তবে তার জন্য খেসারত কম দিতে হয়নি। যেমন ধরা যাক পিয়ালীর টাঙ্গাইল শাড়ি প্রদর্শনী। ক্রমটন গ্রিভ-এর সুবিনয় মুখার্জির স্ত্রী পিয়ালী সুবিনয়ের কোম্পানি ড্রাইভার বুড়ো রামলালকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে করে খোদ ফুলিয়া থেকে বিশাল বিশাল স্যুটকেস বোঝাই শাড়ি এনে যখন তাদের ফরেস্ট পার্কের অমন সুন্দর সাজানো গোছানো লিভিংরুমে গাদা করল তখন সুবিনয় ধরে পড়ল অমলকে।
—দাদা, বাড়িতে তো আর টেকা যাচ্ছে না। একটা কিছু ব্যবস্থা করুন। একেবারে গুদাম ঘরে আছি। যে দিকে তাকাই শুধু শাড়ি আর শাড়ি। রিসিভার কেড়ে নেয় পিয়ালী,
—খবরদার দাদা ওর কথা শুনবেন না। কিসের অসুবিধা অ্যাঁ? এই এত বড় ঘর। কলকাতায় আমরা যে ফ্ল্যাটে থাকতাম তার পুরোটা এখানকার লিভিং রুমে ধরে যায়। তার একটা কোণে বাক্সগুলো রেখেছি। ওকে কুটোটি নাড়তে হয়েছে? এই তো তুলিকে রুচিকায় পাঠিয়ে-হ্যাঁ হ্যাঁঁ, তুলি তো রুচিকাতেই কন্টিনিউ করছে। আপনার জন্যইতো ভর্তি হতে পারল। স্কুলটা মন্দ নয়। বাড়ির একেবারে কাছে, তা যা বলছিলাম। তুলিকে স্কুলে পাঠিয়ে আমি রান্নাটা করে ফেলি। ওতো বড়জোর দেড়-দুঘন্টার ব্যাপার। তারপর সারাটা দিন আমি ফ্রি। তখন শাড়িটাড়িগুলো নিয়ে বসি। আপনিই বলুন হোলসেলে কেনা, আমাকে তো আবার প্রাইস ট্যাগ লাগাতে হয়। এতে এনার কী এমন অসুবিধা?
—তা বাড়িতে একটা বুটিক-টুটিক খুলে ফেল না।
—খুলব? বলছেন? আমিও দাদা তাই ভাবছিলাম। আচ্ছা সোনার বাংলা নামটা কেমন হবে বলুন তো?
-ওসব বাংলাফাংলা দিয়ে নাম রেখো না। বাংলার যা ছিরি। বাঙালি গন্ধ থাকলে লোকে ভাবে লালবাতি জ্বলে গেছে।
—তা যা বলেছেন। তবে আমি তো এককুসিভলি টাঙ্গাইল বেচব, তাই ওই নামটা সুটেবল ভাবছিলাম। জানেন টাঙ্গাইল ধনেখালির এখানে বেশ ভাল মারকেট? ওড়িশায় কটনহ্যান্ডলুম খুব এক্সপেনসিভ, সবাই তাই সিনথেটিক আর সাউথ কটন পরে। কোনওটাই কমফর্টেবল নয়। টাঙ্গাইল এখানে আইডিয়েল ফর এভরিডে ওয়্যার। স্পেশালি ফর সামার। গরম তো বছরে দশমাস।
-তা ঠিক। তবে নামটা ভেবে চিন্তে দিও।
—সে দেব খন। কিন্তু দাদা একটা রিকোয়েস্ট ছিল।
—বলে ফেল।
—ভুবনেশ্বর ক্লাবে আমার একটা একজিবিশন করিয়ে দিন।
অগত্যা করাতেই হল। এত সহজে অবশ্য হল না। ক্লাবের সেক্রেটারি তখন বিজয় মহান্তি। ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায় নেমেছে। চিংড়িও করছে। নিউ জেনারেশান ওডিয়া। অতি চালু। প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলে কি না,
