দেখতে দেখতে সব পাল্টাতে লাগল। অমল আর করলা নদীর ধারে যায় না। তার মনপ্রাণ মৈত্রেয়ী আর পরীক্ষার পড়ায়। শীতাংশুর সঙ্গে তেমন আর আজ্ঞা হয় না। খেয়ালই করে নি তার নিজের ঘরের বাসিন্দা কেমন বিগড়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন ক্লাস কামাই, দিনভর বাইরে বাইরে টো টো। বেশিরাতে কাণ্ডকেত্তন করে হস্টেলে ফেরা। জামাকাপড়ের যত্ন নেই, নাওয়াখাওয়া অনিয়মিত, রুক্ষ চুল। অমলকে যেন এড়িয়ে এড়িয়ে যায়। শেষে একদিন তাকে অমল প্রায় পাকড়াও করে,
—হ্যাঁরে শীতাংশু তোর ব্যাপারটা কী বলতো? কোথায় থাকিস সারাদিন? ক্লাসে আসিস না কেন?
-এডুকেশন মে ওয়েট বাট রেভেলিউশাল ক্যান নট। সবচেয়ে আগে চাই বিপ্লব, পড়াশুনা পরে হবে।
-সে কি। পরীক্ষা দিবি না।
-কী হবে পরীক্ষা দিয়ে? বিই ডিগ্রি লাভ, এই তো? একটা ভাল চাকরি, ফর্সাসুন্দরী কনভেন্ট শিক্ষিতা গ্র্যাজুয়েট বঙ্গললনার সঙ্গে বিয়ে। একটিদুটি বাচ্চা সাজানো ফ্ল্যাট। ব্যস হয়ে গেল লাইফটা। এর জন্য পরীক্ষা দেব।
-কেন ক্ষতি কী?
—কী যে বলিস। বাস্তব থেকে পালিয়ে আমাদের চোখের সামনে চারিদিকে যে অন্যায়, যে শোষণ চলছে তার থেকে গা বাঁচিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া। সেটাই তো তোদের এই শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য। সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি অস্বীকার করে একটা ছোট সংসারে পালিয়ে থাকা। তোদের কি কোনও পলিটিক্যাল কনশাসনেস বলে কিছু নেই? আমি তোদের মতো নই। শুধু নিজেকে নিয়ে থাকা আমার আইডিয়েল নয়।
ভয়ানক বিরক্ত লাগে অমলের। জন্ম থেকে বাড়িতে দেখেছে মা যখনই কোনও পারিবারিক সাংসারিক সমস্যার কথা তুললে বাবা ঠিক এমনই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলতেন, আমি তোমাদের মতো শুধু স্ত্রীপুত্র পরিবার নিয়ে বাঁচি না আমাকে দেশের কথা ভাবতে হয়। ওসব আলু পটলের হিসেব আমার কাছে দিতে এস না। ছেলেপুলের হ্যাপা তো বরাবর মায়েরাই পোহায়। আমার কাছে ঘ্যানঘ্যান কর কেন।
তার অর্ধশিক্ষিত খবরেরকাগজ না পড়া মা শরণ নিতেন ভাসুরদের। সংসারের হাল বরাবর রয়ে গেল বড় জ্যাঠামশাইয়ের হাতে। মেজো জ্যাঠা দেখলেন অমলদের পাঁচভাইবোনের পড়াশুনা। প্রায়ই তার মনে হয়েছে বাবা তার একজন নয় তিনজন।
তেমনই শীতাংশু যেন একা নয় অনেকে। আস্তে আস্তে দিনে দিনে কলেজ ছেয়ে গেল শীতাংশুরা। তবু বছরান্তে আরেকবার শীতাংশুকে ধরে, হাজার হোক রুমমেট বলে কথা। একটা দায়িত্ব তো আছে।
—কী রে শীতাংশু, তুই কি সত্যিসত্যি পরীক্ষা দিবি না কি?
–না।
—দুর, পাগলামি করছিস কেন?
–তোকে তো আমি বলেইছি। আমি, মানে আমরা এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে।
–কোন্ সিস্টেম?
-ন্যাকা সাজছিস। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টারে ছয়লাপ। অন্ধও দেখতে পায়। তুই পাসনা? সাম্য মানুষের জন্মগত অধিকারশোষক আর শোষিত দুটি শ্রেণী দুনিয়ার মজদুর এক শ্রেণী শত্রুকে খতম কর। গেটের পাশে ডানদিকে পুরো দেওয়াল জুড়ে আলকাতায় লেখাটা দেখিস নি? বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা নিপাত যাক। ওটা আমার হাতের লেখা। আর তুই কি না জিজ্ঞাসা করছিস আমি পরীক্ষা দেব কি না।
–পরীক্ষা দিবি না, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস নেই তা হলে কলেজে আদৌ ভর্তি হলি কেন? মাসের পর মাস বছরের পর বছর কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে আছিস কেন? বাপের পয়সা শ্রাদ্ধ করে বিপ্লব। লজ্জা করে না?
