এত মানুষের ভালমন্দে যে মাথা ঘামায়, সক্রিয়ভাবে কিছু করে, তাকে তা কোনও মতেই আত্মকেন্দ্রিক বা বাস্তবজ্ঞানশূন্য বলা যায় না। তাহলে মানসিক ভারসাম্যটা নষ্ট হল কেনও কী করে?
.
গ্রিভস কটন-এর সুশান্ত ঘোষের স্ত্রী সংযুক্তা আর ইন্ডিয়ান মেটাল অ্যান্ড ফেরো অ্যালোয়েজ-এর অধীর দত্তর স্ত্রী সুপর্ণার ক্ষেত্রে কিন্তু অমলের অসম প্রতিযোগিতার সূত্রটি খাটেনি। সংযুক্তা আর সুপর্ণা কেউ ভুবনেশ্বরে চাকরি চায়নি, চেয়েছে পড়াশুনা করতে। সংযুক্তা কলকাতার শহরতলিতে কী একটা নতুন কলেজে পড়ায়। বেশ কবছরের চাকরি। এদিকে সুশান্ত বদলি হয়ে এসেছে ভুবনেশ্বরে। অন্তত বছর তিনেক থাকতে হবে। এপারে কেকা ওপারে কুহু। প্রথম বছর সব ছুটিছাটা উইকএন্ড ভেকেশানে সংযুক্তা কমুট করেছে। আ টেল অফ টু সিটিজ। কলেজের শুভ্যানুধ্যয়ীরা পরামর্শ দিল কলিঙ্গ ইউনিভার্সিটিতে এমফিল করে ফেলুক, বছর খানেক অডি লিভ নিয়ে স্বামীর কাছে থেকেও যেতে পারবে। সুপর্ণা ভূগোলে ফার্স্টক্লাস,ভাবল এখানে পিএইচডির চেষ্টা করা যাক। দুজনকেবগলদাবা করে সরস্বতী বিহারে যার যার বিভাগে নিয়ে গেল অমল। হেড-এর সঙ্গে আলাপ করালো।
প্রচুর উৎসাহ সহযোগিতার আশ্বাস, সুন্দর নিখুঁত ব্যবহার, ভদ্রতার ত্রুটি নেই। দুজনে পরে নিজেরা এসে সব বুঝেটুঝে হেড-এর উপদেশ অনুসরণ করে দরখাস্ত দিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস থেকে অবিলম্বে কাগজ দুটি ফেরত। এমফিল-এ সীমিত সংখ্যক আসন। সবই নিজেদের রাজ্যের ছাত্রছাত্রী অধ্যাপকদের জন্য রাখা। সুপর্ণার দরখাস্ত নাকচ কারণ তার বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখানে স্বীকৃত নয়। অথচ অমলের পরিষ্কার মনে আছে এখানকার বিভাগীয় প্রধান গল্প করছিলেন কদিন আগে বর্ধমানের কোন্ অধ্যাপক পি এইচ ডি-র ভাইভা নিতে এসেছিলেন। থেকে থেকে অমলের কেমন সব গুলিয়ে যায়। ইংল্যান্ড আমেরিকায় নাকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কদর পায় না। ওখানে গবেষণা বা চাকরি করতে হলেওখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার ছাপ প্রয়োজন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ কি তেমনই একে অন্যের কাছে বিদেশ? হয়তো তাই।
বোধহয় অদ্ভুত লাগাই উচিত নয়। সেই কবে ছোটবেলায় বাবার চেম্বারে ঢুকে দেখত দরজার ওপরে দিদির হাতে ক্রসস্টিটে গেরুয়া-সাদা-সবুজে লতিয়ে লেখা এক জাতি এক প্রাণ একতা। স্কুলে গানের সঙ্গে ড্রিল, মাথার মধ্যেও ড্রিল হয়ে গেছে। ওটা এক বিশেষ সময়ে বিশেষ জনগোষ্ঠীর অনুভূতি। তার পিছনে ছিল বিশেষ কারণ, ইংরেজ বিতাড়ন। আজ সেই কারণ নেই, নেই সেই মানুষজন। সেই সময়টাই পাল্টে গেছে। কিন্তু আমরা বাঙালিরা টাইমমেশিনে আটকা পড়ে আছি।
