–বুঝলেন, মিঃ দাস, এই হচ্ছে আমাদের দেশ। আমরা দু-চারজন এডুকেটেড হাইকাস্ট, বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত যা একটু গড়তে চেষ্টা করি একফালি গোলাপবাগান একটা মাধবীলতা, দুটো আমকাঠালের গাছ, সব ধ্বংস করে দেয় বর্বরের দল। তারা সব সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। মেজরিটি। আমাদের পূর্বপুরুষরা জ্ঞানী ঋষি ছিলেন। জঙ্গলের জীবকে জঙ্গলেই রাখতেন,বড়জোর সমাজের অর্থাৎগ্রাম বা শহরের প্রান্তে অস্পৃশ্য অচ্ছুৎ হিসেবে বেঁচে থাকতে দিতেন। যা কিছু সভ্যতা, সাহিত্য দর্শন শিল্পকলা সঙ্গীত এ দেশে হয়েছে সবই এদের বাদ দিয়ে। সভ্য মানুষের বসতির বাইরে এদের আটকে রেখে। আমাদের হাজার হাজার বছরের অস্তিত্বে সর্বনাশ করে গেল সাহেবরা, মগজে ঢুকল ওয়েস্টার্ন আইডিয়া, হিউম্যানিজম। যে এগিয়ে আছে তার কর্তব্য পিছিয়ে পড়দের কাঁধে তুলে নেওয়া। আরে বাপু, কতজনকে তুলব, কাধ কটাই বা। এখন সাহেবরা চলে গেছে, ভালুটি আমাদের ধরিয়ে দিয়ে। ভাল ধরানো জানেন তো? ওড়িয়াতে যত খারাপ কাজের দায়িত্ব ঘাড়ে চাপা, নামানোর উপায় নেই।
কী সাংঘাতিক রিঅ্যাকশানারি এই অনিলেন্দু। আমি আঁতেল না হলেও বাঙালি তোত। নাইনটিন্থ সেনচুরির লিবেরালিজম আমাদের অস্তিত্ব। (এখানেই আটকে আছি। আবার সেই টাইম মেশিন আর কি) আমি নিজে বামুনকায়েতনই। জ্ঞানী ঋষিদের সনাতন হিন্দুধর্মে আমার ঠাকুরদা বাবা আমি কোথায় থাকতাম শুনি? সেই জমিদার মহাজন পুরুতের কানমলা আর হাঁটুতে কাপড়, বলদ ঠেঙিয়ে জমি চাষ। ইংরেজই আমাদের তুলেছে। শুধু আমাদের কেন সবাইকে। গল্প উপন্যাস বইইয়ের ধার ধারি না বটে, কিন্তু খবরের কাগজ ম্যাগাজিন তো পড়ি। কত বড় বড় বাঙালি লেখক পিছিয়ে পড়া মানুষ, আদিবাসী-টাদিবাসী নিয়ে কত মহৎ সাহিত্য রচনা করেছেন। আর এসব লেখার তো মার নেই, পুরস্কার বাঁধা। তাছাড়া শান্তিনিকেতনে গিয়েছি। সাঁওতালরা দিব্যি পরিষ্কার। সকলের মুখে শুনি কত সরল সৎ। অতএব অনিলেন্দুর বিশ্বহিন্দু পরিষদ বিজেপি মার্কা কথাবার্তায় মৃদু আপত্তি না তুলে পারি না।
–বাড়িটার অবস্থার জন্য আদিবাসীদের ইন জেনারেল রেসপনসিবল ভাবাটা ঠিক কি। আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলে সাঁওতালরা তো খুব ক্লিন, হার্ডওয়ার্কিং।
-আদিবাসী মানেই তো সাঁওতাল নয়। অজস্র জাতের আদিবাসী আছে। আর এ বাড়িতে যারা থাকত তারা যে অন্তত পরিশ্রমী নয় সে তত চোখের সামনেই দেখতে পেলেন। কংক্রিট ভিজিবল এভিডেন্স। তিক্ত ঝাঝালো উত্তর।
—আসলে এরা তো মডার্ন আরবান লিভিং-এ অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া গরিব, জলই তো পায় না, পরিষ্কার থাকবে কী করে
—কী যে বলেন মিঃ দাস। বাড়িটার উল্টোদিকেই তো বিরাট মাঠ পড়ে আছে। বাথরুম টাথরুম ব্যবহার না জানলে সেখানেই কম্ম করলে পারত। গরিব জল পায় না ওসব কথা বলবেন না। এটা টাইপ সিক্স, বাড়ি, চব্বিশ ঘণ্টা জল। কটা কল আছে জানেন? দুটো ভাল বাথরুমে তিনটে তিনটে ছটা, উঠোনের ভেতর ইন্ডিয়ান স্টাইলে দুটো, বাইরে আউট হাউসের কল-পায়খানায় দুটো, বাগানে জল দেওয়ার জন্য দুটো কল ও দুটো বিরাট চৌবাচ্চা। কটা হল?–চোদ্দোটা? ভুলে গিয়েছিলাম রান্নাঘরে একটা ও উঠোনের ধারে আরেকটা কাপড় কাঁচা ইত্যাদির জন্য।
—অর্থাৎ সর্বমোট ষোলোটি কল। আমি ব্যাংকার মানুষ, গোনাগুনিতে সর্বদা আছি। .
