আসলে বাড়িটার ওপর অনিলেন্দুর বরাবর নজর। বেশ কবছর আগে বাড়িটাতে ছিলেন অনিলেন্দুর দাদা (না নিজের নয় জ্যাঠতুতো, নিজের জ্যাঠা নয় অবশ্য বাবার মাসতুতো ভাই) প্রিয়রঞ্জন পট্টনায়েক আই এ এস। সে সময় অনিলেন্দু অনেকবার বাড়িটিতে গেছেন। দেখেছেন কী অপূর্ব কোয়ার্টারটি। একটা বাড়তি অফিস রুম পর্যন্ত আছে, কোনও প্রাক্তন তালেবর বাসিন্দা পি ডবলিউ ডিকে ম্যানেজ করে তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন। বাড়ি যখন ছাড়লেন ঘরখানা তো সঙ্গে যায়নি। পরবর্তী বাসিন্দার ভোগে লেগেছে। তাছাড়া ভুবনেশ্বরের শুকনো লাল মাটিতে ভদ্রলোক দূর থেকে প্রচুর ভাল মাটি ট্রাক বোঝাই করে এনে ফেলেছিলেন বাড়িটার সামনে পিছনে বিরাট জমিতে। গাছগাছালি ফুলফলশাকসবজি কী নেই সেখানে। অনিলেন্দু সোৎসাহে বর্ণনা করে যান, তাঁর ভাউজঅর্থাৎবউদির লক্ষ্মীমন্ত ভাড়ার সারি সারি লম্বাবেঁটে মাঝারি প্রচুর চ্যাপটা পেট মোটা সব রকম বোতল ভর্তি জ্যাম জেলি, গাছের আম, গাছের পেয়ারা থেকে। বড় বড় বয়মে তেঁতুল কঁচা আমের আচার। একেবারে দোকানের মতো টোমাটো সস কেচাপ। আমি শুনতে শুনতে মোহিত।
—আপনার ভাউজ তো দারুণ গিন্নি। খুব কাজের বলতে হবে। আমাদের বাঙালি সমাজে উচ্চমধ্যবিত্ত তো দুরের কথা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের গিন্নিরাও আজকাল ওসব বাড়িতে করার কথা ভাবতেই পারেন না। আমাদের মা-দিদিমার সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে ওসব করা-টরা।
-আরে আমার ভাউজ কি ভাবছেন মা-দিদিমার মতো বাড়িতে করেন? দূর। বড় বড় অফিসারদের সংসারের ধরনই আলাদা। গণ্ডা গণ্ডা কাজের লোক, সব সরকারি পয়সায়। পিয়ন অর্ডারলি মালি ড্রাইভার। দু-পা গেলে বিল্ডিং মারকেটের উল্টো দিকে, গভর্মেন্টের ফুড প্রসেসিং সেন্টার। সেখানে আমপেয়ারা তেঁতুল টমাটো সব নিয়ে যাও, সঙ্গে বোতল চিনি তেলমশলা। নামমাত্র চার্জে একদিনের মধ্যে রেডি। প্রিজারভেটিভ সেন্টারই দিয়ে দেয়। তারপর সারা বছর ধরে খাও।
–বাঃ দিব্যি সিসটেম তো আপনাদের। সরকার তো অনেক সুবিধা দেয় দেখছি এখানে। খুব ভিড় হয় নিশ্চয়?
–না না, ভিড় কোত্থেকে হবে। ওই তো দুচারটে বড় অফিসারদের লোক আর এক আধজন ছুটকে পাবলিক। এই দৈনিক কোটা।
—সে কি। আশ্চর্য! পাবলিকের উৎসাহ নেই?
