জীবজগতের নিয়মে পুরুষ চেষ্টা করে স্ত্রীকে আকৃষ্ট করতে। ময়ুর সাতরঙা পেখম ধরে নাচে ময়ুরীর জন্য। প্রকৃতি তাকে প্রোগ্রাম করে দেয় প্রজাতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। মানবমানবীর আকর্ষণ-বিকর্ষণের জটিল দ্বন্দ্ব কি প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে?নাকি সভ্যতার বিবর্তনে জৈবিক স্বভাবে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে পিতৃতন্ত্র? হয়তো এসব কিছুই না। সময়, সেই কাস্তে হাতে ভীষণ দর্শন পুরুষ, আমাদের প্রেম ভালবাসা কর্মকীর্তি সব বিনাশ করে এবারে প্রকৃতিকে ধরেছে। পাল্টে যাচ্ছে জীবজগতের নিয়মকানুন। এই তো কোথায় যেন খবরে দেখছিলাম একদল শকুন, যারা ভীরু ও শ্লথগতি হওয়ার দরুণ প্রাণী সমাজে মৃতপশু খাদক বা ঝাড়ুদার তারা হঠাৎ স্বভাব বদলে দল বেঁধে গৃহস্থের মাঠে-চরা জ্যান্ত ছাগলভেড়া আক্রমণ করছে, তাদের লম্বা চঞ্চঠুকরে ঠুকরে মেরে ফেলছেতৃণভোজীদের। মরা মাংসের যদিও অভাব নেই, সুও। হায় সময়। তোমার মতো ভয়ঙ্কর আর কী আছে। চিরন্তন প্রকৃতিরও তোমার কবল থেকে নিস্তার নেই। অমলকুমার দাস মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী তো কোন্ ছার।
এত সব ধানাই পানাই দর্শন তত্ত্ব, এর আড়ালে মোদ্দা কথাটা নেহাতই মামুলি। আমি যখন নিজেকে কেউকেটা মনে করে রোজ বিভিন্ন ক্লায়েন্টের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙে হোটেল বেঁস্তোরা ক্লাবে লাঞ্চ ডিনার ককটেল করে বেড়াচ্ছি, বছরে একখানা মেগাফাংশান, গোটা তিনেক মাইনর ফাংশান স্টেজে নামাচ্ছি, লোকাল কাগজে নাম ছাপা হয়, সন্ধেবেলা টিভিতে স্থানীয় বিচিত্রাতে আমাকে সবাই দেখে একতা ক্লাবের প্রাণপুরুষ সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক সংস্থার সভাপতি বক্তৃতা দিচ্ছে—(যার প্রতিটি লাইনের পরে মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী ইংরিজির ভুল ধরে) সব মিলিয়ে এমন একটা ভঙ্গি যেন সেই সময় কালের অবিরাম স্রোত থেকে পৃথক, বরাবরের মতো স্থির, ফ্রিজ শট; তখন হায় সময়, তুমি এদিকে তলায় তলায় আমার সর্বনাশের যোজনা, থুড়ি পরিকল্পনা করে চলেছে অধস্তনরা যেমন বেনামি নালিশ পাঠায় সিবিআই ভিজিলেন্সকে। আর আমি আমার সাময়িক বিজয়ের মোহে এমনই মুগ্ধ ময়ুরের মতো পেখম মেলে ময়ুরীর মন জোগাতে, তুমি যে সংগোপনে পিছন থেকে কখন পিঠের ওপর ছুরি তুলে ধরেছ টেরই পাইনি।
.
-এই যে, অমলবাবু, আছেন কেমন? আর কিছু মনেটনে পড়ল? সহাস্যমুখে ছায়া দেবনাথ সামনে দাঁড়িয়ে। বাঙাল তো, মেয়েটার হায়ালজ্জা কিছুই নেই।
–হ্যাঁ, মনে সবই আছে। অমল বেজার মুখে বলে, মনে থাকলেই তোমাকে বলতে হবে এমন কোনও মানে আছে।
—আহা, ধরেন না আমি আপনার স্টেনো।
—আমার স্টেনো বাপের জন্মে তোমার মতো ফাজলামি করতে সাহসই পেত না। গতকাল এই ছায়া দেবনাথের জন্য তাকে কী অপ্রস্তুতই না হতে পয়েছে। সকালে ডাক্তার বর্মন রাউন্ডে এলে অমল কথায় কথায় বলে ফেলে,
—সুগোক শহরটা আর আগের মতো নেই।
ডাক্তার বর্মন ভুরু কুঁচকে বলেন,
–সুগোক আবার কোন্ শহর?
