এর আগে আরেকটি মেয়ে দেবারতি, ইন্ডিয়ান অয়েলের সঞ্জয় গুপ্তর স্ত্রী ইউনিসেফের এজেন্সি চালাতে চেষ্টা করেছিল, হয়নি। ওড়িশার এক প্রাক্তন চিফ সেক্রেটারির স্ত্রী তাদের ডিভোর্সি কন্যার বকলমে ব্যবসাটিতে লেগেছেন। যেখানে কোনও ভূমিসূত বা ভূমিসূতাব দুপয়সা করার সম্ভাবনা, বিশেষ করে কোনও আইএএস, আইপিএস, আইআরএস, অর্থাৎ উচ্চপদস্থ আমলার স্ত্রী-পুত্রকন্যা-ভাইপো-ভাগ্নে, যদি কোনওরকমভাবে জড়িত, তাহলে সে ক্ষেত্রটিতে সর্বসাধারণের বিশেষ করে বহিরাগতের প্রবেশ নিষেধ। অমলকুমার দাস ব্যাঙ্কার মানুষ। টাকাপয়সা লেনদেন তার জীবিকা। উচিত অনুচিত এসব ভাববিলাসের ধার ধারেনা। বাস্তবকে মেনে চলে। সে বুঝে গেছে ওড়িশায় আইএএস মানে বাংলার রবীন্দ্রনাথ সত্যজিৎ-হেমন্ত-অমর্ত। হ্যান্ডস অফ। আউট অফ বাউন্ডস ফর দ্য রেস্ট অফ ইন্ডিয়া।
অতএব বলল-ওটা সুপর্ণা ঠিক জমবে না। এখানে কটাই বা অফিস। বরং অন্য কিছু ভাবো।
—আপনি কিছু বাতলান না।
—কেন, সব জিনিসে আমি কেন। এই এখানে এতগুলো নামকরা ফার্মের বাঘা বাঘা প্রতিনিধি বসে, তাদের জিজ্ঞাসা কর না। তোমার কর্তাটি কী বলেন?
-না, না দাদা, ওদের গা-ই নেই। আপনি একটু আমাদের জন্য ভাবুন প্লিজ। কয়েকটি নারীগলার কোরাস।
অগত্যা অমলকে ভাবতে হয়। তার একজন ওড়িয়া ক্লায়েন্ট যে নিজে কটকে এক মাড়োয়ারি বনস্পতি কোম্পানির বেনামী অংশীদার সে আবার ভুবনেশ্বরে নিজের স্ত্রীর নামে একটা প্রিন্টিং প্রেস কিনেছে। স্ত্রীটি বহরমপুর গঞ্জামের কুমুঠি বাড়ির মেয়ে। পুরুষানুক্রমিক ব্যবসায়ী বুদ্ধি, এখন তিনি স্মার্ট হচ্ছেন, উপরে উঠবেন। তারও ইচ্ছে, স্বামীরও সুবিধে। অতএব, নেমন্তন্ন কার্ড ছাপানোর বাঙালি ওড়িয়া যৌথ যোজনা প্রস্তুত হল। কিন্তু তেলেজলে মিশ খায় না। দুদিন যেতে না যেতেই গণ্ডগোল। মেয়েদের একসঙ্গে হওয়া মানে কে কত পড়াশোনা করেছে, ইংরিজি কেমন, জামাকাপড় মেকআপ, সংসার চালনার স্টাইল, সব এসে যায়। অতএব উড়েনী বঙালুনী পার্টনারশিপের ইতি। প্রায় হাতাহাতিতে দাঁড়াত যদি না এর মধ্যে সুপর্ণার স্বামী অধীর ইমফা ছেড়ে আরও বড় কোম্পানিতে আরও ভাল চাকরি নিয়ে আমেদাবাদ না চলে যেত। ওদের ফেয়ারওয়েলে যথারীতি কটকি রূপোর ফিলিগ্রি কাজের মেমেন্টো দেওয়া হল। এখানে বলে তারকোষিকাম। অমলই পছন্দ করে কিনল।
ইন্ডিয়ান অয়েলের সঞ্জয়-দেবারতির বেলায় ফেয়ারওয়েল দেওয়ার সময় পাওয়া যায়নি। ওরা এমন হঠাৎচলে গেল কেন জিজ্ঞাসা করেছিল অমল দুচারজনকে। একতার সেক্রেটারি সুজিত সকলের খবর রাখে। ও একমাত্র এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বাঙালি অর্থাৎ টেকনিক্যালি ক্যারা, যাকে একতা ক্লাবে নেওয়া হয়েছে। কারণ ও অতি চালু ছেলে। রাজ্যের কোথায় কী হচ্ছে ও কেন হচ্ছে সব খবর নখদর্পণে। একটি গেজেট বললেই হয়। কলকাতা থেকে গাংগুরামের ফ্রাঞ্চাইজ কিনে ওড়িশাতে বহু জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো গাংগুরামের দোকান গজিয়ে উঠেছে। তার একটি দোকানের মালিক। ব্যবসা রমরমা বাড়িটারি করে ফেলেছে। পুজোর সময় বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কুলুমানালি বেড়াতে যায়। অমল অবশ্য কখনও ওর দোকানের মিষ্টি খায় না। সর্বদা বলে সে নর্থ ক্যালকাটার ঘটি, মিষ্টির ব্যাপারে নো কমপ্রোমাইজ। ওখানে একজাতি একপ্রাণ একতা নেহি চলেগা। একবার পেট খারাপের সময় ওর দোকান থেকে দুশো দই এনে দিয়েছিল বীর সিংহ। তা একটু খেয়ে-যাক সে কথা। অমল সুজিতকে মুখের ওপরেই বলে–