–উৎসাহ থাকলেই বা কি। কজনের বাড়িতে এত কাজের লোক আছে যে একজনকে সারাদিন সেন্টারে আম টাম দিয়ে বসিয়ে রাখা চলে? কজনের বাড়িতে চাকরের জন্য ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা আছে? বড় অফিসারদের তো সরকারের দৌলতে অর্ডারলি পিয়নদের নামে একটি করে সাইকেল ইস্যু করিয়ে নেওয়ার সুবিধা আছে। ভুবনেশ্বরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট তো নেই বললেই চলে। তাই সাধারণ মধ্যবিত্ত গিন্নিরা ইচ্ছে বা সময় থাকলেও এখানে এসে কিছু করিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না। কাজেই শেষমেষ আই এ এসদেরই ভোগে লাগে।
আমি চুপ করে থাকি। এই স্টেটে আসা থেকে দেখছি এক অদ্ভুত আই এ এস ম্যানিয়া। কলকাতায় আমি একজন আই এ এসকেও চিনি না। আমার গুষ্টিতে কেউ কখনও চিনত না। তারা কারা কোথায় কেমন থাকেন সে বিষয়ে জীবনে কাউকে এতটুকু উৎসাহ প্রকাশ করতে দেখি না। হ্যাঁ, তারা আছেন যেমন আর পাঁচটা চাকুরে থাকে। সচ্ছল বাঙালি মানে ব্যবসায়ী, বড় ব্যারিস্টার, বড় সার্জন। তাদের আর্থিক সাফল্যের ধারেকাছে কোনও চাকুরে আসেনা। ওড়িশাতে এসে দেখি বেশির ভাগের ধারনায় জীবনের সবকিছুর মাপকাঠি এবং সর্ববিধ সুবিধাভোগী আই এ এসরা। আমি কিছু মাথামুণ্ডু বুঝি না। বা বলা উচিত প্রথম প্রথম বুঝতাম না।
কথাবার্তা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম। গেটের সামনে হর্ন দিতেই বাগান পেরিয়ে বাড়ির পোর্টিকো থেকে জি-এডির লোক দৌড়ে এসে গেটটা খুলে দিল। অনিলেন্দু ও আমি নামি। কই চারিদিক তেমন সবুজ তো নয়। বরং কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া। এ রাস্তায় প্রতি বাড়িতে গাড়ি বারান্দার সামনে গোল লন চারিপাশে সুন্দর সমান করে ছাঁটা খয়েরি বা সাদাটে সবুজ হেজ অর্থাৎ বেড়ার গাছ। এখানে তো স্রেফ মাঠ তাও খাবলা খাবলা মাটি বেড়িয়ে আছে। হেজ-এর শক্তপোক্ত গাছগুলো পর্যন্ত জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে। বাকিটা এলোমেলো যদৃচ্ছ বেড়ে থাকা আগাছায় ভর্তি। বাড়ির পাকা ছাদের ওপর একসময় সুন্দর ফলস্ খড়ের চাল ছিল–ভুবনেশ্বরের প্রচণ্ড গরম ঠেকাবার জন্য অতি কার্যকরী দিশি কৌশল। খড় পচে শুকিয়ে ঝরে গেছে। ভেতরে কাঠামোটা ন্যাড়া দাঁড়িয়ে। এখানে ওখানে নষ্ট হয়ে যাওয়া খড় লেগে। অন্যান্য বাড়িতে গাড়িবারান্দাই দুদিক লতায় ছাওয়া। গোল্ডেন শাওয়ার বা হাল্কা সবুজের ভিতর রাশি রাশি গোলাপি সাদা মাধবীলতার গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। অতিথিকেরঙিন অভ্যর্থনা। দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। এখানে সব বর্ণহীন, শুন্য। গাড়িবারান্দার বাঁদিকের থামের এককোণে মাটিতে বাদামি গুঁড়ির মতো কী একটা জেগে আছে। অনিলেন্দু যেন কেমন হতভম্ব হয়ে গেলেন। এদিক ওদিক তাকান। কয়েক পা ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে আসেন। তারপর জিএড়ির লোকটিকে জিজ্ঞাসা করেন।
—আরে সে সব গাছপালা ফুল-টুল সব কই? বাঁদিকে কোণে ভাইনা-র শখের রোজারিয়াম ছিল। স্পষ্ট মনে আছে। কত রঙের গোলাপ হত, খয়েরি, লাল, গাঢ় গোলাপি, কমলা, হাল্কা গোলাপি, হলুদ, সাদা। একটাও তো দেখছি না। অন্য দিকটায় ছিল সব ঝোঁপের গাছ। রঙ্গন-জবা-মর্নিংগ্লোরি। তাও সব কত রঙের। গোলাপি রঙ্গন পর্যন্ত ছিল। আর জবাতো অসংখ্য জাতের, কোনওটা লাল, কোনওটা গোলাপি, লংকা জবা থেকে পঞ্চমুখী সব। ওই তো কয়েকটা রয়েছে দেখছি। কিন্তু এ কী অবস্থা গাছগুলোর, ক্ষয়া মরা যেন কতকাল যত্ন হয়নি। ঝাড়াবাছাকাটা নেই। জলও পায়নি। এই তো পরগাছা জুটে গেছে। ডান দিকে বিশাল কালো জাম গাছটা এমন ছোট হয়ে গেল কী করে? ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল না কি? বাঁ দিকে চার-পাঁচটা পেয়ারা গাছ ছিল। মাটিতে গড়াগড়ি খেত পাকাঁপাকা পেয়ারা, এত ফলন। পাখির মেলা বসে যেত মরসুমে। ঐ যে আধখাচড়া ন্যাড়া ডালগুলো, ওগুলো কি কোনও পেয়ারা গাছনা কি? পেছন দিকে মস্ত তেঁতুল গাছ ছিল এজি কোয়ার্টার ঘেঁষে। হ্যাঁ। ঐ যে আধকাটা গাছটা কি? এ পাশে ডালিম গাছ ছিল একটা তার তো চিহ্নমাত্র নেই। পশ্চিমদিকে আমকাঁঠাল গাছগুলোর এরকম হাল কী করে হল? ওই যে ফাঁকা জায়গাটা ওখানে তো একটা বেশ ঝাকড়া পাতিলেবুর গাছ ছিল, আর একটু দূরে গোটা দুয়েক আতা গাছ। খুব বড় সাইজের আতা হত না কিন্তু খাওয়া যেত। ডালিম গাছটা ফুলে ফুলে চমৎকার দেখাত। ফল অবশ্য বিশেষ হত না। এই এতটুকু হয়ে ঝরে যেত। এত সব গাছ গেল কোথায়?
