—গাছ কি আর স্যার আছে, সব ভেঙেচুরে কেটেকুটে শেষ। সখেদে উত্তর। আমি আর অনিলেন্দু এক সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠি।
—সে কি! এত ভাল ভাল ফলন্ত গাছ কেটেকুটে শেষ! ভ্যালিজম। ক্রাইম।
—আর কী আশা করেন স্যার। যারা এ বাড়িতে ছিল তারা কি আপনাদের মতো ভদ্র শিক্ষিত। যতসব অসভ্য জংলি। যারা চোদ্দো পুরুষ একটা গোলাপ গাছ লাগায়নি, একটা পেয়ারা কি আতার যত্ন নিতে শেখেনি, এতরকম ফল যে আছে তাই তারা কস্মিনকালে জানত না। বনের মধ্যে দুচারুট বুনোআমলা কি কচি গাব খালি দেখেছে, পেড়ে খেয়েছে, চাষবাস তো যেটুকু নেহাত না করলে নয়–কোনওক্রমে দুটো মোটা ধান জোয়ার কি এক আধটুকু তামাক, লংকা, হলুদ, ফলের মধ্যে কালো বুনো কমলা। কেমন করে ভাল চাষ হয়, রকমারি শাকসবজি ফলমূল করা যায় তা নিয়ে কখনও চিন্তা করেছে? ভাবনা চিন্তার তো ধারই ধারে না। এদের জীবনে খালি ওই নামমাত্র চাষ, শিকার মদ আর ফুর্তি।
–সেটা জঙ্গলে চলতে পারে। কিন্তু এটা তো ডেপুটি মিনিস্টারের বাড়ি। না বলে পারি না।
–কী আমার মিনিস্টার। মুখ ভেংচাল জিডির লোকটি। মিনিস্টার হোক আর অফিসারই হোক, আদিবাসী আদিবাসীই। তাছাড়া মিনিস্টার তো কোয়ার্টারে থাকতেনই না। শুধু অ্যাসেম্বলি সেশান চলার সময় আসতেন। এ বাড়িটা কনস্টিটিউন্সির লোকেদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। জনগণের হাতে পড়লে কী হয় জানেনই তো স্যার। তার ওপর আবার আমার মতো সাধারণ বামুন করণ খয়েৎ জনগণ নয়। আদিবাসী জনগণ। চলুন স্যার ভেতরে চলুন। দেখুন একবার এদের কীর্তিটা।
ততক্ষণে আমি বেশ ঘাবড়ে গেছি। অনিলেন্দুর মুখ দেখে মনে হল তারও অবস্থা তথৈবচ। জিডি-র লোকটির পেছন পেছন গাড়ি বারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে লম্বাটানা খোলা বারান্দায় উঠি। সারি দিয়ে পরপর ঘর, সবকটির দরজা খোলে বারান্দার দিকে। স্পষ্টত ইটকাঠ সিমেন্টের এই সাবমেরিনটা যে স্থপতির নকশা তার অভিধানে নিরাপত্তা কথাটা ছিল না। তবে বাড়িটির স্থাপত্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া সম্ভব হল না। কারণ ঘরে ঢুকতে প্রবল প্রচণ্ড দুর্গন্ধে যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে ছড়ানো মানুষের শরীরের সর্ববিধ ক্লেদ ময়লা আবর্জনার স্তূপ। খাওয়ার উচ্ছিষ্ট। মাছের আঁশ-মাংসের হাড়, কাঁচা তরিতরকারির পচাগলা অবশিষ্ট কী নেই। দেওয়ালে ছাপ ছাপ নোংরা দাগ, ঝুল ছাদের সব কোণে। কোনওক্রমে ঘরটা পেরিয়ে দরজা দিয়ে পিছনের বারান্দায় পৌঁছই। না একই দৃশ্য। এখানে মেঝেও খোঁড়া। মাঝেমাঝে ভাঙা। বাঁদিকে ইংরিজি এল অক্ষরটির আকৃতিতে বাড়িটির আরেকটি শাখা। রান্নাভাড়ার ইত্যাদি। দেওয়াল ছাদ লেপা কাঠের আগুনে রান্নার ঘন কালি। সামনে বিরাট বাঁধানো উঠোনে জায়গায় জায়গায় খোবলানো গর্ত। ইট দিয়ে উনোন করার চেষ্টা। ছাই গাদা হয়ে পড়ে আছে।
