স্মিতা ইন্টারভিউতে সিলেক্টেড হল। স্কুলের অফিসে জয়েন করে স্টাফ কমনরুমে গিয়ে বসেছে। রুটিন কী, কোন কোন বই পড়াতে হবে ইত্যাদি জানা দরকার। কেউ কথা বলে না। পরপর পাঁচদিন এক অভিজ্ঞতা। সকাল থেকে বিকেল স্মিতা বসে। একটা কথা কেউ তার সঙ্গে বলে না। ছদিনের দিন ইস্তফা। হেমেন আর স্মিতা দুজনেরই পরে ক্ষোভ। হেমেন তো বলেই ফেলে,
—দেখলেন দাদা কি সাংঘাতিক। এদিকে অসমে কত ওড়িয়া ভাল ভাল চাকরি করছে। সমস্ত নর্থ-ইস্ট ভর্তি হয়ে গেছে ওড়িয়া প্রফেসর-টিচার, ওড়িয়া পাবলিক সেক্টর একজিকিউটিভ। আর আমরা দু-চারজন এখানে এলে এই ব্যবহার।
সান্ত্বনা দেয় অমল। কীই বা আর করবে। শিলং-এর বাঙালি অভিজিৎ চৌধুরী হেড অফিসে পোস্টেড। অমলেরই প্রায় সম-সাময়িক। একবার মিটিং-এ গিয়ে কথায় কথায় স্মিতার কাহিনী তাকে শুনিয়েছিল অমল। অভিজিৎ চৌধুরী হেসে কুটোপাটি। অমল অবাক। হাসি থামলে অভিজিৎ একটানা গড় গড় করে যে বৃত্তান্তটি বলে গেল তার মোন্দা কথা হল স্মিতা বড়ুয়ার বাবা এবং মা যাদের অভিজিৎ ছোটবেলায় বিলক্ষণ জানত দুজনেই শিলং এর লোক এবং বঙ্গালখেদা আন্দোলনে অতি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। কাগজেটাগজে গরম গরম প্রবন্ধ, সভাসমিতিতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা, বঙ্গালদের কুকর্মের ফিরিস্তি। আজ তারা জন্মস্থান শিলং থেকে বিতাড়িত। একসময় তারা যেমন বঙ্গালদের বিদেশি ভেবেছিলেন, তাড়াতে চেয়েছিলেন আজ অন্যেরা তেমনই তাদের বিদেশি ভাবে তাড়িয়ে দেয়। এবং সেই অন্যরা বঙ্গাল নয়, তাদেরই ঘরের লোক, আপনজন, শতশত বছরের প্রতিবেশী ভূমির সন্তান।
—সো দ্য সার্কল হ্যাস কাম টু দ্য ফুল সাইকল, বৃত্ত সম্পূর্ণ। ইন্ডিয়ানরা যাদের কাছে। বিদেশি, ইন্ডিয়াতে তাদের পুত্রকন্যা বিদেশি। অভিজিতের সহাস্য উপসংহার।
সত্যি কথা বলতে কি অমলের এ সমস্ত স্বদেশি বিদেশি ভূমিপুত্র বহিরাগত বিরোধ একেবারে ভাল লাগে না। তার কাছে প্রাণী-জন্ম মানে জীবনধারণের সমস্যা। মানুষের প্রধান কাজ জীবিকা অর্জন। যে যেখানে পারো দুটো করে খাও। ব্যস।
—এটা কি একটা কথা হইল। ছায়া দেবনাথ আপত্তি জানায়। মাইনষের স্বদেশ, নিজের জায়গা থাকব না। যেইখানে চোদ্দো পুরুষের বাস সেই মাটিতে তার অধিকার মানতেহ হহব।
—মানুষ তো গাছ নয় যে একটা জায়গায় আজীবন থিতু হয়ে থাকবে। বনজঙ্গলের জানোয়ারও নয়। তাদেরই শুধু একটা নিজস্ব এলাকা বাঁধা।
-বাঃ আর আমাদের যার যার একটা এলাকা বাঁধা থাকব না? স্বদেশ কারে কয়?
