মাঝে মাঝে মনেহয় সতীত্ব একনিষ্ঠতা নিয়ে বাড়াবাড়ি পুরুষের বোকামি, তার দুর্বলতার সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রমাণ। নারীমাত্রেই প্রায় যে কোনও সুস্থ স্বাভাবিক পুরুষকে দৈহিক তৃপ্তিদানে মোটামুটি সমর্থ। কিন্তু পুরুষমাত্রই যে কোনও নারীর সন্তোষবিধানে সক্ষম নয়। এইখানেই প্রকৃতি মেরে দিয়েছে পুরুষকে। অপরিতৃপ্ত নারীকে বড্ড ভয়। আদিম পুরুষ নারীকে বিকলাঙ্গ করে দেয় তার সুখানুভূতির উৎসকে উৎপাটিত করে। সভ্য জগৎ অতটা নির্মম হতে পারে না। তাই সর্বদা দখলদারির চেষ্টা। শাখাসিঁদুর-লোহায় স্বত্ব ঘোষণা। স্বামীত্ব প্রতিষ্ঠা। যেহেতু ঐ শাখাসিঁদুর-লোহায় সিলমোহর আমাদের সম্পর্কে লাগানো হল না তাই কি মৈত্রেয়ীর ওপর আমার এক্তিয়ার জারির চেষ্টা চলেছে আঁকাবাঁকা পথ ধরে? তাকে কজা করার জন্য কী করেছি। জীবনের কত সময় কত উদ্যমের অপচয়। কখনও ঘুস দিয়ে কখনও বা ভয় দেখিয়ে। সপ্তাহান্ত কাটাতে ভাল ভাল হোটেলরেসর্ট। পুরী-চাঁদবালি-দীঘা-বকখালি। ছেলেকে কী বলবর একঘেয়ে বেসুরো স্বরকে সবলে দমন। কলকাতার পার্কস্ট্রিট-থিয়েটার রোডে ডিনার। জন্মদিন পুজো নববর্ষে বাংলাদেশি ঢাকাই মসলিন-বিষ্ণুপুরী। সর্বদা না হোক যখন যা নতুন ফ্যাশান তাই উপহার। সবেতেই শুধু এক ধুয়ো, তুমি যে আমার তুমি যে আমার।
ক্রমাগত তুষ্টিবিধান মন জোগানোর উৎস থেকেই প্রায় শেষ পর্যন্ত ভুবনেশ্বরে একতা ক্লাবের প্রেরণা। সর্বভারতীয় এই সাংস্কৃতিক সংস্থাটির প্রতিটি অনুষ্ঠান, তার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের প্রতিটি সামাজিক সমাবেশের তারিখ ঠিক হত বজবজের একটি নার্সারি স্কুলের হলিডে লিস্ট অনুযায়ী। অ্যানুয়েল মেগাফাংশনে, কোন্ আর্টিস্ট আনলে ভাল, ইন হাউস নাটক কী হবে, কারা কোন্ রোল করবে, রবীন্দ্রজয়ন্তী নববর্ষ বিজয়া সম্মিলনীতে শুধু গান আর আবৃত্তি নাকি সঙ্গে গীতিনাট্য, সদস্যদের ছেলেমেয়েরা কে কী করবে ইত্যাদি সর্ববিধ কার্যক্রমের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একজনের, শ্রীমতী মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর। অথচ তিনি ক্লাবটির সদস্য পর্যন্ত নন। আ মেম্বার একস্ট্রাঅর্ডিনারী।
একতাক্লাবের অস্তিত্বের মূলে ছিলাম আমি। আর আমার সব কিছু আবর্তিত মৈত্রেয়ীকে কেন্দ্র করে। তার কাছে আমি বরাবর সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র এবং সে বয়সে বড় প্রায় অভিভাবিকা। নামকরা কোন এক লেখক নাকি নারীও রমণীর মধ্যে পার্থক্য দেখতে। তার কাছে প্রেয়সী বা রমণীর চেয়ে নারী শ্রেয়সী কারণ সে মা। আমার তো ধন্দ এখানে। প্রকৃতির নিয়মে জন্মদায়িনী মায়ের ভূমিকা অমূল্য কিন্তু সাময়িক, সন্তানের সাবালকত্বের সঙ্গে সঙ্গে তার ইতি। আবার সে চায় জুড়ি। খুব কম প্রাণীর ক্ষেত্রেই সেই জুড়ি এক ও অদ্বিতীয়। মানুষের সবই গোলমেলে। কামের সঙ্গে প্রেম, আবার প্রেমের সঙ্গে বাৎসল্য, যে যত মেশাতে পারে সে তত ভারী।
