কী পরিচয় অমল দিয়েছিল মৈত্রেয়ীর? সাধারণত বাইরের লোকের কাছে প্রথম সাক্ষাতে যা বলে থাকে অর্থাৎ আমার বোন? হবেও বা। আজ আর সে কথা মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে তার চার বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠক্রমের সমান্তরাল গতিতে ক্রমবর্ধমান তার সঙ্গে মৈত্রেয়ীর ঘনিষ্ঠতা। এবং শেষ পরিণতি চক্রবর্তী বনাম চক্রবর্তী মামলা ও বিবাহ বিচ্ছেদ। যথেষ্ট ঢাকঢোক পেটানো পরিণাম।
.
কীসের পরিণাম কী আমার সন্দেহ হয়। এই ধন্দের কথা কাকেই বা বলি। সত্যি কি মৈত্রেয়ী আমার প্রেমে এমনই হাবুডুবু ছিল যে পতিপুত্ৰ সংসার তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল? নরনারীর সম্পর্কে বিশেষ করে বিবাহবহির্ভূত তথাকথিত ব্যভিচারে দেহাশ্রিত দিকটাই প্রধান। এ একটা মজার ব্যাপার। কুমারী মেয়ের সঙ্গে প্রেমে দেহের ভূমিকা অস্পষ্ট। সে প্রেম নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায় বিশ্বাস করা অসম্ভব নয়। কিন্তু পরস্ত্রীকে ভালবাসা মানেই চোখের সামনে একটি শয্যা। আরও মজা হল এইখানেই আমার ও মৈত্রেয়ীর মধ্যে বরাবরের ফাঁক, কোথায় যেন শীতল ঔদাসীন্য, নাকি কামনার অভাব। গোড়ার দিকে মনে হয়েছে হাজার বছরের হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক মগজ ধোলাই। পতিকেন্দ্রিক সতীত্ব শিক্ষার ফল। মৈত্রেয়ী যখন আর ডাঃ কল্যাণ কুমার চক্রবর্তীর আইনত স্ত্রী থাকবে
তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেদিন জীবনে তেমন করে এল কি।
না। ছায়াকে এসব বলা যায় না।
কী ভাবতাসেন? চুপ মাইরা গ্যালেন যে? আপনাদের বিয়াসাদি হইল তো?
—না। আমাদের বিয়ে হয়নি।
—ক্যান? তালাক, থুরি, ডাইভোর্স তো হইসিল। তা হইলে আর বাধা কোথায়?
সত্যি কথা বলতে কি বাধাটা যে ঠিক কোথায় কিসে তা আমি কোনওদিনও বুঝতে পারলাম না। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কবছর যেন সময়ের হিসেব থেকে বাইরে। বাবা মা আত্মীয় পরিজন অনেক দূরে। তারা আমার অতীত। প্রায় বিস্মৃত। আবার পড়া শেষ করে চাকরিবাকরি সংসারের যে অবশ্যম্ভাবী পাঁচাপাচি জীবন তাও তখন অতটা বাস্তব হয়ে ওঠেনি। অতীত ও ভবিষ্যৎ দুই-ই যেন বহুদূর আবছা। সত্য শুধু বর্তমান, মৈত্রেয়ী ও আমি। একটা ছোট্ট জগৎ। সবকিছুর বাইরে। এমন কি মৈত্রেয়ীর দুবছরের যে বাচ্চাটা পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করত, ঠিকে ঝি যে মাঝে মাঝে বেটাইমে হাজির হয়ে আমাকে আড়চোখে দেখত, সকলেই কেমন যেন থেকেও নেই। ডাঃ কল্যাণ কুমার চক্রবর্তীর দৈনিক অনুপস্থিতির মাপে আমার সব কাজকর্ম। এমন কি ক্লাস করা পর্যন্ত। বলাবাহুল্য কলেজের ছেলেদের কাছে আমার গতিবিধি অজানা ছিল না। তবে তাদের সকলেরই মনপ্রাণ অন্যত্র। মহানগরীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা মফঃস্বলে সদর্পে বিজয়ের পথে। লক্ষ্য শ্রেণীশত্রু বা কুমারী হৃদয়। শুধু মুষ্টিমেয় হাতেগোনা অনিরুদ্ধরা পড়া আর তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত। আমার প্রতি সকলেরই অনুকম্পামিশ্রিত তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি….