এরকম বাংলা টিভি সিরিয়ালের মতো ডায়লগ অমল কস্মিনকালেও দিতে পারে না। এটা তার নিছক স্বগতোক্তি। তবে তার জীবনে শ্রেণী আরোহণের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে জোরদার ভূমিকা যে মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর তা সে ভালভাবে জানে। না জেনে উপায় কি। কলেজের ছাত্র অমলকুমার দাস আর স্থানীয় সরকারি ডাক্তারের স্ত্রী মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর, দেখাসাক্ষাতের ভিত্তিভূমি শুধু উদরতৃপ্তিতে নয়। উচ্চকোটি জীবনযাত্রার প্রশিক্ষণ। বাবার আর্মি লাইফে দেখা বিলিতি আদবকায়দা ঘরগৃহস্থালির অভিজ্ঞতা মৈত্রেয়ী তার ডাক্তার স্বামীর ওপর বিশেষ ফলাতে পারেনি। বরিশালের বাঙাল। বুদ্ধিশুদ্ধি বাঙালের মতো অতি সরল দ্বিমাত্রিক। বেশি যোগ্যতা অর্জন করলে পরিশ্রমী হলে জীবনে উন্নতি, ব্যস। নিঃসঙ্গ অবসরে অমলকে হাতের কাছে পেয়ে মৈত্রেয়ী লেগে যায় তাকে ফ্যাশান দূরস্ত করে তুলতে। টেবিলে সভ্যভাবে খাওয়া কাটা-চামচন্যাপকিন ব্যবহার, মশলাছাড়া রান্না পদের উপযুক্ত তারিফ থেকে সুরু করে প্লিজ-থ্যাংক ইউ-গুডমর্নিং গুডনাইট ইত্যাদির প্রয়োগ। সর্বোপরি চলনসই বাংলা ও ইংরিজি বলা। না, ব্যাকরণ ঠিক করা মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীর ক্ষমতায় কুলোয়নি কিন্তু উচ্চারণটা পদের করে ফেলেছে। তাই তো যখন বছর পনেরো বাদে পার্কস্ট্রিটে এক সন্ধ্যেয় শীতাংশু র সঙ্গে দেখা, হা সেই শীতাংশু যে বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা বিলোপে জীবন যৌবন ধনমান উৎসর্গ করেছিল—তখন প্রাক্তন বিপ্লবীকে বিস্মিত করেছিল বুর্জোয়া অমলের চাকরিতে সাফল্য নয়, তার ইংরিজি বাংলা কথা বলায় উন্নতি।
মনেপড়ে। পিটার ক্যাট-এর দোতলা থেকে নামছে অমল ও মৈত্রেয়ী। দেখে একতলায় সামনের দুজনের ছোট টেবিল থেকে বিল চুকিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে এক ভদ্রলোক সঙ্গে ফর্সা সুসজ্জিতা এক আধুনিকা। কেমন চেনাচেনা মুখ। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে দুজনে। তারপর প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠে,
–শীতাংশু।
–অমল।
–হোয়াট আ সারপ্রাইজ।
—তুই এখানে!
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে। কতদিন বাদে দেখা কী করছিলি এতদিন, বাকিরা কে কোথায় জানিস—ইত্যাদি। রেস্তেরাঁয় খদ্দের ওয়েটারের যাতায়াতের পথ আগলে এত কথা হয় না। অতএব, সবাই বেরিয়ে এসে ফুটপাতে দাঁড়ায়। সমাজে সাম্য আনার বৈপ্লবিক প্রয়াসে শীতাংশুর প্রচুর কর্মশক্তি, প্রথম যৌবনের স্বাস্থ্য ও কয়েকবছর সময় নষ্ট হয়ে যাবার পর বাবাকাকা জ্যাঠা-পিসে-মেসোদের সম্মিলিত চাপ তাকে চালান করে দেয় বিবাহিত বড় দিদির সংসার সুদুর ব্যাঙ্গালোরে। সেখানে প্রথমে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা তারপর দক্ষিণের এক নতুন অজ্ঞাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রিলাভ করে কলকাতায় ফেরা। এ ধরনের ব্যাখ্যাহীন সময়ের ফাঁকওয়ালা বায়োটা থাকলে একজিকিউটিভ পোস্ট তো পাওয়া যায় না। কাজেই অগতির গতি স্কুলে পড়ানো। সুসজ্জিতা আধুনিকা উসখুস করছিলেন। এবারে স্বামীর বিনীত বিবরণে বাধা দিয়ে সগর্বে জানালেন শীতাংশু কলকাতার সবচেয়ে নামীদামি বনেদী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। তাও আবার সায়েন্স সাবজেক্টস এবং উঁচু ক্লাসে।
—ক্যালকাটার বেস্ট ফ্যামিলির ছেলেরা পড়ে ওর স্কুলে। জানেন এভরিইয়ার কত স্টুডেন্টস্ ওদের স্কুল থেকেই সোজা ইউ এস এ এতে চলে যায়? আর ওইতো কোচিং দেয় সবাইকে।
—তুই কোচিংও খুলেছিস না কি?
