তবে অমলও পুরুষ অতএব সমান জেদী এবং একদিক দিয়ে রক্ষণশীল। অর্থাৎ নিজের জেদে অপরিবর্তিত। তারই ফলে বোধ হয় মৈত্রেয়ীর সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে গেল স্থায়ী। মানুষের জীবনে কার্যকারণ সত্যি অদ্ভুত। অমলের বাড়ির তুলনায় মৈত্রেয়ীর পরিবারে বিরূপ আবহাওয়া কিন্তু অনেক তাড়াতাড়ি বদলে গেল। বার্ধক্যের বন্ধ্যা নীরস গতানুগতিকতায় একটি শিশুর আগমন, বুদ্ধিমতী কর্মপটিয়সী কন্যার সাহচর্য বাবা মার মনোভাবকে অল্প দিনেইনরম করে ফেলল। সবচেয়ে বড় কথা মৈত্রেয়ীর চাকরিতে সাফল্য লাভ। তার জনপ্রিয়তা ও প্রতিষ্ঠা অর্জন। যেমন ভাল তার ইংরিজি, যেমন কড়া তার ডিসিপ্লিন তেমনই উৎসাহ এক্সট্রাকারিকুলারে। তার পরিচালনায় স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান প্রায় পেশাদার মান ভূঁইছুঁই। ছেলেমেয়েদের নাচ গান নাটকে তার আগ্রহের শেষ নেই। গভর্নিং বডি খুশি। চটপট উন্নতি। কয়েক বছরে হেড মিসট্রেস। সহকর্মিণী সীমা ঘোষ, অনিন্দিতা সেন, মধুমতী রায় বা গভর্নিং বডির পি মুখার্জি, এস বাসু, টি কৃষ্ণ, অভয় মিত্র তার জীবনে অমলের চেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে হয়তো থাকতেন না কিন্তু অনেক বেশি সময় দখল করে নিতেন। যেমন অভয় মিত্র, যাঁর বাড়ি ছিল বালিগঞ্জ প্লেসে। মৈত্রেয়ীর বাবার হার্ট অ্যাটাকে আই সি ইউ-র বন্দোবস্ত তিনি করলেন। মৈত্রেয়ীর ছেলে জয়েন্ট এন্ট্রান্সে কিছুই পেল না তখন কর্নাটকের এক কম খরচের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সন্ধান পাওয়া গেল তাঁর কাছ থেকে।
মানুষের সম্পর্কে পারস্পরিক যোগাযোগের সময় দৈর্ঘ্যের বদলে না কি তার গুণে বিচার করতে হয়। কিন্তু এটা তো অস্বীকার করা যায় না যে মৈত্রেয়ী ও অমলের প্রাত্যহিক জীবনে বেশির ভাগ সময় তারা পরস্পরের থেকে ভিন্ন, আলাদা। দে আর সিমপ্লি নট টুগেদার। দুজনে চাকরি করে এমন স্বামী স্ত্রীও কি তাই নয়? না। তারা রাতে একসঙ্গে। শয্যার অর্থ শুধু দেহের সম্পর্ক নয়, সান্নিধ্য। বিবাহিত জীবনে স্বামী স্ত্রী যত রাত একসঙ্গে শোয় তার মধ্যে সঙ্গমে লিপ্ত হয় করাত?শয্যা হচ্ছে প্রতীক, একসঙ্গে বসবাসের, সম্পর্কের।
অমলের বরাবরের ধারণা ছিল বিয়ে, সংসারটংসার মেয়েদেরই একচেটিয়া। বিবাহবিচ্ছেদে তাদেরই গায়ে আঁচ লাগে। সবার কাছে তাই শোনে, গল্প উপন্যাসে সেরকম লেখা হয়, সিনেমা টিভিতে তো দেখে বটেই। ফলে সে ধরেই নিয়েছিল বিয়ের জন্য মৈত্রেয়ীর আগ্রহই বেশি হবে। তথাকথিত অবৈধ সম্পর্কের গ্লানি সামাজিক বদনাম ইত্যাদি থেকে নিষ্কৃতি পেতে সেই হবে অগ্রণী। কার্যত দেখা গেল মৈত্রেয়ী আর বিয়েটিয়ে নিয়ে তেমন চিন্তাভাবনাই করছে না। তার দিন কাটে রুদ্ধশ্বাসে, দৈনিক ব্রড স্ট্রিট-বজবজ যাতায়াত, একপাল বাচ্চার সার্বিক উন্নতির দায়িত্ব, বাড়ি ফিরে