ম্যাদামারা অমলটা সেকেন্ড হ্যান্ড মালের সঙ্গে ফেঁসে গেছে। মজার ব্যাপার হল আমার আচরণের নৈতিকতার প্রশ্ন কেউ তোলেনি। হয়তো তারা অনেকে বিবাহ নামে প্রতিষ্ঠানটির বিরোধী। হয়ত আমার পড়াশুনাটা যাদবপুর শিবপুর খড়গপুরের মতো কলকাতার কাছাকাছিপরিচিত গণ্ডির মধ্যে হলে সমাজের অনুশাসন বা উচিত অনুচিতের প্রশ্নটা এমন অনুচ্চারিত থাকত না। আমাদের ন্যায় অন্যায় বোধটা কি এতই আপেক্ষিক, পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের গড়া অলিখিত কিন্তু অবশ্য পালনীয় লক্ষণরেখা? যা অজানা পরিবেশে অচেনা মানুষের সঙ্গে আদানপ্রদানে অনায়াসে অলীক হয়ে উঠতে পারে? প্রবাস আমাদের সব পেয়েছির দেশ যেখানে সব বন্ধন থেকে মুক্তি। তাই সকলের মধ্যে যেন এসে গিয়েছিল এক বাঁধনছাড়া ভাব। কেউ সমাজকে কলা দেখাল, কেউ বা সিস্টেম বা রাষ্ট্রকে।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে কলকাতায় ফিরলাম। প্রথম চাকরি টিটাগড়ে তারপর থেকে কেমন সব গোলমাল পাকিয়ে গেল। মৈত্রেয়ীর ডিভোর্সের ঝামেলা বিচ্ছেদের আইনসঙ্গত কারণ ঠিক কী দেখানো হবে তা ঠিক করতে আমাদের সমাজের আধুনিক মধ্যযুগীয় গোঁজামিল। পরপুরুষের সঙ্গে প্রেম (আইনত একত্রে শয়ন, নিকষিত হেম টাইপ নয়) একটা গ্রাহ্য অভিযোগ। প্রমাণ করতে পারলে বিচ্ছেদের সঙ্গে স্বামীর খোরপোশ দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি। কিন্তু ভদ্রলোকের মানে লাগে। তার চেয়ে বড় কথা সাক্ষীসাবুদ জোগাড় প্রায় অসম্ভব। অতএব, পারস্পরিক মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতা অভিযোগ সাব্যস্ত হল। তবু বিয়েতে পাওয়া জিনিসপত্র কোনটা কার ও কেন, ছেলের হেফাজৎ কে পাবে ইত্যাদি জরুরি প্রশ্নে আধুনিক বাঙালি রীতি অনুযায়ী প্রচুর তর্কবিতর্ক উত্তেজনা অশান্তি। সৌভাগ্যক্রমে ডাঃ কল্যাণ কুমার চক্রবর্তীর মতো প্রফেশনালি কোয়ালিফায়েড এবং উন্নতিতে তৎপর পাত্রের সুপাত্রী সুলভ হওয়ায় তিক্ততার তীব্রতা হ্রাস পেতে খুব একটা দেরি হল না। বছর তিনেকের মধ্যে পুরোপুরি শান্তি ঘোষণা মধ্যবিত্ত বাঙালি মানদণ্ডে খুবই তাড়াতাড়ি।
এমন কিছু বেশি নয় তিন বছর সময়। একটা মানুষের জীবনে কতটুকুই বা। কিন্তু সময়ের মাপ বড় অদ্ভুত। কেমন যেন মনে হয় আগে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়টা দীর্ঘ চার বছর নয়। কদিন মাত্র এবং আমাদের অনুরাগ পর্বটি নেহাতই সংক্ষিপ্ত। আর এই তিন বছর যেন একটা যুগ। সময়ের কোনও মাথামুণ্ডু নেই। তবে ক্ষমতা ভয়ঙ্কর। একেবারে যথেচ্ছাচারী। সেই হিটলার-মুসোলিনি-স্টালিন। যুক্তির ধার ধারেনা। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আমাদের ইয়ারের বেস্টবয় আমার রুমমেট অনিরুদ্ধ সেনের ছিল সাহিত্য-আর্ট-ফার্ট বাই, অন্যদের মতো অত বিপ্লব করত না। একবার কি দয়া হল। আমি পাশে বসেছিলাম লাইব্রেরিতে, ওর হাতে একটা মোটা রেফারেন্সের বই।
