আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
–কী পড়ছ অত?
–না, ঠিক পড়ছি না। অন্য একটা জিনিস দেখছি। ছবি। দেখবে?
ফার্স্ট বয় বলে কথা। এত ভদ্রতা হঠাৎ। আমি মুখ বাড়ালাম,
–দেখি।
একটা পুরনো মতন ছবি। কাস্তে হাতে ভীষণ দর্শন পুরুষ। অনিরুদ্ধ আমাকে বোঝালো।
–কাস্তেটা একটা রূপক। সারা বছর ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসল যেই পেকে যায় অমনি চাষীর কাস্তের আঘাতে ঘচাঘচ কাটা পড়ে। ঠিক তেমনই জীবনভর আমরা যা কিছু কৰ্ষণ করি, প্রেমভালবাসা কর্মকীর্তি সব কিছুর শেষ সময়ের কোপে।
ছবিটির তলায় খুদে খুদে অক্ষরে লেখা অ্যান্ড নাথিং স্টান্ড বাট ফর হিজ স্কাইদ টু মো, তার কান্তের ফলায় কিছুই বাদ যায় না। অনিরুদ্ধ আবার বিদ্যে ফলিয়ে ব্যাখ্যা করেছিল–আইডিয়াটা শুধু পশ্চিমের নয়, ইউনিভার্সাল বুঝলে। আমাদের দেশেও আছে। সেই প্রাচীনকাল থেকে। কাল হরতি সর্বম্।
কেন কে জানে ছবিটা আমার মনে গেঁথে আছে। চারিদিকে যখন লাল ঝাণ্ডায় কাস্তে দেখতাম তখন আমার কখনও মনে হত না ওটা শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞান। এখনও হয় না। বরং মনে হয় ওটা হচ্ছে সময়ের সর্বময় কর্তৃত্ব ঘোষণার প্রতীক—যে কর্তৃত্ব থেকে সাম্যবাদেরও নিষ্কৃতি নেই।
—কী ভাবতাসেন? ঘটনাটা কী হইল বলেন। অসহিষ্ণু ছায়া। বাঙালরা কি এমনই মাথামোটা। একটু চিন্তা ভাবনা করে না।
—তোমার তো ওই এক কথা। ঘটনা আর ঘটনা। আরে ঘটনার মাহাত্ম কী? অলৌকিক চমৎকার কিছু ঘটে না কি মানুষের জীবনে? সবই তো জানা কথা। সাধারণ হাসিকান্না। হাবু-গাবু-খেদি-পেঁচির ব্যাপার।
—তা আমি কি অসাধারণ কিছু চাই নাকি? কইলকাতায় আইস্যা হিরো হিরোয়িনের জীবনটা কী হইল সেইটা বলবেন তো।
কলকাতায় কমাস যেতে না যেতে অমল দেখল বিবাহবন্ধনে বন্দিনী মৈত্রেয়ীর যতটা সান্নিধ্য সে পরপুরুষ হিসেবে লুকিয়ে চুরিয়ে ভোগ করত এখন স্বামীত্যাগিনী স্বাধীন মৈত্রেয়ীর সঙ্গে আদানপ্রদান তার চেয়ে অনেক কম। বিবাহিতা মৈত্রেয়ী সুদূর মফঃস্বল শহরে ছিল ছোট্ট নিউক্লিয়ার সংসারের গৃহবধূ মাত্র। হাতে অঢেল সময়, বাড়ির বাইরে কাজের সুযোগ সীমিত, সামাজিক চাহিদা মেটানোর দায় নেই বললেই চলে। কলকাতায় পিতৃগৃহে ফিরে এসে তার প্রথম কাজ চাকরি নেওয়া। বাবার পরিচয় সূত্রে একটি নামী কোম্পানি পরিচালিত নার্সারি স্কুলে। স্কুলটি বজবজে। কোম্পানির কারখানায় নিযুক্ত স্টাফেদের ছেলেমেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট। বন্ডেল রোড থেকে রোজ বজবজ যাতায়াত। অবশিষ্ট সময়টুকুতে ছেলে মানুষ ও বাবা মার মন যোগানোতে ব্যয়। তাদের জীবনসায়াহ্নে মেয়ের স্বামী ত্যাগে মনোকষ্ট ও অসন্তোষকে সামাল দিতে অনেক পিআতৃভক্তি প্রদর্শন প্রয়োজন। তাছাড়া তারা যেমন নাতিটির বিনে মাইনের সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য চব্বিশ ঘণ্টার বেবিসিটার তেমনই মৈত্রেয়ী