রোগীর নিজের জবানিতে জীবনের যেটি শ্রেষ্ঠ পর্ব সেখানে দেখি তার প্রতিপত্তি ও ক্রিয়াকলাপ প্রচুর। তা সত্ত্বেও মানুষটা ব্যক্তি হিসেবে পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলি সবই গোলমেলে। যদিও পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান–সচরাচর মায়ের প্রিয় তবু মাতৃস্মৃতি অতি ভাসাভাসা। বরং মৈত্রেয়ীকে অনেকটা সে ভূমিকায় দেখা যায়। আর বাবা তো বিরুদ্ধপক্ষ। মজা হল যে মৈত্রেয়ীর জন্য বাহ্যত তার পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল তার সঙ্গে সম্পর্কেও রয়েছে মস্ত ফাঁক। রোগী কখনওই এই ফাঁকটির উৎস বিশ্লেষণে যায় না। তার অন্য নারীসম্ভোগ, মৈত্রেয়ীর প্রতি নিষ্ঠার অভাব শুধু একটি দুটি লাইনে স্বীকারোক্তি। যেন কত স্বাভাবিক যুক্তিসঙ্গত। বিস্তৃত বিবরণ নেই। কার কার সঙ্গে ঠিক কেমন ও কতদুর ঘনিষ্ঠতা। প্রতিক্ষেত্রেই কি শুধু হরমোনউদ্দীপিত উদগিরণ—নাকি তার উর্ধ্বে আর কিছু। সাদা বাংলায় অন্য কারো সঙ্গে ভালবাসাবাসি হয়েছিল কি না। এ সব প্রশ্নের ধারেকাছেই রোগী যায় না।
মৈত্রেয়ীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল? ঠিক কী ধরনের অনুভূতি বা বাধ্যবাধকতায় সে অন্য মেয়েদের সঙ্গে অমলকুমারের ঘনিষ্ঠতা হতে দিত? ব্যাপারগুলো বাস্তবে কি একই বাড়িতে, এক ছাদের তলায়, নাকি একেবারে একই শয্যায় ঘটত? কোনটা স্বাভাবিক ব্যবহার কতটা অন্যরকম হলে বিচ্যুতি অস্বাভাবিকত্ব অসুস্থতার পর্যায়ে পড়ে? পৌরাণিক যুগে কুষ্ঠরোগগ্রস্ত স্বামীকে স্ত্রীর বেশ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া সতীত্বের পরাকাষ্ঠা ছিল, বিকারের প্রশ্ন ওঠেনি। তাহলে কি সুস্থ অসুস্থ স্বাভাবিক অস্বাভাবিক পরস্পর বিরোধী নয়? যে কোনও মূল্যবোধ একান্তভাবে স্থান-কাল-পাত্র নির্ভর? চিরন্তন বিশ্বজনীন মানদণ্ড বলে কিছুই নেই।
সভ্যতায়, মানুষের আস্থা বজায় রাখা মনোবিজ্ঞানীর পক্ষে বড় শক্ত।
.
ছায়া দেবনাথকে তো সব কথা বলা যায় না। আমাদের দেশে সাক্ষাৎকার কথোপকথন অমুকের সঙ্গে কিছুক্ষণ, তমুকের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা, সবই বাঁধাধরা গৎ। পাবলিকের জন্য। আমাদের ছোটবেলায় দেখা হিন্দি সিনেমায় নায়িকাদের বুকের আঁচল—আধখানা ঢাকা। আধখানা বের করা। ঠিক যতটুকু দেখাতে চাই ততটুকু দেখাই। সাজিয়ে গুজিয়ে ওপরে তুলে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু চোখা একটু বেশি নিটোল। সেটাই জীবন বা বাস্তব নামে চলে। একবার ট্রেনজার্নিতে হুইলারের স্টল থেকে দমিনিক লাপিয়েরের সিটি অফ জয় কিনে পড়বার চেষ্টা করেছিলাম। হাওড়ার একবস্তিতে একজন সাহেবের বসবাসের অভিজ্ঞতা (এর থেকে কলকাতাকে কেন সিটি অফ জয় বলে বুঝতে পারি না, ঘটনাতো হাওড়ায়)। এটি পড়তে পড়তে প্রচুর জ্ঞানলাভ হল যেমন বস্তির অতটুকু ঘরে গাদাগাদি স্ত্রী-পুরুষ ছেলেমেয়েদের পারিবারিক জীবন প্রায় আদর্শ স্থানীয়। শিশুশ্রম নির্ভর বাবা-মা নেই, বদ্ধমাতাল, বেকার স্বামী বা বাপ নেই, নেই হিংসা জবরদস্তি নিষিদ্ধসম্পর্কে গমন। বড়জোর স্বামীটি বাইরে থেকে যৌনরোগ বয়ে আনে–সেটা ফরাসি লেখকের কাছে হাম বা চিকেন পক্সের সমগোত্রীয়। নৈতিকতা বা শরীরের শুদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কবর্জিত।
