তবে মৈত্রেয়ীর একনিষ্ঠতা সম্বন্ধে অমলের কোনওদিন বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি। তার প্রতি মৈত্রেয়ীর টান যে শতকরা একশো ভাগ খাঁটি, একেবারে খাদশূন্য সে বিষয়ে অমল বরাবর নিঃসন্দেহ। অমলের চাকুরি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় তার সহানুভূতি সখ্য উপদেশ সর্বদা মজুত। অমলের পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালনে সেভাগীদার—পুজোতেমা বউদিদের জন্য শাড়িবাছা, ভাইফোঁটায় উপস্থিত থাকলে দিদির জন্য কী,শীতে বাবাকে শাল, ভাইপো ভাইঝি ভাগ্নে ভাগ্নিদের মুখেভাত জন্মদিন ইত্যাদিতে সুযোগ সুবিধামতো উপহার কেনা। অমলের সব পারিবারিক সামাজিক নিত্যদায় পালন তার কর্তব্য কর্মের মধ্যে বলে মৈত্রেয়ী ধরে নিয়েছিল। সুগৃহিণীর মতো অমলের বাজেট অনুযায়ী। অর্থাৎ মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর বিয়ে না হলেও বলতে গেলে অমলকুমার দাসের স্ত্রী এবং অধিকাংশ স্ত্রী যেমন নিছক নিষ্ক্রিয়তার অভ্যাসে স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকে মৈত্রেয়ীও তেমনই অমলের প্রতি বরাবর বিশ্বস্ত ছিল। যদিও অমল ছিল না।
—আপনি তা হইলে আর পাঁচটা মরদেরই মতো অ্যা? সে মাইয়াটা আপনার লাইগ্যা স্বামী সংসার ছাড়ল আপনি কিনা তারে পথে ভাসাইয়া দিব্যি…
–আঃ। ছায়া দেবনাথকে নিয়ে আর পারা গেল না। সর্বদা সর্দির মতো সেন্টিমেন্টে ফ্যাসফ্যাস করছে। অমল বাধা দেয়,
—আরে রাখো তোমার বস্তাপচা কাঁদুনি। আমিই বা কিসের মরদ আর মৈত্রেয়ী বা কোন কুসুমকোমল অসহায় নায়িকা, প্রতারণার শিকার! সোল ম্যানস্ ওয়ার্লড়! হাঃ। আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা কি কম! বাস্তব অনেক অন্যরকম বুঝেছ।
–বাস্তবটা আপনাদের ক্যামন খোলসা কইর্যা কন দেখি।
মাথামোটা বাঙালদের সব কিছু চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয়। মৈত্রেয়ীর জীবনে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু? সে নিজে তো পুরুষের বাবা। তার যৌবনের পাতলা ছিপছিপে চেহারাটি কবছরেই প্রধান শিক্ষয়িত্রী-সুলভ ভার ও মেদ অর্জন করেছে। হাত পায়ের লোম দিনকে দিন আরও ঘন আরও কালো। গলার স্বর পাল্লা দিয়ে কর্কশ। যেন আধাপুরুষ, পুংহরমোনের মাত্রাটা বেশ অধিক। স্কুলের সব অল্পবয়সি মেয়েলি-মেয়েলি পাতলা টিচারদের ভয় ও ভক্তি তার উদ্দেশে নিবেদিত। স্কুলের পুরুষ পিয়ন-জমাদার-কেরানিবড়বাবু তার কড়া শাসনে তটস্থ। যেন সনাতন একান্নবর্তী পরিবারের দোর্দণ্ডপ্রতাপ কর্তা। কর্মক্ষেত্রের বাইরে তার হাবভাবে নিঃসঙ্কোচ আত্মবিশ্বাস—সঞ্চয়িতায় মোটা টাকা লগ্নি করে লোকসান সত্ত্বেও দমে না। বাবা-মা ডিভভার্সি মেয়েকে বসতবাড়িটিতে জীবন স্বত্ব লিখে দিয়েছেন, সারা জীবনে জমানো টাকার সিংহভাগও। প্রাথমিক তিক্ততার পর ছেলের ভরণপোষণে প্রাক্তন স্বামী কার্পণ্য করেননি। তাঁর দ্বিতীয় সংসারে পুত্রকন্যা-লাভের দরুন এই ছেলের ওপর অকারণ দখলদারিও নেই। সব মিলিয়ে মৈত্রেয়ী অনেক পুরুষের চেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অমলের চেয়ে তো বটেই। বরং অমলেরই পৈত্রিক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার অনিশ্চিত। বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতির যে ঘরখানাতে তার কিছু