মৈত্রেয়ী অন্য সব পার্টিতে প্রথম থেকে শেষ অবধি ফ্লোর মাতিয়ে রাখে। ওর সঙ্গে দমে আমি তো ছাড় আমাদের হাঁটুর বয়সি রবিন সাহাও পারে না (যদিও রবিন ফ্রিস্টাইল নাচে এমনই ওস্তাদ যে শোনা যায় তার শরীরে হাড়গোড় নেই এবং তাই তার একতাদত্ত নাম রবার সাহা। ) মৈত্রেয়ী শুধু নিজেই নাচে না অন্যান্য মেম্বারদের, তাদের বউদেরও টেনেটেনে নাচতে নামায়। আজকে সেই মৈত্রেয়ী দায়সারাভাবে গা-হাত-পা দুলিয়ে দু চারবার নদের নিমাই পোজ দিয়ে ফ্লোর থেকে হাওয়া।
দেখি আধো-অন্ধকারে জলের ধারে টেবিলে বসে। মুখোমুখি বরুণদা। অর্থাৎ বরুণ সেন, ক্লাবের অন্যতম অ্যাডভাইসার, সে সময় ওড়িশা রাজ্যের অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। আমাদের থেকে একটু বয়সে বড়, হুল্লোড়-টুল্লোড়ে খুব একটা থাকেন না, তবে অন্যরা এনজয় করলে মাইন্ড করেন না। ফ্লোরে নিয়মরক্ষার জন্য ঘুরেও যান আমরা ওঁকে একটু সমীহ করি। বয়স ও পদমর্যাদার ভার তো আছেই। তার সঙ্গে আজ পুরো সন্ধেটা মৈত্রেয়ী বসে। আর একটার পর একটা হুইস্কি সাঁটিয়ে যাচ্ছে। আমার দেখে তো বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। এত তো ও সাধারণত খায় না। ফ্লোর থেকে কেটে পড়ে দু-চারবার কাছাকাছি ঘুরঘুর করছি। মৈত্রেয়ী নিজের মনে কী বলে যাচ্ছে–মঞ্চে স্বগতোক্তির মতো অর্থাৎ অন্যে যাতে শুনতে পায়। বরুণদা বিপন্ন দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন। টুকরো টুকরো কথা যা কানে এল তাতে বোঝা গেল প্রেমের ওপর মৈত্রেয়ীর বক্তৃতা। নরনারীর সম্পর্কে নারী সর্বদা হেরো পার্টি। পৃথিবীর সব অল্পবয়সি তরুণী যে দ্বন্দ্বে তার প্রতিযোগী তাতে যুঝবার মতো কী বা অস্ত্র তার আছে। পুরুষের নাকি মন বলে কিছু নেই। আছে শুধুইয়ে। বরুণদার যথাবিহিত সানাদান রবি ঠাকুর আওড়ানো। ওকে ধরিলে তো ধরা দেবে না ওকে ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও।
লে হালুয়া। শেষকালে অমলকুমার দাস যে একসময় বাংলা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারত না যার সস করে কথা মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী লেগে লেগে প্রায় শুধরেছে তার হেপা সামলাতে কিনা আশ্রয় নিতে হয় সেই দাড়ির আলখাল্লায়। মৈত্রেয়ীও পাল্লা দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গ ীতের দু-চারটে কলি ফিট করে দিল। এদিকে একটার পর একটা হুইস্কি চার্জ। শেষে ফ্ল্যাট। তখন এই দশাসই লাস কে সামলায়। বরুণদা তো রাত এগারোটার বেশি কোনও পাটিতে থাকেন। তিনি তারটাইমমতো এজিট নিলেন। আর আমিরাত সাড়ে বারোটায় ওবেরয়ের দুজন বেয়ারাকে মোটা টিপসের লোভ দেখিয়ে ধরাধরি করে বডি গাড়িতে তোলালাম। ভয়ঙ্কর রাগ হয়ে গিয়েছিল। ওবেরয়-এর ম্যানেজমেন্টের কাছে আমার প্রেস্টিজ কী রইল। এর পরে একতার কোনও পার্টি এখানে এমন কম রেটে এত সেশানে করা যাবে?