–ওই জানোয়ারদের মতো বাঁধাধরা এলাকা। এই মাটির ওপর আমাদের অধিকার চিরকালের জন্য চূড়ান্ত। ব্যক্তিগত মালিকানা নিয়ে কত কী তর্ক। মাটির ওপর গোষ্ঠীগত একচেটিয়া অধিকারের বিরুদ্ধে টুশব্দটি করার সাহস নেই।
–থাক বাবা। আপনি আর নিজস্ব থিওরি কপচাইবেন না। বরং আপনার গল্পটা বলেন।
আমাদের এক্সঅর্থাৎ মধুশ্রী তার রিসার্চটা শেষমেষ ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো বাঙালির অগতির গতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই করছে। একমাত্র সেখানে তাকে কেউ বহিরাগত বা বিদেশি বলতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি আমি ওড়িয়াদের কাছ থেকে বরাবর ভাল ব্যবহার পেয়েছি। মিনিস্টার অফিসার বিজনেসম্যান সবাই সবসময় কোঅপারেট করে। সেটা কি শুধু আমার চেয়ারের মাহাত্ম? না তা মোটেই নয়। তাদের স্বভাবের গুণ নিশ্চয় আছে। বাঙালিদের সঙ্গে চাকরি ক্ষেত্রে তারা প্রতিযোগিতায় যেতে চায় না।
এত দোষের কী? কে না জানে আমাদের বাপঠাকুরদারা আগেভাগে হামলে পড়ে ইংরিজি শিখে ব্রিটিশ আমলে সব চাকরি-বাকরির বাজার একচেটিয়া দখল করে রেখেছিল। এখন তার শোধ তুলবেনা অনন্যরা। ইল্লি আর কি। মধুশ্রীর স্বামী তো দিব্যি ভাল চাকরিবাকরি করে। তার নিজের আবার চাকরির দরকার কী! প্রতিযোগিতার ঝামেলায় না গেলেই তো সব শান্তি। বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে থাক, বাচ্চামানুষ রান্নাবান্না-ঘরকন্না। ব্যস, আগে তুমি এগিয়ে ছিলে এখন তুমি পিছনে হটো। তবেই না ইন্ডিয়ায় সবাই মিলেমিশে থাকবে। তাতে যদি তুমি আর তুমি না থাক তো না রইলে। কার কী আসে যায়।
৪. পূর্ণ সহযোগিতা
ছায়া দেবনাথের গবেষণা, কেস নং ৯
রোগী প্রচুর কথা বলছে। অর্থাৎ প্রায়ই পূর্ণ সহযোগিতা পাই। আমার বাঙালত্ব নিয়ে বিরক্তিটা দেখছি বেশ সামলাতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি যুক্তিবোধ বা যাকে বলে হুঁশজ্ঞান বা কমনসেন্স এখনও আসেনি। তাহলে আমার পরনে সাদা কোটটা (ধারে পাওয়া) এত সহজে মেনে নেওয়া যেত না। রোগী যখন নিজের অতীতের কথা বলে তখন হঠাৎ হঠাৎ তার স্মৃতি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। শুনলে মনে হয় যেন চোখের সামনে যা ঘটছে তার ধারাবিবরণী। এবং ভাষ্যকার যেমন দৃশ্যটির অংশ, তেমন রোগীও যেন স্মৃতির মধ্যে দিয়ে আবার ঘটনাগুলিতে ফিরে যাচ্ছে। নতুন করে ঘটছে তার চেতনায়।
যে অধ্যায়গুলোর কথা শুনি সবই একটা বিশেষ পর্যায়ের যখন রোগীর কর্মও ব্যক্তিজীবন ছিল পরস্পর সংলগ্ন। দুটিই অদ্ভুতভাবে আবর্তিত হয়েছে একতা নামে একটি প্রবাসী বাঙালি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ঘিরে। ভুবনেশ্বরে এই ক্লাবটিকে অবলম্বন করে তার জীবন পেয়েছে বহুমাত্রা। তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ। দায়িত্ব পালন করেছে সাবালক পুরুষের, পরিবারের কর্তার।