—হ্যাঁ। তার মধ্যে অন্তত বারোটিতে চব্বিশ ঘণ্টা জল এবং বাকি চারটিতে দিনে বার তিনেক টাউন সাপ্লাই থেকে জল আসে। এ সত্ত্বেও বাড়িটি নরককুণ্ড এবং গাছগাছালি ঘাস খতম।
-দেখুন স্যার তর্কের খাতিরে আমি ধরে নিচ্ছি এরা অলস তাই নোংরা। কিন্তু ফলের গাছ নষ্ট করবে কেন? ফল ফললে তো নিজেরাই খাবে। তারপর ওই কী যেন আপনি বলছিলেন কাছেই ফুড প্রসেসিং সেন্টার, মিনিস্টারের তো সাইকেল টাইকেলের অভাব নেই। স্কোয়াশ-জ্যাম-জেলি-আচার-সস সব এরাও বানিয়ে রেখে সারা বছর ভোগ করতে পারে। গাছটাকে কেটে কী লাভ?
—অত বুদ্ধি যদি ঘটে থাকবে তাহলে আর আদিবাসী কেন। আপনারা বাঙালিরা সবাইকে একটা রোমান্টিক কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দেখেন। বাস্তবের সঙ্গে আপনাদের কোনও সম্পর্ক নেই। আপনারা ভাবেন উন্নতি হচ্ছে একটা গিফ্ট। ইচ্ছেমতো যাকে তাকে দেওয়া যায়। তাতে নয়, উন্নতি হচ্ছে একটা প্রসেস, সাধনা। নিজেদের চেষ্টা। এই যে সাহেবরা আপনাদের কলকাতায় এমন সব চমৎকার বিল্ডিং করেছিল। চৌরঙ্গির কথা ভাবুন। আমি ছেলেবেলায় ফিফটিজ-এ গেছি। তখনও কী সুন্দর! আর এখন! ইন্ডিয়েনাইজেশান না বারবারাইজেশান। আচ্ছা আপনাদের নিজেদের কিছু মনে হয় না? দেশটাকে তো একেবারে তুলে দিয়েছেন অসভ্যদের হাতে।
আদিবাসী ছেড়ে বাঙালি নিয়ে পড়েন অনিলে, মেট্রোলাইটহাউসের অবস্থা–মা যাহা ছিলেন এবং যাহা হইয়াছেন। কথায় কথায় আমারও মনে কোথা থেকে যেন সাড়া আসে। সত্যি তো এইহটগুলো চৌরঙ্গির ফুটপাথে আমরা ছেলেবেলায় মানে ফিফটিজ এ যা দেখেছি এখন তার হাল এমন কেন! ভদ্রলোক পা দিতে পারেনা। রাস্তায় গেরস্তবাড়ির মেয়েদের হাঁটাচলা দুষ্কর। চারিদিকে ইন্ডিয়ান পাবলিক। অসভ্য বর্বর নোংরা। এবারে দুজনে হুইস্কি নিয়ে বসি। এক সিটিং-এই বন্ধুত্ব।
তারপর যখনই সেক্রেটারিয়েটে গেছি ওঁর ওখানে একবার ফুঁ মেরেছি। চা কফি খাইয়েছেন। একতার সব অনুষ্ঠান জমায়েতে ওঁর নিমন্ত্রণ বাঁধা। সব সময় এসেছেন অনিলেন্দু। আমার বাড়িতেও কবার ডেকেছি। দু-চার পেগ পেটে পড়ার পর নানা কথা আলোচনা। আমার ব্যাংকের ধার নিয়ে কটা ইন্ডাস্ট্রিজ কী করল না করল এবং তার জন্য আমার কত ঝামেলা। ওঁর কাছে শুনেছি অফিসে কতরকম রাজনীতি, সম্বলপুর অর্থাৎ পশ্চিম ওড়িশা বনাম কটক বা সমুদ্রকুল ওড়িশা, ব্রাহ্মণ বনাম করণ বা কায়স্থ। এছাড়া কে চিফ মিনিস্টারের সেক্রেটারির দলে কে নয় এবং তার জন্য কী কী সমস্যা।
