ছেলেমেয়েদের স্কুল ভর্তির পালা শেষ হলে অমলের তিন নম্বর ডিউটি–স্ত্রীদের কাজকর্মের সন্ধান। নিউ উইন্ডসর হোটেল যেটা আগে ওড়িয়া মালিকানায় হোটেল নীলাচল ছিল অধুনা স্বত্বাধিকারী কলকাতার এক মারোয়াড়ি গোষ্ঠী। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বিমল কুণ্ডুর স্ত্রী মাথা খেয়ে ফেলছে। বাচ্চাদের কোচিংক্লাস বসাবে বাড়িতে। তার লিফলেট ছাপিয়ে দিতে হবে। শুধু ছাপিয়ে দিলেই হবে না, সেই হলদে গোলাপি কাগজের গোছ যার প্রত্যেকটিতে শ্রীমতী মঞ্জু কুণ্ডুর স্পেশাল কোচিং-এর স্পেশাল গুণাগুণের ফিরিস্তি ক্যাপিটাল লেটারে বিজ্ঞাপিত, সেগুলি যাতে ভুবনেশ্বরের প্রধান প্রধান খবরের কাগজ অর্থাৎইংরিজি সান টাইমস্ওড়িয়া সমাজ, সংবাদধরিত্রীইত্যাদির রবিবারের সংস্করণের সঙ্গে হকারদের হাতে বাড়ি বাড়ি বিলি হয় তার ব্যবস্থা করা।
এ তো তবু তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। এক্স অর্থাৎ মধুশ্রীকে নিয়ে কত ঝামেলা। মধুশ্রীর স্বামী সৌম্যেন বাঙালি মতে তার নামের ইংরিজি বানানে য ফলার অনুরূপ ওয়াই ব্যবহার করে (যদিও তখন উত্তর ভারতের ইংরিজি বানানে এসব ক্ষেত্রে ওটা বাদ দেওয়াই ফ্যাশান) অতএব, তার ডাক নাম হয়েছে ওয়াই এবং সেই ওয়াই-এর সূত্রে তার বেটার হাফ যিনি বিলিতি মতে স্বামীর আগে আগে হাঁটবেন, তাঁর নাম এক্স। এক্স এবং ওয়াই দুজনে প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাল ছেলেমেয়ে। ওয়াইএখানে এসেছে এক টায়ার কোম্পানির রিজিওন্যাল ম্যানেজার হয়ে। লম্বা পাতলা ছিপছিপে ঝকঝকে ছেলে। এক্স ভারী মিষ্টি মেয়ে, চমৎকার গান গায়। একতার সব পার্টিতে দুজনে মিলে জমিয়ে রাখে। কিন্তু তাতেই কি এদের আশ মেটে। এক্স কিসে যেন ফার্স্টক্লাস। নেট নামে কী একটা পরীক্ষায় পাশ। ওটা নাকি ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট। এখন তার ইচ্ছে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা। অথবা পি এইচ ডি-র জন্য গবেষণা। বাপরে বাপ,আজকাল বাঙালি মেয়েগুলো যা হয়েছেনা। থামতেই জানে না। অমলকুমার দাস ডি পি আই অফিসে খোঁজ খবর করে জানল নেট ফেট পাশ করলে কী হবে, ওড়িয়া ভাষায় স্কুল পাশ সার্টিফিকেট না দেখাতে পারলে কোনও কলেজে পড়ানো তো দূরের কথা চাকরির ইন্টারভিউতেই ডাকবে না। কুছ পরোয়া নেই। সমানে এক্সের ম্লান মুখ দেখা আর দাদা এখানে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার শোনার পর মরিয়া হয়ে অমল কলিঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের কাছে নিয়ে হাজির করল এক্স-কে। ভদ্রলোক খুব সমাদর করলেন কলকাতার প্রথম শ্রেণী নেট ক্লিয়ার করা মেয়েকে। দুজনকে চা-ও খাওয়ালেন। আলাপ হল বিভাগের আরও দুজন জুনিয়রের সঙ্গে। চাকরির কথা উঠতেই কিন্তু কিন্তু করে বললেন,
-দেখুন ভেকেন্সি আছে। নেট পার করা ক্যান্ডিডেটও আমরা পাচ্ছি না। কিন্তু সমস্যা অনেক। প্রথম কথা জানেনই তো আমি ডাইরেক্টলি নিতে পারি না। কাগজে বিজ্ঞাপন বেরুলে অ্যাপ্লাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটা আউটসাইডার ইনসাইডার ব্যাপার আছে। লাস্ট ইয়ার জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট স্টেটের বাইরে থেকে দুতিনজনকে নেয়। ফলে প্রচণ্ড অ্যাজিটেশান। স্টাফ মেম্বাররা ঘেরাও। এসব ঝামেলা বুঝলেন কেউ ফেস করতে চায় না। পলিটিক্স ঢুকে এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনের আর স্যাংটিটি থাকছেনা। অ্যাকাডেমিকদের আর পাওয়ার কী বলুন!