—না..মানে… ঠিক সেভাবে নয়। স্টুডেন্টরা ডিমান্ড করলে একটু গাইডেন্স তো দিতেই হয়।
—কোথায় করিস কোচিং? বাড়িতে?
-না, স্কুলেই। সাহেবি স্কুল তো, সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হয়ে দেড়টার মধ্যে ছুটি। তারপর ক্লাসরুমগুলো সব খালি। ওখানেই সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে বসি।
-–ম্যানেজমেন্ট আপত্তি করে না।
–পাগল!স্টুডেন্টরা নিজেদের খরচে এক্সট্রো পড়ে ভাল রেজাল্ট করলে ম্যানেজমেন্ট তো খুশি থাকে রে। তাদের তো লাগছে এক দেড় ঘণ্টার বাড়তি ইলেকট্রিক খরচ। ওটা আমরা অ্যাডজাস্ট করার ব্যবস্থা করি।
–তুই কি সব সায়ান্স সাবজেক্ট পড়াস না কি?
স্ত্রী সোৎসাহে জবাব দেন,
—ওতো পড়ায় মেইনলি ম্যাথ। তবে কোচিং-এ অন্য সাবজেক্টসও দেখে, ফিজিক্স, কেমিস্ট্র। জানেন আপনার বন্ধুর খুবনাম কোচিং-এ? ওতো শুধু স্কুলের বা বোর্ডের পরীক্ষায় জন্য পড়ায় না, জয়েন্ট এন্ট্রান্স, স্যাট, মানে ইউ এস এ-তে কলেজে পড়তে হলে যে স্কলাস্টিক অ্যাপ্টিচিউটি টেস্ট দিতে হয় তারও প্রিপারেশন করায়।
– তোর তো তাহলে হেভি ইনকাম রে। আমাদের সবাইকে টেক্কা মারছিস। তারপর ফ্যামিলির খবর কী? ছেলেমেয়ে?
—একটি ছেলে, সবে চার বছর। এখন পাড়ার হ্যাপি আওয়ার নার্সারিতে যায়। পরে আমার স্কুলে শিক্ট করবো।
—কোথায় থাকিস?
স্ত্রীর উত্তর-ভদ্রমহিলা চুপ করে থাকতে পারেন না।
–এখনও সেই কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের পুরনো বাড়িতেই আছি। তবে ফ্ল্যাট বুক করা হয়ে গেছে। ঠোঁট ফুলিয়ে যোগ করেন,
—তেমন ভাল লোকালিটিতে হল না, সন্তোষপুর। তবে সাউথ ওপেন। স মোজাইক, দুটো ডবলিউসি ওয়ালা বাথরুম আর কিচেনে বলেছে টাইলস লাগিয়ে দেবে। এই তো মাস ছয়েকের মধ্যেই পজেশান পেয়ে যাব।
এবারে শীতাংশু অমলকে প্রশ্ন করে,
—আমার কথা তো অনেক হল। এখন তোর খবর কী বল। একেবারে পাল্টে গেছিস তো। কলেজে প্রথম কথাবার্তায় চালচলনে একেবারে কলকাত্তাই ছিলি। জানিস তোকে নিয়ে আড়ালে কত হাসাহাসি করতাম সামবাজারের সসিবাবু এয়েছেন হা হা হা। এখন তো দিব্যি পরিষ্কার বুলি ফুটেছে। এত বদলে গেলি কী করে? বিয়ে থা করেছিস? (অপাঙ্গে মৈত্রেয়ীর দিকে দৃষ্টিপাত)।