সংসারের নিত্য কর্মের সঙ্গে দুজন বয়স্ক ও একটি বাড়ন্ত শিশুর দেখাশোনা। তার কাছে অমলের সঙ্গে সপ্তাহান্তে দেখাটা অতি মূল্যবান অবসরযাপন। অক্সিজেনের বেলুন। শ্বাসরোধকারী ব্যস্ততায় একটু গা এলানো উপভোগ। সে দিন তার পরনে ভাল শাড়ি চুলে শ্যাম্পু। সপ্তাহের বাকি দিনগুলো কাজ স্কুল সংসার বাবা মা ছেলে। ছুটির দিনের নাম অমল। সেই থেকেই কি অমল-মৈত্রেয়ী সম্পর্কের স্থায়ী ছক তৈরি হয়ে গেল? তাই কী ছক পাল্টে অমলকে ওই সারা সপ্তাহ কাজের রুটিনে আনতে চাইল না? কে জানে।
এখন মনে হয় অমলকুমার দাসের জন্য মৈত্রেয়ী ও কল্যাণকুমার চক্রবর্তীর সুখের সংসার ভেঙেছে, আদম ইভ-এর নিষ্পাপ সততসুখী বাগিচায় সেই বিষধর সর্পরূপী ঘর ভাঙানো শয়তান—অমলের নিজের এবং আর পাঁচ জনের এই বদ্ধমূল ধারণাটি একেবারেই ঠিকনয়। মফঃস্বল শহরে একটি ছোট সংসারের চার দেওয়ালের বেষ্টনে মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর মধ্যে নিহিত অফুরন্ত কর্মশক্তি আঁটছিল না। অমলকুমার দাস সেই ফাঁকফোঁকড় যার মধ্যে দিয়ে তা প্রকাশের রাস্তা খুঁজে পেল। তার নিজস্ব সত্তা অর্জনের পথে অমল একটি অতি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাত্র। হ্যাঁ অমল বলছে না যে মৈত্রেয়ী ভেবেচিন্তে ইচ্ছে করে অমলকে ব্যবহার করেছে বা তাদের ঘনিষ্ঠতার উৎস ছিল কোনও রকম স্বার্থবোধ। কিন্তু শেষমেষ পরিবেশ ও ব্যক্তিমানুষের মধ্যে টানাপোড়েনে ব্যাপারটা সে রকমই দাঁড়িয়ে গেল।
—সে কি। হিরোয়িন আর হিরোরে ভালবাসে না। ছি ছি। ক্যান? অন্য কারো প্রামে পড়ল? হবেই। যে নিজের পতিরে ছাইড়া আপনারে ধরছিল সে পরে আপনারে ছাইড়া আর একজনকে ধরবে এ তো জানা কথা।
ছায়া বিচলিত। সে এখনও বাস করেরূপকথার জগতে। যেখানে শুধু দুটি রঙ, সাদাকালো ভালমন্দ। প্রধান চরিত্র তরুণ তরুণী। বিষয়বস্তু প্রেম। সমস্যা ভিলেনের আবির্ভাব, সমাধান ঢিসুম ঢিসুম। অতঃপর নায়ক নায়িকার মিলন এবং তাহারা সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিল। ব্যস কাহিনী সমাপ্ত। বায়োলজির একটি পর্যায়েইনারীপুরুষ সম্পর্ক স্থায়ী। পূর্বরাগ ও মিলন যার উদ্দেশ্য ও চরিত্র সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত। দুটি বিপরীত লিঙ্গ প্রাণীর জোড় বাঁধা। যে কারণে মানুষ কাঁচা সবজি মাংস মাছ খায় না; তেল মশলা সহযোগে আগুনে রান্নার পর গ্রহণ করে সেই কারণেই অর্থাৎ তথাকথিত মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনকে পিতৃতান্ত্রিক রোমান্সের মোড়কে দেখতে চায়। ভাল আদর্শবাদী বীর নায়ক, সুন্দরী দুর্ধর্ষ রকমের সতী নায়িকা। সবই রূপকথা যা বাস্তবে হয় না কিন্তু হলে কি ভালই না হত। এদিকে বাস্তবে ভালবাসা টক মিষ্টি ঝাল তেতো নোনতা—সব স্বাদের সমাহার। তাই কি অমল আর মৈত্রেয়ীর সম্পর্কে আকর্ষণ বিকর্ষণের বিচিত্র লীলা?