আচ্ছা আমার রাগটা কি শুধু এই কারণেই?নাকি সেদিনের পার্টিতে আরেকজন অতিথির উপস্থিতি? মৈত্রেয়ীর ওই নারী সংগঠন মার্কা শোষিত বঞ্চিত ভূমিকা অভিনয়ের অপর দর্শক ওড়িশা সরকারের ডিরেক্টর অফ কালচার অনিলেন্দুপট্টনায়েক। সেরাতে সর্বভারতীয় একতার একমাত্র ভারতীয় অতিথি। ওড়িশায় দীর্ঘ বারো বছরের জীবনে স্থানীয় যে কজনের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল অনিলে তাদের মধ্যে প্রধান। বলতে গেলে প্রায় বন্ধু। এখনও মনের পর্দায় ভাসে তার সঙ্গে প্রথম আলাপের দৃশ্য।
সেক্রেটারিয়েটে গিয়েছিলাম কাজে। ইন্ডাস্ট্রিজ ডিপার্টমেন্ট-এ। অভ্যাসমতো কালচার অ্যান্ড ইনফরমেশানে ফুঁ মারতে উপস্থিত। শুনলাম নতুন ডিরেক্টর এসেছেন। ডঃ অনিলেন্দু পট্টনায়েক। তখন বেলা চারটে বেজে গেছে। সেকশানে কেরানিবাবুরা উসখুস করছে। কত তাড়াতাড়ি কাটা যায়। প্রাইভেট সেক্রেটারিকে ভাইদাদা সম্বোধনে ভিজিয়ে একতার আগামী অনুষ্ঠানে ফ্রি পাস দেবার প্রতিশ্রুতির পর নতুন বড় সাহেবের ঘরে প্রবেশাধিকার লাভ। নমস্কার ইত্যাদির পালা শেষ করে সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন একতার মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করছি। এমন সময় পিএ বাবুর প্রবেশ ও সবিনয়ে খবর পরিবেশন, ড্রাইভার অক্ষয় জানাচ্ছে গাড়িটা ট্রাবল দিচ্ছে। একটু গ্যারেজে দেখিয়ে আনতে হবে। ঘড়ি দেখে বিরক্ত মুখে অনিলেন্দু বলেন,
—এই তো ঝামেলা হল। সাড়ে চারটে বেজে গেছে। এখন গ্যারেজে নিলে কখন ফিরবে কে জানে। এদের তো সময়জ্ঞান নেই। ওদিকে জি এ ডির লোক অপেক্ষা করে থাকবে।
—কোথাও যাওয়ার কথা, স্যার? প্রশ্ন করি।
—আর বলেন কেন। নতুন একটা কোয়ার্টার অ্যালটেড হয়েছে। সেটা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল।
অমলকুমার দাস বরাবর ভাল ফিল্ডার, সামনে বল আসতে না আসতে লুফে নেয়।
—চলুন না স্যার আমার সঙ্গে। আমার গাড়িতে আছে। বাড়ি দেখা হয়ে গেলে যেখানে বলবেন ড্রপ করে দেব।
–বলছেন? তা বেশ। দুরঅবশ্য নয় এইসচিবালয় মার্গ দিয়ে ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের মোড় পেরিয়ে কটা বাড়ি পরেই। জি (জেনারেল) এ (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ডি (ডিপার্টমেন্ট) ওপি (পাবলিক) ডবলিউ (ওয়ার্কস) ডি (ডিপার্টমেন্ট) দুটোর লোকই মাথা খেয়ে ফেলছে বাড়িটা একবার দেখে আসতে। আজকে ওরা চাবি নিয়ে থাকবে পাঁচটার সময়।
গাড়িতে যেতে যেতে কথাবার্তা। এই কোয়ার্টারটি পাওয়ার জন্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন অনিলেন্দু। সচিবালয় মার্গের ওপর টাইপ সিক্স বাড়ি ওঁর মতো স্টেট সার্ভিসের অফিসার বছর কুড়ি সিনিয়রিটিতে পায়ই না। ভাগ্যবশত ঠিক আগের বাসিন্দা ছিলেন এক ডেপুটি মিনিস্টার যিনি ক মাস হল নির্বাচনে হেরে গেছেন। ফলে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। এস্টেট অফিসার যাঁর হাতে ভুবনেশ্বরে সব সরকারি বাসস্থান, তিনি আবার অনিলের গাঁয়ের লোক। সেই জন্যই আউট অফ টার্ন অ্যালটমেন্ট করানো গেছে।