—ওখানে কী হত জানেন স্যার? একগাল হেসে জিএডির লোকটির প্রশ্ন এবং উত্তর,
—মদ রাঁধা হত।
—মদ আবার রাঁধা হয় নাকি। এত দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসা সত্ত্বেও অবাক হয়ে প্রশ্ন করি। অনিলেন্দু উত্তর দিল,
—ওই মদ তৈরিকেই এখানে মদরাধা বলে। ওটা তো আদিবাসীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অঙ্গ।
—শুধু কি আদিবাসীদের জন্য হত ভাবছেন নাকি স্যার? মোটেই না। এ বাড়িটাতো চুন্নুর আজ্ঞা ছিল। যতসব গুণ্ডা বদমাস, বাজারি লোক, নষ্ট মেয়ে
–থাক থাক হয়েছে, খুব বুঝতে পেরেছি। অনিলের মুখ বিতৃষ্ণা ঘৃণায় বিকৃত।
কোনওক্রমে নাক-চোখ-মুখ বুজে বেরিয়ে আসি দুজনে। নির্বিকার জিএডি প্রতিভূ বলে,
–এইজন্যই স্যার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছিল আপনি নিজে এসে একবার বাড়ির অবস্থাটা দেখুন। জানেন তো তরুণ মহান্তি, সেক্রেটারি ইন্ডাস্ট্রিজকে বাড়িটা অ্যালফ্ট করা হয়েছিল? ওঁর মিসেস বাড়ি দেখতে এসে বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। উনি তো আর বাড়িটা নিলেন না। আই এ এসরা কেউ নিতে রাজি নয়। তাই তো স্যার আপনাকে দেওয়া হল। সাধারণ লোকেদের কী অসাধারণ চিমটিকাটার ক্ষমতা। আড়চোখে দেখি অনিলেন্দুর মুখ থমথমে।
—আমিও নেব না। এ বাড়ি পরিষ্কার ও মেরামত করতে যে টাকা দরকার তা কবে পি ডবলিউ ডি দেবে, কাজ হবে তারপর আমি ঢুকতে পারব কে জানে। একগাল হেসে সরকারের প্রতিনিধি মন্তব্য করে,
—সেতো নিশ্চয়ই সার। তাছাড়া স্ত্রীপুত্র নিয়ে সংসার করেন। ঘরে ঠাকুরদেবতা আছেন নিশ্চয়ই। এ বাড়িতে পোষায়। সেই ভাল স্যার, আপনি মানা করে দিন। তারপর ডিপার্টমেন্ট মিউনিসিপ্যালিটিকে খবর দিয়ে পরিষ্কার টরিষ্কার করুক।
গাড়িতে উঠে বড় খারাপ লাগল। সত্যি ভদ্রলোক বড় আশা করে এসেছিলেন। আর এমন একটা কদর্য অভিজ্ঞতা হল। আস্তে করে বলি,
—চলুন স্যার আমার বাড়ি। একটু হাতমুখ ধুয়ে চা-টা খাবেন। ফ্রেশ হয়ে তারপর বাড়ি যাবেন খন। আমার গাড়ি আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে। অনিলেন্দু ক্লান্ত ভঙ্গিতে সায় দেন। দুজনেই চুপ। সচিবালয় মার্গ দিয়ে উত্তরদিকে চলছে গাড়ি। চওড়া রাস্তা। দুদিকে বিশাল বিশাল ঝকড়া গাছের সারি। কী নাম সব কে জানে। পড়ন্ত রোদ প্রত্যেকটির সবুজ সম্ভার ঝলমল করছে। কোথাও ঘন কালচে-সবুজ কোথাও বা হাল্কা-সাদাটে। আবার কেউ বা কচি কলাপাতা। সবুজের কত রকমফের। বড় বড় অফিস বাড়ি, অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল, সেক্রেটারিয়েট, স্টেট আরকাইভ। প্রতিটি বাড়ির সামনে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের লন। এই গরমেও ফুল ফুটে আছে। হাল্কা গোলাপি সাদা। কী বলে ওগুলোকে পিটুনিয়া বা বেগগানিয়া। দেবদারুর সারি। সত্যনগরের দিকে চলেছি। অনিলেন্দু আস্তে আস্তে মুখ খোলেন।