তাদের বাইরের কাজে অপরিহার্য বিকল্প পুত্র। অর্থাৎকলকাতায় বাপের বাড়িতে স্বামীত্যাগিনী মৈত্রেয়ীর প্রতি সংসারের দাবি তার স্বামী সন্তানসহ বিবাহিত জীবনের চেয়ে ঢের ঢের বেশি। বিশেষ করে তার একমাত্র ভাই যখন বম্বেতে চাকরি করে। অতএব, এখন অমলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ শুধু সপ্তাহ অন্তে। সাধারণত একটি সন্ধ্যায়, হোটেল রেস্তোরাঁয়। শীতকালে একটু বেশিক্ষণ। মাঝে মাঝে সারাদিনের প্রোগ্রাম। যে সময়টুকুরও বেশ খানিকটা অংশ যায় কার বাড়িতে কে কী বলল আলোচনায়। কারণ দুটি পরিবারেই এখন প্রবল ও সোচ্চার বিরোধিতা জারি। মৈত্রেয়ীর বাবা মার দুশ্চিন্তার মূলে আপাতদৃষ্টিতে নাতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং তার আড়ালে নিজেদের আশু বার্ধক্যের সহায়হীনতা। জাতের প্রশ্নটাও কি ছিল না? ছিল না আমাদের দেশে নারীপুরুষের সম্পর্কে বয়সের সাবেকি বড় ছোট হিসেব? পুরুষকে যে বয়সে বড় হতেই হয়। তাই অমলের বাড়িতে প্রথম দিকে দেওর বৌদি গোছের আশনাই অল্প বয়সের ঝোঁকইত্যাদি আখ্যায় সম্পর্কটা মুখে অবহেলিত হত কারণ আশা ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং বা উপযুক্ত পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে হলে আপনিই এ রোগ সেরে যাবে। যখন দেখা গেল উপযুক্ত পাত্রীতে অমলের মন নেই এবং ঝোঁকটা অল্পবয়স পেরিয়ে চালু আছে তখন সকলে উঠে বসল। ঠেস দিয়ে কথা বিদ্রূপ শ্লেষ ইত্যাদি অমোঘ পারিবারিক অস্ত্রপ্রয়োগ শুরু। বাপের মুখে প্রায়ই মায়ের উদ্দেশ্যে কিন্তু সবাইকে শুনিয়ে উঁচু গলায় মন্তব্য তোমার ছোট ছেলে তো সবৎসা গাভী ঘরে এনে পিতৃমাতৃ দুই কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে, শুনে শুনে একদিন অমল বলে ফেলে,
-ক্ষতি কী। গাইবাছুর তো আপনার কংগ্রেসেরই প্রতীক ছিল। কতদিন ইলেকশানে নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। এখন নয় পরিবারে দেখবেন। হরিচরণ দাস বি.এ.বি.এল সমুচিত জবাব দেন।
—আমার সে দিন থাকলে তোমাকে জুতোপেটা করে বাড়ি থেকে বের করে দিতাম। বংশের কুলাঙ্গার কোথাকার। পরস্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারে লজ্জা পর্যন্ত নেই। একেবারে ছোটলোক হয়ে গেছে।
-সে দিন ম্যানে কী সেই ইউনিয়ন জ্যাক ওড়ানো সময় না আপনার তেরঙা স্বদেশি আমল,না কি সেই একেবারে খাঁটি সত্যযুগ যখন ঠাকুরদার বাপঠাকুরদারা লাঙ্গল ঠেলতেন তখনকার কথা বলছেন? অমল আজ মরিয়া।
হরিচরণ দাস বি. এ. বি. এল পা থেকে চটি খোলেন, তবে মারতে পারেন না। অমলের মা মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সে দিন থেকে বহুকাল বাপের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ। দাদারা গম্ভীর। বাড়িতে বাক্যালাপ শুধু মা বউদি ও বেড়াতে আসা বিবাহিতা দিদির সঙ্গে। পুরুষদের জেদ না রক্ষণশীলতা কোনটা বেশি বলা শক্ত।