—না করে না। এই বাপই তো এক নম্বরের শ্রেণী শত্রু। তুই জানিস না হাউ মাচ আই হেট মাই ফ্যামিলি। জেনারেশান আফটার জেনারেশান বিধবা আর নাবালকদের সম্পত্তি মেরে বড়লোক। ব্রিটিশ আমলে খুব রাজভক্ত ছিল ফ্যামিলির সবাই। কে একটা যেন রায়বাহাদুর খেতাবও পুরস্কার পেয়েছিল। এরা হচ্ছে কোলাবরেটার সুবিধাভোগী ক্লাস। আর সেই সুবিধার ফায়দা উঠিয়েছে নিজেদের দেশের লোককে এক্সপ্লয়েট করে। না, এই ফ্যামিলির কিছু টাকা নষ্ট করছি বলে আমার কোনও অপরাধবোধ নেই। নো নো, আই ডোন্ট ফিল গিল্টি, নট অ্যাট অল।
—আসলে পড়াশোনা শিকেয় তুলে খালি গুলতানি করে বেড়িয়েছিস। পড়বার লিখবার ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে গেজিয়ে গেছিস। এখন নিজেকে জাস্টিফাই করার
জন্য বাতেল্লা দিচ্ছিস বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা নিপাত যাক। আঙুরফল টক।
—মুখ সামলে কথা বল অমল।
-কেন? আমি পরীক্ষা দিচ্ছি বলে তোদের কাছে নিচু হব? যা যা জানা আছে তোদের মতো দুধেভাতে বিপ্লবীদের।
-তুই শালা একটা আস্ত বুর্জোয়া। আই হেট ইউ হেট ইউ… ভাল ছাত্র অনিরুদ্ধ না এসে পড়লে হয়তো অমল আরশীতাংশুর হাতাহাতিইহয়ে যেত। তারপর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাড়া পর্যন্ত তাদের মধ্যে আর কথাবার্তা হয়নি।
অথচ অনেক কথাই অমলের বলার ছিল। সেদিন শীতাংশু অত গরম না দেখালে অমল তাকে বলত, দেখ শীতাংশু তোরা সব উচ্চবর্ণ হিন্দু, হাজার বছর সমাজের মাথায় রয়েছিল। হিন্দু আমলে যে মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা ছিল সুলতানি জমানায় সেসব বেড়েছে বই কমেনি। বরাবর দেশের চালু শিক্ষাব্যবস্থার, সুবিধা পেয়েছিস। যুক্তাক্ষর ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারিস। তোদের জিভে শ আর স, হ তার অ দিব্যি আলাদা থাকে। আধুনিক ইংরিজি শিক্ষায় তোদের মেধা আরও পালিশ হয়েছে। ভাল উকিল ডাক্তার তো বটেই জ্ঞানীগুণীও তোদের মধ্যে অনেক। সে শ্রেণীর একজন হয়ে প্রলেতারিয়েট-সর্বহারা শোষিত নিপীড়িতদের দরদ দেখানো তোর পোষায়। তুই যদি ইঞ্জিনিয়ার না-ও হোস তৃতীয় বিশ্বের তৃতীয় শ্রেণীর আর্থরাজনৈতিক কাঠামো তোকে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেবে না। যাদের জন্য তোর প্রাণ কাঁদে যাদের প্রতি তুই কমিটেড তুই কোনওদিন তাদের একজন হবি না কারণ তুই তাদের একজন হয়ে জন্মাসনি, তোর চোদ্দোপুরুষ তাদের একজন ছিলেন না। তুই বড়জোর তাদের নেতা হবি। বা তাদের নিয়ে লেখালেখি করে পুরস্কার পাবি। তোর জন্য তলায় হাজার বছরের সুরক্ষা, শক্ত মাটিতে পড়ে প্রাণ যাবার ভয় নেই। সার্কাসে ট্রাপিজ খেলা দেখেছিস, শীতাংশু? কেমন সুন্দর সাবলীল অপরূপ দেহ তরুণ তরুণী অনায়াসে চমৎকার ভয়ঙ্কর খেলা দেখায়? ক্লান্ত হলে ধপ করে পড়ে যায়-না, একদম নীচে পড়ে না। ওই ওপরে ট্রাপিজের দড়ি আর সেই তলায় কঠিন মাটি। মাঝখানে পাতা শক্তপোক্ত বিরাট জাল। সেখানে নিশ্চিন্তে ঝাঁপ খায় নিপুণ শিল্পীর দল। দর্শকেরহাততালির মধ্যে পরমুহূর্তে লাফিয়ে উঠে পড়ে। গায় আঁচড়টিও লাগে না। আর আমি? আমি যদি টেকনিক্যালি কোয়ালিফাইড না হই তা হলে আজকের পশ্চিমবাংলায় কনিষ্ঠ কেরানির কাজটিও আমার কপালে জুটবে না। হয়ে যাব নিম্নবিত্ত। আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন তোদের ওই মেহনতি জনতা। ঠাকুরদা ইংরিজির মই বেয়ে ভদ্রলোক শ্রেণীতে উঠলেন। বাবার ওকালতি রাজনীতি সবই কাজে লেগেছে ভদ্র মধ্যবিত্ত হয়ে থাকাটা মজবুত করতে। ওই এক জায়গায় থাকতে হলে আজ আমার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া চাই। শীতাংশু তুই ঠিক বলেছিস আমি বুর্জোয়া কারণ আমি বুর্জোয়াই হতে চাই। বুর্জোয়া থাকাই আমার জীবনের স্বপ্ন। কারণ প্রলেতারিয়েট থেকে বুর্জোয়া হওয়াতেই উন্নতি। হ্যাঁ, আমার কাম্য ডিগ্রি ভাল চাকরি-সংসার-ফ্ল্যাট।
