—ছি, ছি, এটা কী এ্যামের কাহিনী! আপনার নিজের ভালবাসার মানুষ কিনা আপনারে মাইয়া যোগায়। রাম রাম। আর আমি আপনার সাথে কথা কমু না।
তারপর কদিন ছায়া দেবনাথের পাত্তা নেই। আর অমলের ঘরে আসেনি। নার্সিং হোমটার ডিসিপ্লিন সম্বন্ধে অমলের ধারণা মোটেই উঁচুনয়—একজন নার্স খেয়ালখুশিমতো রোগীর ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। আবার মর্জি হলে একেবারে আসেই না। আশ্চর্য। ছায়ার বদলে যিনি এলেন তিনিও পূর্ববঙ্গজ, লম্বাচওড়া দশাসই চেহারা, একেবারে কথা বলেন না। মেশিনের মতো গায়ের তাপ রক্তচাপ মেপে ওষুধ বাড়িয়ে দিয়ে চলে যান। অমল জিজ্ঞাসা করে,
—ছায়া দেবনাথ ডিউটিতে আসেনি?
কোনও উত্তর নেই। আবার জিজ্ঞাসা করে,
—ছায়াকে দেখছি না তো কদিন। ছুটিফুটি নিয়েছে নাকি?
তখন একটি সংক্ষিপ্ত জবাব যার কোনও মানে হয় না,
—এলেই দেখতে পাবেন। অতঃপর মেশিনদিদির প্রস্থান।
এখন অমলে বড় একঘেয়ে লাগে। ঘরটার এ মাথা ও মাথা পায়চারি করে। বাইরে টানা করিডোরের ও প্রান্ত থেকে এ প্রান্ত। একদিন মনে হল খবরের কাগজটা দেখলে হয়। খোলে। হিন্দি, ইংরেজি, আঞ্চলিক ভাষা। অজানা সব নাম, অচেনা মুখের ছবি। ভাজ করে রেখে দেয় খবরের কাগজ। খেতে ও ইচ্ছা করে না। তবে খোপখোপ স্টেনলেস স্টিলের থালায় দুবেলার খাবারটার কোনটায় ফিরিয়ে দেয় না। জানালা দিয়ে ফেলে দেয়। আশ্চর্য, মেশিনদিদি ঠিক টের পান।
–কি, খাওয়া দাওয়া করছেন না কেন? খিদে নেই? কী খেতে ইচ্ছা করে? উত্তর শুনেই চলে যান।
ডাক্তার রাউন্ডে এসে একই প্রশ্ন করেন, একবারে এক ভাষায়। জবাব না পেয়ে আরেকটা জিজ্ঞাসা,
-আচ্ছা অমলবাবু,আপনার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না?
–বাড়ি। অমল যেন ঘুম থেকে ওঠে।
–হাঁ বাড়ি। এইতো আপনার ঠিকানা আছে, সিস্টার পড়ুন তো।
–বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতি, উনিশের এক …
–থাক থাক। ঠিকানা দিয়ে কি হবে। নিজের বাড়ি কোথায় জানি না ভাবছেন। বিরক্ত হয় অমল।
-না না তা বলছি না। জানেন তো নিশ্চয়। পুরনো বাড়ি কতকালের, বলছিলেন না তিন-পুরুষের? আপনি ব্যাচেলর মানুষ, রিটায়ার্ড লাইফ। বাপঠাকুরদার বাড়িতে কাটাবেন এটা তো নরম্যাল। যাবেন?