পরের পার্টিতে অর্থাৎ একতা ক্লাবে কার্যকরী কমিটির সদস্যদের মাসিক জমায়েতে সেই কথাই উঠল। অমলই মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলল,
–দেখ তোমরা ওই পড়া-ফড়া ছাড় তো। অনেক তো পড়েছ, সব এম-এ-টেমে পাশ, আর কত পড়বে। অন্য কাজকর্ম কর, এই তো মঞ্জু আর সুজাতা—সুজাতা হোটেল কলিঙ্গ অশোকের অ্যাসিস্ট্যিান্ট ম্যানেজার বিভূতি পালের বউ-কেমন দুজনে দিব্যি কোচিং খুলে ফেলল। রোজ ছাত্রছাত্রী বাড়ছে। দেখ না দুচার বছরে কী হয়। একেবারে নিউ ভবানীপুর টিউটোরিয়াল হোম। সেখানে কই কিস্যু বাঙালি ওড়িয়া প্রবলেম নেই। ইংলিশ মিডিয়াম-এর মতো ইংরেজি পড়াও সঙ্গে ম্যাথমেটিক্স, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি যদি পার তো কথাই নেই। সবাই লুফে নিচ্ছে। আমাকেই দেখ না, বঙ্গালি বলে কখনও অসুবিধা হয়নি। নেভার, কত লোকে যা এক্সপেক্টেড তার চেয়ে বেশি করেছে। ইন্ডাস্ট্রিজ মিনিস্টারকেই দেখ। আমাকে রীতিমতো ভালবাসেন। একতা যখন শুরু হয়েছিল তখন ফিনান্সিয়াল কন্ডিশান কী ছিল মনে আছে? কোনওক্রমে টায়টায় চলা। আমাদের ফার্স্ট ব্রেক সেই কটকে ফাংশান। ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ম্যাজিসিয়ান এ সি সরকারকে আনা। উনি কি দারুণভাবে হেল্প করেছিলেন। ওঁর সাহায্য ছাড়া একতা আজকে এই জায়গায় পৌঁছতে পারত?
—একতার কথা, আপনার কথা দাদা আলাদা, আপনাদের বেশিরভাগ কলকাতায় কংগ্রেস সাপোর্টার। আপনার তো একটা ডেফিনিট কংগ্রেস ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। এখানে কংগ্রেস মিনিস্ট্রিতে তাই এত কোঅপারেশন পেট্রোনেজ পান। রণজিতটা একটু ঠোঁটকাটা, মামাবাড়ি বরিশাল তো। আধা বাঙাল। তার ওপর বেশি কোয়ালিফায়েড, টেলকোর আভিজাত্য। অমলকে অন্যদের মতো অতটা যেন খাতির করে না।
অবশ্য অমল কোনও উত্তর দেবার আগেই স্ত্রীরা হইহই করে উঠল।
-নো পলিটিক্স। নো পলিটিক্স। বলেছি না কংগ্রেস সি পি এম নামোচ্চারণ বারণ। রণজিতটাকে ফাঁইন দিতে হয়। চট করে বেরিয়ে এক বোতল ডিরেক্টরস স্পেশাল।
সুপর্ণা এতক্ষণ মুখ চুন করে বসেছিল। জিন অ্যান্ড লাইম পেটে থিতিয়ে বসতে চাঙ্গা হল।
–যাকগে ওসব কথা। যা হবে না তা হবে না। এ নিয়ে তর্ক করে লাভ কী। দাদাই ঠিক বলেছেন। স্বাধীন ব্যবসা ট্যাবসা করলে ঝামেলা নেই। আচ্ছা দাদা ইউনিসেফের গ্রিটিং কার্ড বেচলে কেমন হয়? সব বড় অফিসে গ্রিটিং কার্ড বিভিন্ন অকেশানে কেনা হয়। ক্রিসমাস নিউইয়ার ছাড়াও আজকাল দেওয়ালি-হোলি এসবে চলছে। মাড়োয়ারি-গুজরাটি ফার্মে। বেশ ভদ্র ব্যবসা। ওটা যদি করি?
