-ঠিক যেন বেডকভার পরে আছি। এ শাড়ি টিকবে না তো কি। শীতকাল ছাড়া তো পরাই যাবে না আর হাঁটা তো অসম্ভব, কুঁচি হয় না এদিকে গলা অবধি বহর। এরপরে আর ওড়িশার সুতী শাড়ি কেনেনি। একযুগ বাদে ভুবনেশ্বর ছাড়বার সময় উৎকলিকায় দেখল বেশ পাতলা জমির সব শাড়ি। দাম অবশ্য বাংলা তাতের দ্বিগুণ। তবু ভাল, বাইরের বাজারের সঙ্গে তাল মেলাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। আগের মতো ঠাসজমি দশহাত বহরে পঞ্চাশ ইঞ্চি বেঢপ শাড়ি আর বোনে না। আর্থিক লেনদেনের নিয়ম সবার ওপরে। ব্যবসা করলে চোখ কান খুলতেই হবে। বাইরের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তবে জিনিস বিক্রি….
–আচ্ছা, আপনি আর পাঁচ জনের মতো একটা ছকে বাঁধা গল্প বলতে পারেন না? কোথা থেকে কোথায় চইল্যা যান। সঞ্জয় দেবারতির ভুবনেশ্বর ছাড়ার ব্যাপারটা কী হইল? ছায়া যেন মাস্টারনি। সব সময় ভুল ধরে।
—তুমি আমার জীবনকাহিনী চাও তো না কি? এসব আমার জীবনেরই অংশ। আমি কী দেখলাম কী ভাবলাম। নইলে ঘটনাগুলোর মূল্য কী? আচ্ছা ঠিক আছে। সঞ্জয় দেবারতির কথাটাই বলি।
অমল সুজিতকে জিজ্ঞাসা করে সঞ্জয়রা কেন কাউকে কিছুনা জানিয়ে ভুবনেশ্বর থেকে হঠাৎ প্রায় রাতারাতি চলে গেল। সুজিত একমুখ হেসে বলে ও সে কাহিনী শোনেননি বুঝি? ওর ছেলে পাপ্পকে মনে আছে?
-হ্যাঁ হ্যাঁ। সব পার্টিতে নিয়ে আসত। একেবারে বাচ্চা তো, বছর দুই আড়াই বয়স? বেশ কথা বলত কিন্তু। কেন তার অসুখ-বিসুখ কিছু হল নাকি? হাসতে হাসতে মাথা নাড়ে সুজিত।
-সে সব কিছু নয়। ছেলেটা সব সময় বুড়ো আঙুল চুষত। তা নিয়ে সঞ্জয় আর দেবারতি দুজনেই খুব উদ্বিগ্ন। নোংরা অভ্যেস, দাঁত খারাপ হবে, হাঁ মুখ উঁচু হয়ে যেতে পারে ইত্যাদি। সব সময় ছেলেকে বারণ করে। কসপ্তাহ আগে সন্ধেবেলা সঞ্জয় ট্যুর থেকে ফিরেছে। বাড়ি ঢুকতে গিয়ে দেখে কাজের ওড়িয়া ছোঁকরাটা আর ছেলে পোর্টিকোর তলায় সিঁড়িতে বসে। ছেলের মুখে বুড়ো আঙুল। সঞ্জয় যেই না বলেছে পাপ্পু, তুমি আবার আঙুল চুষছ। বের করে ফ্যালো বলছি, ছেলে কী করল জানেন? গম্ভীরভাবে মুখ থেকে বুড়ো আঙুলটা বের করে বাপের দিকে তর্জনী দেখিয়ে বলল, শলা গণ্ডু অছি বলেই আবার বুড়ো আঙুল কপ করে মুখে চুষতে লাগল। আর সঞ্জয় জামাকাপড় না ছেড়ে সেই রাতে বিনা রিজার্ভেশানে ট্রেন ধরে সোজা পরদিন কলকাতা ডিভিশনাল অফিসে হত্যে। তার ছেলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাকে এখনই কলকাতা বা আশেপাশে পশ্চিমবঙ্গে যেখানে হোক নিয়ে আসতে হবে। অতঃপর পাহাড়পুর বদলি। অর্ডার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দে ছুট।
শুনতে শুনতে একতার সকলে হা হা হি হি। অতএব ভুবনেশ্বর ও একতা ক্লাব থেকে ফেয়ারওয়েল পার্টি এবং অবধারিত কটকি তারকোষিকাজের সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় উপহার না নিয়ে সঞ্জয়দেবারতির বিদায়।
ছায়া দেবনাথ সন্তষ্ট হয় না। কলম থামিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে এটা একটা কী স্টেরি হইতাসে খালি রামশ্যাম খেদিপেঁচির কথা। আপনি না হিরো। হিরোর কাহিনী কই?
