ওঁর একমাত্র ছেলে যখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে ওড়িশায় কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং মেডিকেল কোথাও কিছু পেল না তখন অনিলেন্দু এসে আমাকে ধরে পড়লেন। কলকাতায় ডেন্টাল কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে। তখন বামপন্থী সরকার এবং আমার পরিবার ঘোর কংগ্রেসি। তবুও কিছু অসুবিধা হলনা। বাঙালি কম্যুনিস্টদের কাছেইন্ডিয়া তো আরেকটি সোভিয়েত। হেলথ মিনিস্টারের নিজের কোটাতে ছেলেটা ভর্তি হয়ে গেল। তার ভবিষ্যৎ এখন ছকে বাঁধা। ওপরে ওঠার রাস্তা খোলা। হ্যাঁ, অনিলেন্দু ডিরেক্টর অফ কালচার এবং একতা কালচারাল অর্গানাইজেশান যার আমি প্রেসিডেন্ট। কেউ ঘাস খায় না, সব ঠিক, তা সত্ত্বেও তার সঙ্গে আমার একটা রীতিমতো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
সেদিন রাতে ওবেরয়-এ ভদ্রলোক ডিনার অবধি ছিলেন, না খেয়ে তো আর যাবেন না। এবং তিনি নাচাকোঁদার পাত্র নন। পানভোজনেই তার উপভোগ। অতএব, বসে বসে দিব্যি মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর নারীবাদী নাটকটি তারিয়ে তারিয়ে দেখলেন। অস্বস্তি, বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল। একতার ছোট গণ্ডিতে আমার ও মৈত্রেয়ীর সম্পর্ক সকলের জানা। তাতে কিছু আসে যায় না। সেটা তো পরিবারের মতো। ঘরের কথা ঘরেই থাকে। কিন্তু বাইরে অর্থাৎ যাদের সঙ্গে আমার চাকরিসূত্রে পরিচয়, যাদের সঙ্গে আমার কর্মক্ষেত্রে আদানপ্রদান যোগাযোগ তাদের কারও সামনে আমাদের সম্পর্ক এবং তার এমন নগ্নরূপ প্রকাশ কি উচিত?
অনিলেন্দু কোনওদিন মৈত্রেয়ীর নাম উচ্চারণ করেননি। ঠারেঠোরেও কোনও কিছু জানতে চাননি। কিন্তু সেই পার্টির পর থেকে যতবার ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, ওঁর অফিসে একতার অনুষ্ঠানে, কেমন যেন একটা ঠাণ্ডাঠাণ্ডা ভাব। আগের সেই খোলামেলা সহজ ভঙ্গিটা আর নেই। অথচ এমন মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার মতো ব্যাপার তো কিছু নয়। আফটার অল আমি ব্যাচেলর এবং মৈত্রেয়ী ডিভভার্সি। এখানকার বড়লোক মন্ত্রীফন্ত্রিদের করকম ব্যাপার-স্যাপার থাকে সে কি আমি জানিনা। নাকি অনিলেই জানেনা। ওড়িয়াদের এই এক অদ্ভুত স্ববিরোধ, এক দিকে আকছার ব্যভিচার, বিবাহিত ক্ষমতাশালী পুরুষের একাধিক স্ত্রী রক্ষিতা, অন্যদিকে মুষ্টিমেয় আমলা অধ্যাপক অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রচণ্ড ব্রাহ্ম মার্কা নীতিবাগীশ সংকীর্ণতা।
সেইজন্যই কি পরে রবীন্দ্রনাথের মূর্তিপ্রতিষ্ঠা নিয়ে যখন সমস্যা হল তখন অনায়াসে হাত খুলে অনিলেন্দু সেই মোক্ষম নোটটি ফাঁইলে লিখতে পারলেন?