ন্যাকা, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানো না। পলিটিক্স কি তোমাদের মদত ছাড়াই ঢুকছে নাকি। যে যার পেটোয়া ছাত্রছাত্রী আঁকড়ে অপেক্ষা করছে সুযোগের। কেমন করে ঢোকানো যায়। মুখে অমল কিছু বলে না। অতঃপর এক্সের ভরসা কেন্দ্র সরকার। নালকো অর্থাৎন্যাশনাল অ্যালয় কর্পোরেশনকে ভিত্তি করে গবেষণার পরিকল্পনা করে ফেলে এক্স। ওখানে পাঁচমিশালি লোক। অসুবিধে নেই। পাবলিক সেক্টরেরও কিছু উপযোগিতা আছে। তাছাড়া নালকের চেয়ারম্যান ভি আর ত্রিবেদী উত্তরপ্রদেশের লোক, একতা-র অ্যাডভাইসারও। ওড়িয়া জাতটার অনেক গুণ। সাধারণত ভদ্র নিরীহ, বাঙালিদের মতো কথায় কথায় দপ করে জ্বলে ওঠে না। আঁতলেমির ধারে কাছে নেই। অমলদের অর্থাৎ উত্তর কলকাতার ঘটিদের মতো ক্যুনিজমে অস্বস্তি বোধ করে। এখানে সি পি এম উচ্ছেদ হয়ে গেছে। দু একটা থার্টিজ-এর ঘাটের মরা সি পি আই টিম টিম করছে। পটল তুললেই ব্যস এন্ড অফ কম্যুনিজম ইন ওড়িশা। কটকে গেলে অমলের বেশ যেন চেনাচেনা লাগে। সেই সরু সরু আঁকাবাঁকা গলি, আবর্জনা, গায়ে গায়ে লাগা ধসাপচা রঙ ওঠা বাড়ি। রাস্তায় চায়ের দোকান, হোটেলে বাঙালি জিভের চেনা স্বাদ। ঠিক যেন উত্তর কলকাতার জ্ঞাতি। শুধু তফাত এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা ছোটখাটো মন্দিরে। অমলের চোখে এদের একমাত্র দোষ, কারণে অকারণে অনওড়িয়া বিদ্বেষ। এই তো একতার মেম্বার হেমেন বড়ুয়ার স্ত্রী স্মিতাকে কী নাজেহালই না করল। মেয়েটা পড়াশুনায় ভাল, অসম থেকে মোটা নম্বরের এম এ। এখানে বি এ ভি স্কুলে একটা টিচারের ভেকেন্সিতে অ্যাপ্লাই করেছিল। ইন্টারভিউর ডাক এল। যে কেরানী প্রার্থীদের আসল সার্টিফিকেট টেস্টিমোনিয়াল ইত্যাদি মিলিয়ে নেয় তার কাছে প্রথমে গেছে। ওর নাম যোগ্যতা ইত্যাদি পড়ে গম্ভীর মুখে বলেছিল হেই পারিবনি। আম এইঠি গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি পরা রেকগনাইজড নুহে। স্মিতা তো প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে হেমেনকে টেলিফোন ও হেমেন অমলকে। বিএভি স্কুল সর্বভারতীয় সংগঠন। ব্রহ্মানন্দ আবার কবে ওড়িয়া ছিলেন। গভর্নিং বডির সদস্যদের এবং সদস্যদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালীদের চটাপট টেলিফোনে লাগায় অমল। সবাই স্থানীয় পঞ্জাবি যাঁরা অনেকেই ব্যবসাদার এবং আই পি বি আইয়ের অমলকুমার দাসের সঙ্গে সুসম্পর্কে আগ্রহী। তাছাড়া সত্যি কথা বলতে কি পঞ্জাবিদের কাছে কলিঙ্গ গুয়াহাটি সমান। অতএব, তারা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললেন, সে কি কথা। গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি আলবাৎ রেকগনাইজড। ইন্টারভিউ দিক ক্যান্ডিডেট।