স্বত্ব ছিল সেটিতে যে সবৎসা গাভীর স্থিতি হতে পারে না সে মোদ্দা কথাটি বহুবার শোনা। তার কর্মজীবনের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর হায়দ্রাবাদে ভূপালে নতুন চাকরি নিয়ে স্বস্তি পেয়েছিল বটে কিন্তু কোনওটাই পুষ্পশয্যা নয়। এখানেও অর্থাৎ পাবলিক সেক্টর ফিনানসিয়াল ইনস্টিটিউশানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর রাজনৈতিক চাপ বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপের স্বার্থ ও মর্জি অনুসারে তার কাজ পরিচালিত। আধুনিক ভারতে চাকরিতে ক্ষমতা আর উদ্বগ প্রায় সমান্তরাল। এদিকে সহকর্মিণীদের বশ্যতা বন্ধুত্ব এবং সন্তানের মা হিসেবে আপাতসন্তোষে মৈত্রেয়ী পুরুষহীন জীবন দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারে বটে কিন্তু অমলের পক্ষে নারীসঙ্গহীনতা শাস্তি। অর্থাৎ তার স্বাধীনতা অতি সীমিত। স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রশ্ন হাস্যকর। মৈত্রেয়ীর তুলনায় অমলের জীবনে পরিপূর্ণতা বোধ কোথায়। অথচ সে একটা প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষিত উচ্চপদাধিকারী পুরুষ। অতএব, তার একমাত্র উপায় অন্য নারী। সে যেই হোকনা কেন। কখনও শুধু একরাতের সঙ্গিনী, কখনও বা কয়েক সপ্তাহের।
ছিঃ ছিঃ, ছায়া দেবনাথ এতখানি জিভ কাটে। কানে আঙুল দেয়,
—এইটা একটা কী কন। আপনে মানুষটা এত দুশ্চরিত্র। এ সব কথা শোনাও পাপ। কাগজকলম গুছিয়ে নিয়ে ছায়া উঠে যায়।
—যাই, আমাকে আবার অন্য পেশেন্টের ঘরে যেতে হবে। হঠাৎ তার বাংলা ঠিক হয়ে যায়।
অমল আর কিছু বলে না। বাঙালদের নীতিজ্ঞান বড় বেশি। ঘটিরা এসব বিষয়ে অনেক প্র্যাগমাটিক, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন। একটা পূর্ণ বয়স্ক পুরুষের দেহের চাহিদা নেই! বাঙালদের ভাবভঙ্গিই অদ্ভুত। সেইনাইন্টিস্থ সেরিব্রাহ্ম। অমলের ভারি বয়েই গেল। তার জীবনকাহিনী ছায়া দেবনাথ শুনুক বা না শুনুক কী এসে যায়।
.
সতীত্ব একনিষ্ঠিতা যে কত অর্থহীন নিষ্ফল তা তো আমার জীবনেই উপলব্ধি করলাম। স্বামীত্যাগিনী মৈত্রেয়ী এতদিন আমাকে ছাড়া আর কোনও পুরুষকে জানতই না—কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন তো দূরের কথা। এতে আমার কি স্বর্গ লাভ হয়েছে? বরং অন্য কোনও পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হলে একটু উত্তেজনা একটু মনোমালিন্য বুদবুদ জাগাত নিস্তরঙ্গ জলাশয়ে। সম্পর্কটা ধরে নেওয়া নিশ্চিন্ততায় মরে হেজে যেত না। চিরন্তন সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে দুজন অচেনা মানুষ কদিনের জন্য পরস্পরের কাছে আসে। কিন্তু সেই জায়গায় তো স্থির থাকতে পারে না। ফ্রেমে বাঁধাই দেওয়ালে টাঙানো, গলায় মালা অমর প্রেমে প্রাণের স্পন্দন কই। আমি যদিও কাব্য-টাব্যর ধার ধারিনা তবু কেন জানি না আমাদের সেরা ছাত্র সাহিতপ্রেমিক অনিরুদ্ধর আবৃত্তি করা পদ্যের একটা লাইন মনে গেঁথে আছে। দ্বিধাবিজড়িত লজ্জাজড়িত হে হৃদয় ঝাউবৃক্ষের পাতা। এমন হৃদয় কোথায় কেমন করে পাওয়া যায় তার হদিশ তত অনিরুদ্ধ দেয়নি। একনিষ্ঠতা, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ বা উত্তরাধিকারে প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তাতে কোনও যাদুর ছোঁওয়া নেই।