আমার সম্বন্ধে মৈত্রেয়ীর অসীম ধৈর্য সহনশীলতা, আমার স্বভাবচরিত্রের গোপন অন্ধিসন্ধি বোঝার ভয়াবহ ক্ষমতা–সবই কেমন তাকে একটা ওপরের আসনে বসায়। আর আমাকে ঠেলে দেয় তলায়। তার মনের, তার দেহের চাহিদার কতটুকু আমি বুঝি। একান্ত নির্জনে স্বপ্নবিলাসে তার যে বাসনাকামনা তা কি আমার আয়ত্তে। এ ছাড়া ছেলে আর সে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বৃত্ত। সেখানে বায়োলজিক্যাল ফাদার কল্যাণ চক্রবর্তী ও বিকল্প পিতা আমি দুজনেই বাহিরি, বহিরাগত। মৈত্রেয়ী আমার এত কাছের হয়েও কেমন যেন নাগালের বাইরে। তাকে ঘিরে একটা রহস্যের বলয় যা আমি কিছুতেই ভেদ করতে পারি না।
কতবার চেষ্টা করেছি তাকে আঘাত দিতে। আভাসে ইঙ্গিতে কখনও বা স্পষ্ট কথায় তাকে একতার কতটুকু আজ ছেলে আমাদের সহবাসের অপ্রতুলতাকে প্রেমের বিশাল প্রতিবন্ধ করে তুলেছি। এবং সেই ছুতোয় তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কত হাফগেরস্ত অমুক কনসার্টের মিস পলি অমুক গ্রুপ-এর মিস জুলি-র সঙ্গে গা শোকাশুকি। কী ভাবত কে জানে। পরের গরমে বা পুজোর ছুটিতে সঙ্গে নিয়ে আসত স্কুলের কোনও অল্পবয়সি টিচার। বেশির ভাগ লিভ ভেকেন্সির সাময়িক চাকুরে। ইচ্ছে করে সুযোগ জোগাত ঘনিষ্ঠতার। পুরী কোণারক চিল্কা দর্শনের সঙ্গে তাদের জন্য বাড়তি টোপ গোপালপুরের নির্জন সৈকত, তপ্ত পানির হট স্প্রিং বা সিমলিপালের জঙ্গল।
আমার পদস্খলনও তারই হাত ধরে। বেয়াড়াপনাতেই কি তার সর্বময় কর্তৃত্বের বাইরে যেতে পেরেছি। পারিনি। সেই সব নিরীহ মেয়েলি-প্রায়শ-অতিগরিব মেয়েরা সম্পূর্ণভাবে মৈত্রেয়ীর অনুগামিনী একান্ত বাধ্য ভক্ত। শান্তা কুণ্ডু, স্মৃতি পাল বা মিত্রা মণ্ডল কখনওই মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর জায়গা নিতে পারেনি। আমি, মৈত্রেয়ী ও তৃতীয়জন–তা সে যেই হোক না কেন—সর্বদা এক সমদ্ববাহু ত্রিভুজ যে ছকে মৈত্রেয়ী সর্বদা আমার সঙ্গে সমান। এবং আমার অনুভূতিতে একটু বেশি বড়।
.
–কই, আপনি যে অন্য সব মাইয়াদের ভালবাসতেন তাদের কথা কিছু বলেন না ক্যান্? হাজার হোক উপনায়িকা তো।
আজ ছায়া দেবনাথ হঠাৎ ভারী উদার। অমল তার কাহিনীতে অন্য নারীদের উপস্থিতি প্রকাশ করার পর ছায়া দেবনাথ খুবই বিচলিত হয়েছিল। তার বিশ্বাসে ভদ্রঘরের নারী পুরুষের সম্পর্ক মানেই ভালবাসা। শুধু কাম বা দৈহিক সংস্পর্শ তার জগতে খারাপ মেয়েদের এলাকা। তার অভিধানে প্রেম একেবারে নিকষিত হেম না হলে রক্তমাংসের বাস্তব থেকে একটু দূর। বরং সিনেমা টিনেমায় নায়ক নায়িকার জোড়বেজোড়ের খেলায় সে প্রেমের চিরন্তর ছকটি পায়, বিশ্বস্ততা যার ভিত্তি। জেলের মেয়ে স্বপ্নার মাহাত্ম্যে সে মুগ্ধ। অমলের ছুটকো-ছাটকা উপরি পাওনা তার কাছে বিশ্বাসঘাতকতা পাপ। ব্যাড এনাফ। তারওপর যখন আভাস পেল মৈত্রেয়ীর নিজেরও অমলের যদৃচ্ছ গমনে কিঞ্চিৎ ভূমিকা আছে তখন সে একেবারে বিপর্যস্ত।