–পিয়ালী মুখার্জি ক্রমটন গ্রিভ এর মিঃ এস মুখার্জির মিসেস তো? তা ক্রমটন গ্রিভস্ একটা ক্লাব নাইট স্পনসর করুক না। এই একটা অন্তারী হোক। সঙ্গে মিসেস মুখার্জির টাঙ্গাইল শাড়ির একজিবিশান থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাই করতে হল। প্রচুর লোক এসেছিল। সন্ধে হতে না হতে গাড়ির সার বেঁধে গেল। ক্লাবের বিশাল কম্পাউন্ডে আঁটল না, বাইরে বড় রাস্তায় লম্বা সারি। ক্লাবের দালান একেবারে ঠাসা। ভুবনেশ্বরের যত নর্থ ইন্ডিয়ান এবং স্মার্ট, অর্থাৎ হিন্দিবলিয়ে, ওড়িয়া টিনএজার আছে সবাইহাজির। সকলের আকর্ষণ অন্তারী তে। এদিকে পিয়ালি শাড়ি সাজিয়ে মুখ চুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হিন্দি অন্তাক্ষরির দাপটে তার বাঙালি ব্যবসার অন্ত। ক্লাবের মাথাদের স্ত্রীরা দায়সারা ভাবে একটা রাউন্ড দিলেন। বাদবাকির উৎসাহ আগ্রহ শূন্য। শেষে একতার সদস্যরা এবং তাদের তত স্মার্ট অর্থাৎ সর্বভারতীয় নয় এমন ওড়িয়া প্রতিবেশিনীরা দল বেঁধে সব কিনে নিল।
অর্থাৎ কি না অমলকুমার দাসই বিক্রিবাটা করাল। পরের বছর একজিবিশনের ভেন্যু আর অতটা হাইক্লাস এবং ইন্ডিয়ান ওরফে হিন্দি কালচার অধ্যুষিত কোথাও রাখল না। ভুবনেশ্বরের উচ্চপদস্থচাকুরেদের স্ত্রীরা একটা মহিলাসমিতি করেছে। শহীদগনরে খেলাঘর নামে বাচ্চা রাখবার একটা ফ্রেশ ওঁরা চালান। তাদের হলঘরটা ছুটির দিনে দিব্যি সত্তায় পাওয়া গেল। পাড়াপ্রতিবেশী অর্থাৎবাঙলিরাই ক্রেতা। না, অমল কোনওদিন এই বাঙালি জাতটাকে বুঝতে পারে না।
অথচ পাকেচক্রে বাঙালিদের দায় অমলের ওপর বর্তেছে। ভুবনেশ্বরে একটি বাঙালি পোস্টেড হওয়া মানে অমলকুমার দাসের দায়িত্ব বাড়া। প্রথমে তার বাড়ি। শহীদনগরকে মাঝখানে রেখে খোঁজার পরিধি উত্তরে চন্দ্রশেখরপুরে দক্ষিণে পুরনো ভুবনেশ্বর থেকে পুরীর রাস্তা লুইস রোড পর্যন্ত বিস্তৃত। কোম্পানির এলেম, ব্যক্তির পদাধিকার ইত্যাদি অনুযায়ী পাড়া ও বাড়ির শ্রেণী বিভাজন। তারপর ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা। অর্থাৎইংলিশ মিডিয়াম, এম আই এল বা মডার্ন ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ যা ভারতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী হওয়ার কথা মাতৃভাষা কিন্তু বাস্তবে নিজের রাজ্যের বাইরে গেলেই হিন্দি। যদি বেশিদিন ভুবনেশ্বরে থাকে তো থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ সংস্কৃত। ভুবনেশ্বরের যে দু-চারটি স্কুলে এ সব ব্যবস্থা আছে তার প্রত্যেকটিতে অমলকুমার দাস অতি পরিচিত মুখ। সেন্ট জোসেফ কনভেন্টের মাদার সুপিরিয়র তো তাকে দেখলেই বলে ওঠেন,
–এগেন ইউ, মিঃ দাস। এভরি টাইম ইউ কাম ইউ ব্রিং আ নিস। সো মেনি নিসেজ অ্যান্ড নেফিউজ। বুড়ি আবার মুচকি হাসে। বি এ ভি স্কুলে এক অবস্থা। রুচিকা নতুন স্থানীয় পঞ্জাবি মহিলারা চালান। সেখানে আচার ব্যবহার একটু ভাল। দেখলেই তাড়া করে না।