অমল ভাবল বোধহয় তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, আগে যেমন নিকটজনদের এনে ডাক্তার নার্সরা পাটপিট মুখে জিজ্ঞাসা করত,
-ইনি কে বলুন তো? মনে পড়ছে?
সে সবই ছিল পরীক্ষা। স্বাভাবিকত্ব প্রমাণের। তাই অমল ছায়া দেবনাথের দেওয়া ব্যাখ্যাটাই পুনরাবৃত্তি করে।
-কেন সুতানুটির সু, গোবিন্দপুরের গো আর কলিকাতারক। এটাই তো কলকাতার খাঁটি দেশি নাম।
ডাক্তারের মুখ থেকে হাসি হাসি ভাবটা মিলিয়ে গেল। সঙ্গের নার্সকে নিচু গলায় বলেন।
-ওষুধের ডোজটা কত দেওয়া হচ্ছে? হ্যালোপেরিডলটা বাড়িয়ে দিন।
কলম খুলে লিখতে লাগলেন।
ওষুধপত্রের নাম, মাত্রা এতদিনে অমলের ভালভাবেই জানা। বুঝল তার উত্তরে কিছু একটা গুবলেট হয়েছে। ডাক্তার বর্মন দেখা শেষ করে বললেন,
–রোজ খবরের কাগজ পড়েন না? পড়বেন। নিয়ম করে। বাইরের জগতে কী হচ্ছে হচ্ছে জানা দরকার। ন্যাশনাল ডেইলি আসে তো? দিন তো সিস্টার কাগজটা। হ্যাঁ, এই যে, দেখুন কী লেখা আছে। কলকাতা সংস্করণ। ওসব সুগোক ফুগোক কী বলছিলেন?
–তার মানে কলকাতা কলকাতাই আছে? অমল সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে।
—দেখি কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই, সুর করে আবৃত্তি করেন ফ্লোর নার্সনমিতাদি। সকলে হেসে ওঠে।
মনে আছে ছোটবেলায় পড়া কবিতা? একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু…কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে? ওটাতো স্বপ্ন। বাস্তবে আসুন।
অমল জানে ডাক্তারদের ওই এক বাই বাস্তব বাস্তব বাস্তব। তাদের কাছে বাস্তব মানে এই মুহূর্তে যা ঘটেছে ঘরে বাইরে, যাকে বলে বহির্জগতে যে জগৎ পঞ্চ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যাকে দেখা যায়, শোনা যায়, ছোঁয়া যায়, চাখা যায়, শোঁকা যায়। ব্যাস। তার বাইরে আর কিছু নয়। বাকি সব অবাস্তব অলীক, খারাপ। অমল যে এই মুহূর্তে এখানে বাস করে না, করে সেই সময়ের স্মৃতিতে সেটাই তার দোষ, বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির চিহ্ন।
না, সময় একটা মাত্রা যা অমলের সবকিছু রহস্যময় দুর্বোধ্য করে তুলেছে। তবে ছায়া দেবনাথ মেয়েটা যে এক নম্বরের ফাজিল ফোক্কড় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আজ ছায়া আসতেই অমল রাগে গরগর করে ওঠে। মেয়ের গায়েই লাগে না। হেসে উড়িয়ে দেয়।
-আপনার সঙ্গে একটু তামাসা করসিলাম। আপনি সর্বদা গম্ভীর মুখ কইর্যা থাকেন তো তাই। তারপর কী হইল বলেন। চিন্তাভাবনা রাখেন। খালি ভ্যাজর ভ্যাজর। ঘটনাটা কি?