–আরে ওদের সকলের মধ্যেই তো আমি। সেটাই তো বোঝাতে চেষ্টা করছি। ভুবনেশ্বরে আমার বেস্ট পিরিয়ড অফ লাইফ, আমার স্বর্ণযুগ। কারণ তখন আমি নিজেকে কেন্দ্র করেই শুধু বাঁচতাম না। ছড়িয়ে গিয়েছিলাম অনেকের মধ্যে। ভাবলে আশ্চর্য লাগে না? সম্পূর্ণ অনাত্মীয়, কদিনের চেনা, আলাদা শিক্ষা, হয়তো বা আলাদা পরিবেশে মানুষ। তবু শুধু বাংলাভাষী এই পরিচয়ের জোরে কাছাকাছি আসা। কিছু সময়ের জন্য। আবার যে যার নিজস্ব স্রোতে কোথায় আলাদা ভেসে চলে যাওয়া। কিন্তু যে সময়টুকু একসঙ্গে থাকা। তখন তাদের সবকিছুতে এই অমলদা। আমার কত ইম্পর্টেন্স বুঝতে পারছ না?
—মানলাম। আপনি অ্যাকটা কর্তাব্যক্তি হইসিলেন। কিন্তু আপনার নিজের কী হইতেছিল? আপনার নায়িকা গ্যালেন কই? আপনার আর তার ভাব-ভালাবাসা-বিরহ অভিমান এই সবই না স্টোরি। আপনি অ্যাকটা ক্যামন স্টোরি কন, নায়িকার যে দেখি পাত্তাই নাই।
—আছে আছে খুব আছে। তুমি তো ধৈর্য ধরে শুনছই না। এই যে এত পার্টিফার্টি মেলামেশা দাদাগিরি ফাংশান, সবই তো তার জন্য। তার ভুবনেশ্বরে আসা উপলক্ষে। এই যে সঞ্জয় দেবারতি হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে চলে গেল তারপর প্রথম স্টেপ তো তার। খোঁজ করে দেখ কী হয়েছিল। আমার বাড়িতে প্রতি জমায়েতে তো সে-ই হোস্টেস। শুধু তাই নয়, মধ্যমণি। আমার প্রায় সমস্ত সাবালক জীবনটার ভিত্তিভূমি সে। তাকে ঘিরে আমি, আমাকে ঘিরে একতা।
একতা ক্লাব একটা গোষ্ঠী তার কার্যকরী কমিটির সদস্যরা একটা যেন যৌথ পরিবার। হিন্দু আনডিভাইডেড ফ্যামিলি এইচইউএফ, ইনক্যামট্যাক্সের পরিভাষায়। যে পরিবারের কর্তা গোষ্ঠীপতি এই অমলকুমার দাস। সকলের সবকিছুতে যেমন অমলদা তেমন অমলের সব কিছুতেই মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী। কবে প্রথম দেখা তার সঙ্গে? স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য যেন ফ্ল্যাশ ব্যাক। মফঃস্বল শহরের আধাচা ফাঁকা রাস্তা। নিচু নিচু বাড়ি। একটির সামনে দরজায় বেল বাজাচ্ছে সদ্যকৈশোর উত্তীর্ণ একটি তরুণ। সবে প্রতিদিন নিয়মিত দাড়ি কামাচ্ছে গলার স্বর ভারী হয়েছে। দরজা খোলে। একজন তরুণী, সতেজ ছিপছিপে মাজামাজা রঙ, পরনে কমলারঙের শাড়ি, কালো ব্লাউজ, মিশকালো কোকড়া চুল আধখানা পিঠ ছড়িয়ে আছে। স্মিত সপ্রতিভ মুখ।
