনও কারণে বিদ্যুৎ নেই। প্রচণ্ড গরম, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ। ক্যাশের আধখানা চাঁদ ফোকরের সামনে বেশ কজনের লাইন। ডান দিকে ইংরিজি এল অক্ষরের মতো দুদিকে ছড়ানো কাউন্টারের ওপাশে একটি কেরানি ও পিয়ন গোছের কেউ। কাউন্টারের ভেতরে খোলা জায়গাটিতে একটি কাঠের টেবিল ও তিনটি চেয়ার। স্পষ্টতই সুপারভাইজার বা অফিসার ইনচার্জের বসার জায়গা, সামনে দুজন কাস্টমারের জন্য ব্যবস্থা। অমল ও দিলীপ ঢুকতে না ঢুকতেই শোনে চাপা গুঞ্জন অসন্তোষ। এত দেরি হচ্ছে কেন, কতক্ষণ লাগছে টাকা গুনতে ইত্যাদি। পেছন থেকে উঁচু গলায় মন্তব্য,