সেই রাতে এরকম সম্ভাবনা অনাগত ভবিষ্যৎ। পরবর্তী আকর্ষণ বা শীঘ্র আসিতেছে গোছের অংশবিশেষ। কেলেঙ্কারিটাই ছিল মূল কাহিনী চিত্র ফিচারফিল্ম। পরদিন ধৌলিতে মৈত্রেয়ী ফিরে গেল কলকাতা। এ ঘটনার পর থেকে আর কখনও মৈত্রেয়ীর সঙ্গে অল্পবয়সি সহকর্মিনী দুরসম্পর্কের দুস্থ আত্মীয়া ভুবনেশ্বরে দেখা যেত না। উল্টে এমন ভাব করতে যেন কোনও দিনই কাউকে আনেননি। বরাবরই সে একা আসে।
মৈত্রেয়ী ফিরে যাওয়ার পর পরই ভুবনেশ্বরে আমার জীবনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করলেন আমার পিতৃদেব। হরিচরণ দাস বি এ বি এল হাওয়া বদলের জন্য এলেন কনিষ্ঠ পুত্রের কাছে। সেই একবারই তিনি আমার সংসারে পা রাখলেন এবং সেই শেষবার। ফিরে যাওয়ার অল্পদিন বাদে ম্যাসিভ স্ট্রোকে ডানদিক অসাড়,কয়েকমাস জীবস্মৃত অবস্থা ও একদিন প্রাণত্যাগ। যে সময়টুকু ভুবনেশ্বরে ছিলেন, একতার সদস্যদের সঙ্গে দিব্যি জমিয়ে নিয়েছিলেন। প্রতিবার প্রতিটি সাক্ষাতে প্রত্যেকের সঙ্গে আলাপে সমাপ্তি টানতেন একটি বিশেষ অনুরোধ।
—তোমরা পাঁচজন দেখেশুনে অমলের একটা বিয়ে দাও। বলাবাহুল্য মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী নামে যে কারও অস্তিত্ব তার পুত্রের জীবনে আছে সেটি সম্পূর্ণ অস্বীকার। মজা হল একতার সদস্যরা যাদের কাছে মৈত্রেয়ী আদরের দিদিভাই এবং যারা আমার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বিলক্ষণ জানে, তারাও দিব্যি এই খেলাটিতে সাগ্রহে অংশ নিতে শুরু করল। ? অমলদার জন্য পাত্রী চাই একতার প্রতিটি জমায়েতে বাঁধাধরা খেলা, যেন পার্টি গেমস্ কনসিকোয়েন্স, পাসিং দি পারসেল ইত্যাদি। সেই সুবাদে ঠাট্টাইয়ার্কি একটা স্থায়ী বিষয়বস্তু হয়ে উঠল। আরও মজা, মৈত্রেয়ীর সর্বদা এসব আলোচনায় হাসিমুখে অংশগ্রহণ। সাধে কি আর বলে স্ত্রী চরিত্র দেবতারাও জানে না।
আচ্ছা মৈত্রেয়ী সম্বন্ধে একধরনের পরিহাস কখনও শোনা যেত না কেন? সেও তো আমারই মতো বাহ্যত একা। বিধবা বা স্বামীবিচ্ছিন্নার একাকীত্ব কি সমাজে এখনও স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়? হয়তো সকলের এই ধরে নেওয়ার জন্যই মৈত্রেয়ী পুরুষের অভাব তেমন তীব্রভাবে অনুভব করে না। স্কুলের টিচারদের ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়েই তার তৃপ্তি। আগেকার দিনে একান্নবর্তী পরিবারের কর্তারা যেমন বিবাহিত জীবনের অনেকটা সময় বাইরের মহলে নিঃসঙ্গ শয্যায় কাটিয়ে যেতেন। সমস্ত পরিবারকে দোর্দণ্ড শাসনে রেখেই তাদের পরিতৃপ্তি। ফ্রয়েড কবে হার মেনে গেছেন। ক্ষমতালিপ্সা বোধহয় কামনার চেয়ে ঢের ঢের শক্তিশালী। এই যে আমার আর মৈত্রেয়ীর সম্পর্ক এতে কামনার স্বল্প ভূমিকা নিয়ে আহা-উঁহু সহজ। কিন্তু নিভৃতে ক্ষমতার যে প্রচণ্ড লড়াই প্রতিনিয়ত চলেছে তার প্রকাশ কোথায়? ওবেরয়ের ঘটনার পর একটা মেগাফাংশান, পুরো ওড়িশাকে তাক লাগানো অনুষ্ঠান আমার অস্তিত্বের পক্ষে এত জরুরি হয়ে উঠেছিল। মৈত্রেয়ীকে দেখাব আমার কেরামতি। একেবারে সুপারহিট মুকাবলা।