পড়তে পড়তে মনে হল গরিব হলেই যদি এমন পবিত্র সুসভ্য জীবন যেখানে একমাত্র সমস্যা খাটা কল-পায়খানা আর দেশে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাহলে সবাই গরিব হয়ে যাই না কেন? তাদের উন্নতিবিধান তো একেবারে উচিত হয়। অবস্থা ভাল হলে, তথাকথিত আধুনিক এবং যন্ত্র সভ্যতার সংস্পর্শে এলে তারা তো সব আমাদের মতো এক একটি হারামি হয়ে যাবে। একেই বলা হয় বাস্তবচিত্র! লেখকের দায়বোধ, সামাজিক দায়িত্বপালন ইত্যাদি ইত্যাদি। বাইরের লোকের কাছে আমাদের দেশে কোন্ মেয়েপুরুষ তাদের ঘরের কথা, বিছানার কথা মনের কথা প্রকাশ করে? কোন্ সাহেব বুঝতে পারবে তৃতীয়বিশ্বের বস্তিতে পাঁচবছরের মেয়ের মুখে ভাষা মানে খিস্তি? একদিকে পিছিয়ে পড়া মানুষের করুণা আর ভিক্ষা আদায়ের ধান্দা, অন্যদিকে সাহেব তথা লেখকের মাহাত্ম প্রচার। নিপীড়িত নিষ্পেষিত শহীদ হয় মধ্যবিত্ত লেখনীতে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দোভাষীর কাজ সম্মানজনক। সিনেমা-টিভি গল্প উপন্যাস সর্বত্র শোষিত গরিব নারী ও এদের দুঃখ-দুর্দশা নির্যাতন সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয়বস্তু। সত্যিকথা বলতে কেউ রাজি নয়। বাঙালি জাতটা যে পচে গলে গেছে সাহিত্যই তার প্রমাণ।
তবে আমিও বাঙালি। পুরো সত্যি বলব কেন। এই যে মৈত্রেয়ীকে আমি একটা মাদারফিগার হিসেবে দেখাতে চাইছি সেটা তো অর্ধসত্য মাত্র এবং যে কোনও অর্ধসত্যের মতো মিথ্যার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। মৈত্রেয়ীর অপার ঔদার্য অবাধ প্রশ্রয় যা অনেকটাই মাতৃসুলভ এবং বাঙালি লেখকের মাপকাঠিতে নারীত্বের মহিমায় ভূষিত এবং যা আমাকে বরাবর ক্ষিপ্ত করেছে, নীচে নামিয়েছে, তাই কি আমার প্রতি মৈত্রেয়ীর মনোভাবের সম্পূর্ণ পরিচয়? তার মধ্যে কি প্রেয়সী রমণীর অভিমান অন্তর্বেদনা কিছুই কখনও ছিল না?
সেই যে বিজয়া সম্মিলনীটা। কবে যেন, কোন্ সালে। সন তারিখ কিছুতেই মনে পড়ে। সেবারে পুজোতে একর বেশিরভাগ সদস্য বাইরে গিয়েছিল। লক্ষ্মীপুজো পার করে ফিরেছে। কোনও অনুষ্ঠানের প্ল্যানট্যান নেই। তবু কিছু তো করতে হবে। শেষে একটা গেট-টুগেদার ঠিক হল। ওবেরয় ভুবনেশ্বরে সুইমিং পুলের পাশে পানভোজন। ডিনারের জন্য যথারীতি চাদা, ড্রিংকে লাগবে কুপন। যেমনটি আমাদের অন্যান্যবার হোটলে গেট-টুগেদার হত। সেবারে পুজো দেরিতে ছিল। সন্ধেবেলা বেশ ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা। সুইমিংপুল এর ধারে বসার ব্যবস্থা। এক কোণে মিউজিক। হিন্দি ঝম্পর-ঝম্পর ছাড়া তো একতা র পার্টি ভাবা যায় না। দু-এক রাউন্ড ড্রিংকের পর প্রথমে বাচ্চা ও টিনএজার ছেলেমেয়েরা ও তারপর তাদের বাবামা-রা একে একে নাচতে উঠে গেল।