–উড়েদের ঠকাচ্ছো। খালি মাঠে গোল। এরা তো মিষ্টিফিষ্টি কিছু বোঝে না। তাই করে খাচ্ছ। হত আমাদের শ্যামপুকুর কি হাতিবাগান বা গড়পার, তখন তোমার ঐ মিষ্টি শুধু মাছিতে খেত। এমন বেহায়া গায়েই মাখে না, একমুখ হেসে বলে,
—আরে দাদা, আপনার মতো এখানে সমজদার কে? যা দিই তাই বাপের জন্মে দেখেনি। আগে কী ছিল তো জানেন না। সমস্ত ওড়িশার মধ্যে মিষ্টির দোকান বলতে হাতে গোনা, কটকে ক্যালকাটা সুইটস ঢেনকানলে প্যারাডাইস নিমাপাড়ার ছানার জিলিপি আর কটক-ভুবনেশ্বরের রাস্তায় পাহালের রসগোল্লা।
পাহাল শুনেই অমল আঁৎকে ওঠে। প্রথম প্রথম ভুবনেশ্বরে এসে ভাল মিষ্টির খোঁজ করলে অফিসের স্টাফ গদগদ ভঙ্গিতে বলত,
—আইজ্ঞা, দিনে পাহালের রসগোল্লা টিকিএ খাইবে। বঢ়িয়া করুছন্তি। একবার কটকে যাওয়ার পথে গাড়ি থামিয়ে এক হাঁড়ি কিনে এনেছিল। বাব্বা, এক একটি গোল থান ইট। কোথায় তার যুঁইফুল সাদা স্পঞ্জের রসগোল্লা, মুখে দিলে মিলিয়ে যায়। আর এর এক একখানা চিব্বোচ্ছে তো চিবোচ্ছে, চিবোচ্ছে তো চিবোচ্ছে। চেহারাখানিই বা কি। ম্যাটমেটে, রসটা নোংরা জলের মতো। হ্যাঁ, সাইজ একখানা বটে। প্রায় রাজভোগ। অমল ক্রমে বুঝতে পারে এখানে সকলের মনে বদ্ধমূল বিশ্বাস বিগ ইজ বিউটিফুল। জিনিস আকারে বড় আর ওজনে ভারী হলেই তার কদর।
এটা একবারে চাক্ষুষ উপলব্ধি হল কটকে বালিযাত্রার মেলায়। ফি বছর শীতে মহানদীর তীরে এ মেলা বসে। সেই কোন্ সুদূর অতীতে বণিকের দল সাগরপাড়ি দিত দেশবিদেশে তাদের বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে, তার স্মৃতিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে সুন্দর খেলনা সাইজের শোলার নৌকো ময়ুরপঙ্খী ভাসানো। ওড়িয়াদের মুখে শুনে অমলের খুব ভাল লেগেছিল। বাঃ বেশ কাব্যটাব্য করার মতো ব্যাপার তো। কটক-ভুবনেশ্বর দৈনিক যাতায়াত করা একটা কর্মচারীর দল প্রত্যেক অফিসেই থাকে। অমলের অফিসেও ছিল। তারা সাগ্রহে সাহেবকে নিয়ে গেল মেলা দেখাতে। তখন সন্ধে। মেলা আলোয় আলো। লোকের ভিড়। অন্য পাঁচটা মফঃস্বলের মেলার মতো। শুধু একটি বৈশিষ্ট্য। চারিদিকে খালি খাবার আর খাবার। সব খুব বড় বড় মাপের। কোথাও বিশাল থালার সাইজের পাঁপড় ভাজা হচ্ছে। একখানাতে ছেলে-পুলে-বাপ-মা সকলের খাওয়া হয়ে যেতে পারে। কোথাও বা ছোট লাউয়ের মতো রাজভোগ, মুক্তকেশী বেগুমের মতো পান্তুয়া। সঙ্গী কর্মচারীদের সর্নিবন্ধ অনুবোধ ঠেলতে না পেরে চাখতে হল। সর্বনাশ সব যে এক একটি বোমা। সুজি ময়দায় ঠাসা। অখাদ্য। তারপর থেকে অমল লক্ষ্য করেছে এখানে বেশিরভাগ লোকের কাছে স্বাদ গন্ধের আকর্ষণ কম। চোখে দেখা আকার আর হাতে ধরা ভারের মর্যাদা বেশি। কোয়ান্টিটি কোয়ালিটির বিচারটা গোলমেলে। পরিমাণই উৎকর্ষ। প্রথম বছর পুজোয় মৈত্রেয়ীর জন্য ওড়িশার বিখ্যাত তাঁতের শাড়ি কিনতে গিয়ে দেখে যত দামই দিক না কেন পাতলা মিহি জমির শাড়ি নেই। সবচেয়ে দামি শাড়িও প্রচণ্ড ভারী এবং বাংলা তাঁতের সস্তা আশি কাউন্টের সুতোর মতো মোটা। দোকানি সমানে পাখি পড়ার মতো বলে যায় কত খাপি জমি কত বছর টিকবে। মহাষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিতে পরেছিল মৈত্রেয়ী। ঘেমে নেয়ে ফিরে এসে বলে,