অমল মাথা নাড়ে, না। বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতি সে তো কতকাল ত্যাগ করেছে। চলে যেতে চেয়েছে তার ত্রিসীমানা থেকে। ইন্ডিয়া বিরাট দেশ। নিজেকে প্রমাণ করবার কত সুযোগ সেখানে। বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতি তার কাছে মৃত।
হঠাৎ আবার ছায়া দেবনাথের আবির্ভাব। না, অমলের কাহিনী সম্পর্কে তার উৎসাহ শেষ হয়নি। যেন সে স্টেনোগ্রাফার, সেবাটেবা জ্বরমাপা রক্তচাপ পরীক্ষা তার কাজের অঙ্গ নয়, নেহাত ফালতু। প্রথমেই ব্যাগ থেকে কাগজের গোছা বেরয়।
–ন্যান, শুরু করেন। তবে একটা কথা কিন্তু জাইন্যা রাখেন। আপনি মানুষটা মোটেই হিরো নন। হিরোয়িনের উপর অ্যামন অত্যাচার হিরো কখনও করে না। আপনি নিজে বলছেন তাই বিশ্বাস করছি। নইলে সত্যি ভাবা যায় না। আপনার বিবেকবুদ্ধি নীতিজ্ঞান কিছুই ছিল না? সাহেব-ম্যামদের মতো যেখানে সেখানে ছি ছি।
—দেখ, বেশি জ্ঞানফ্যান দিতে এসোনা তো। সেদিনকার মেয়ে, কিছু তো জানোনা। তারওপর বাঙাল, বলি আমাদের হিন্দু সমাজে তোমার ওই নীতি-ফিতির বালাই কবে ছিল,অ্যাঁ? কুষ্ঠরোগগ্রস্ত স্বামীকে বেশ্যাবাড়ি নিয়ে যাওয়া যেখানে সতীত্বের আদর্শ সেখানে মৈত্রেয়ী সুস্থসবল অপরিতৃপ্ত এবং অবিবাহিত স্বামীকে দুচারটে মেয়ে এনে দিয়েছে তোত কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? তাছাড়া ওই কি একলা আমার জন্যে কিছু করেছে? আমি করিনি? তার মন পাবার জন্য দুহাতে খরচ, এত অনুষ্ঠান জমায়েত, বম্বে কলকাতা মাদ্রাজ থেকে আর্টিস্ট আনা, তাদের সঙ্গে দরদস্তুর খাওয়া-থাকা যাতায়াতের বন্দোবস্ত, ফাংশনের ফিনান্স, পুলিশের আয়োজন, টিকিট বিক্রি একটা পাবলিক ফাংশান নামানো কম কথা ভাবছ। আর প্রত্যেকবার স্টেজে কোনও না কোনও ছুতোয় মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর উপস্থিতি এবং তার উপর নিউজ পেপার টিভির ক্যামেরা ফোকাস, বিশেষ উপহার গ্রহণ বা প্রদান। তার জন্য তো লাইন আপ করতে হয়েছে পার্টিকে। কখনও রুরকেল্লা স্পঞ্জ আয়রণের বোস কখনও কলকাতার ফিয়ারলেসের গুপ্ত। এসব করতে এলেম লাগে না ভাবছ?
—মানলাম আপনিও না হয় বেশ কিছু করছেন। শোধবোধ। কিন্তু তা হইলে আজ আপনি অ্যাকলা ক্যান? মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী গ্যালেন কই?
অমল চুপ। উত্তর দেয় না।
–কী হল? বলবেন না? ছায়া মেয়েটা নাছোড়বান্দা। যেন জোঁক। একবার ধরলে পেটপুরে মালটি চুষে খেয়ে তবে খসবে।
অমল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
-দেখ সবসময় বকরবকর ভাল লাগে না। তুমি কে সবকিছুর কৈফিয়ত চাইবার? কী হবে তোমার এসব জেনে? তোমার তো অন্য পাঁচটা পেশেন্টও দেখবার কথা। তুমি মোটেই আমার স্পেশাল নার্সনও। সারাক্ষণ আমার ঘরেই বা বসে থাকো কেন? আর অত লেখাফেখার দরকার কি? এত যে পেশেন্ট আছে এখানে তাদের সকলের কাহিনী লেখা হচ্ছে?
–বাবা। আপনি দেখি একেবারে খেপচুরিয়াস? কাগজের তাড়া গোছাতে গোছাতে ছায়া উঠে দাঁড়ায়, এখন যাই। মেজাজ ঠাণ্ডা হলে আসব। ছায়াকে ধ্যাতানি দিলে দিব্যি শুদ্ধ বাংলা বেরোয়। এমন কি বাঙাল টানটাও বোঝা যায় না। আশ্চর্য। স্ত্রী জাতির চরিত্র থেকে ভাষা সবই রহস্য।
৫. রোগীর নিজের জবানি
ছায়া দেবনাথের গবেষণা, কেস নং ৯
