—মাছ আসছে আপনারা এসেছেন বলে। আগে মোটেই এমনটি ছিল না। আমি তো সেভেন্টিজ-এ এখানে পোস্টেড ছিলাম। তখন মাছ পেতে হলে ঠিক সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে স্টেশন গোলিয়ায় হাজির হতে হত। অর্থাৎ ভুবনেশ্বর স্টেশন থেকে ইউনিট থ্রিতে ঢোকবার মুখে চৌরাস্তার মোড়ে ফুটপাত জনা তিনচার মাছওয়ালা সাত আটশ থেকে বড় জোর হাজার বারোশো গ্রাম ওজনের কালা, কচিৎ রুই নিয়ে বসত। আর থাকত সস্তার চাঁদা ভাঙর।
—সেকী! এখন তো দারুণ মাছ পাওয়া যায়। বড় বড় রুই কালা। যে দামের চিংড়ি আসে কলকাতায় তো স্বপ্ন। ইলিশ মেলে সিজনে। এমন কি চিতলও দেখা যায়।
—চিতল তো শুধু বাঙালিরাই খায় বোধ হয়। এখানে রকমারি মাছ তো খেতে দেখিই। তবে বড় মাছ সব অন্ধ্রের চালান। লোকাল আমদানি বলতে কৌশল্যা-গঙ্গা থেকে কিছু। তাছাড়া অন্যান্য মাছ বিশেষ করে চিংড়ি আমার তো ধারণা বাঙালি জেলেরাই ধরছে। আসলে সমুদ্রের ধার দিয়ে প্রচুর বাইরে থেকে জেলে বসে গেছে। আমার সন্দেহ সবাই বাংলাদেশি, তারাই ধরছে।
-বলেন কি। এখানেও বাঙাল!
–একবার আমি রিলিফ কমিশনার থাকার সময় ট্যুরে গেছি। বন্যার পর সব ভয়াবহ অবস্থা। সমুদ্রের ভেতর ছোট ছোট দ্বীপগুলো প্রায় ডুবে গেছে। তারই একটা থেকে শুনি ডাকছে। পরিষ্কার বাঙাল ভাষায়। ওদের মাছ ধরার নৌকোগুলোও একটু আলাদা। চৌকো ধরনের পাল, বাদাম। পুরো কোস্ট জুড়ে এমন কি চিল্কা হ্রদেও বাঙালদের মাছ ধরার নৌকো। তাই তো এত চিংড়ি পাচ্ছেন। এখানে যারা চিংড়ির ব্যবসা করে লাল সব প্রন। কিং, প্রন প্রিন্স, তারাই বাংলাদেশিদের বড় মুরুব্বি।
-আশ্চর্য তো। এমনিতে তো শুনি এরা নাকি আউটসাইডার বিশেষ করে বঙ্গালি আসা মোটেই ভাল চোখে দেখে না। বাস্তব দেখুন কত আলাদা। আমি নিজে তো ফ্র্যাংকলি স্পিকিং সব সময় কো অপারেশন পাই।
—টাকা, টাকা মিঃ দাস। তার কাছে কোনও ইডিওলজি টেকে না।
সবার উপরে টাকাই সত্য। আসলে ব্যবসাবাণিজ্য করতে গেলে খানিকটা সহিষ্ণু হতেই হয়। যাকেনইলে কাজ হবে না তার পেছনে লাগলে লোকসান। যাকে জিনিস বিক্রি করতে হবে তার সঙ্গে মিষ্টি কথা বলা দরকার। আর্থিক লেনদেনের মধ্যে দিয়ে অনেকসময় সভ্যতার বিস্তার। যার সঙ্গে আমার কোনও রকম আদান প্রদান নিষ্প্রয়োজন তাকে শত্রু বলে চিহ্নিত করা সোজা। যে মানবগোষ্ঠী নিজেদের যত বেশি অন্ধিসন্ধি বন্ধ করে রাখে তারা ব্যবসা করতে শেখে না। তাদের সমৃদ্ধি ততই কম, অভাব ততই নিদারুণ এবং একদিন শোষণ অবশ্যম্ভাবী। ভুবনেশ্বরে প্রথমে আসার পর অফিসের অর্ডারলি পিয়ন যখন সকালে বাজার এনে সহায্যে সগর্বে বলত,
-সার, আইজ্ঞা দেখন্তু, বঢ়িয়া মাছর।
এবং অমল চেয়ে দেখত একটা সাতশো-আটশশা পেট নরম পোনামাছ, অবাক হয়ে বলত
-দুর, এটা কী মাছ এনেছিস। কাটাভর্তি হবে তাছাড়া পেট নরম। পিয়নটি হা হা করে উঠত।
-আইজ্ঞা, দিশি মাছ। পুরা জিইথিলা। দিশি অর্থাৎ স্থানীয় এবং জিইথিলা মানে জ্যান্ত ছিল কয়েক ঘণ্টা আগে ধরার সময়। বরফ ছাড়া ভুবনেশ্বরের গরমে যে এর মধ্যে নরম হয়ে গেছে সেটা তার কাছে কিছুনয়। অমল এদিকে জাত ঘটি, পাকা মাছ ছাড়া খেতে পারে না। অতএব, বিলিতি ঠাকুর ফেলে দিশি কুকুরকে সমাদর করার মহৎ জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হতে পারেনি। শহীদনগরে তার বাড়ি থেকে চার নম্বর ইউনিট বীর সিং-এ হেঁটে যাওয়া শক্ত। সাইকেল চালানো ও জানে না। সাতসকালে সপ্তাহে একদিন অমলই গাড়ি নিয়ে চার নম্বরে অস্ত্রের চালান বড় মাছ কিনতে যেত। তবে কবছর যেতে না যেতেই সমস্যার সমাধান বাজারের নিয়মে। শহীদনগরে এত বাঙালির বাস হয়ে গেল যে কিছু মাছওয়ালা বাড়ি বাড়ি মাছ ফেরি করতে লাগল। জানে বিক্রি হবেই। ফলে সে দশকে যে বাঙালি ভুবনেশ্বরে বদলি হয় সেই মোহিত। বাড়ি বয়ে টাটকা মাছ, কলকাতায় বাপের জন্মের কেউ দেখেনি বা শোনেনি। একতা ক্লাবের সদস্যরা সব কিছু নিয়ে তর্ক করে বটে কিন্তু একটি বিষয়ে তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ একতা, এমন মাছ খেয়ে সুখ কলকাতায় নেই। বাঙালি খাদ্যাবাসের আর দুটি বৈশিষ্ট্য, সরু সেদ্ধ চাল ও ব্র্যান্ডনাম ছাড়া খোলা ভাল পাতা চা—তাও ভুবনেশ্বরে পাওয়া যেতে শুরু করেছে। আর কী চাই। তাছাড়া সবাই স্বীকার করে ভুবনেশ্বরে তারা যে স্বাচ্ছন্দ্যে, যে স্বাধীনতায় স্বামী-স্ত্রী জোড়ায় জোড়ায় বাস করছে। কলকাতায় তা মোটেই সম্ভবপর নয়—গুরুজন আত্মীয়-কুটুম্বের বাধানিষেধ ভ্রুকুটির প্রশ্ন নেই। দিব্যি সবাই বাড়িতে পার্টি দিচ্ছে। স্বামী স্ত্রী মিলে মিশে হুল্লোড় করছে। প্রায় সকলেরই কোম্পানি ভুবনেশ্বর ক্লাবে সদস্য। সেই সুবাদে সপরিবারে ক্লাবে আসা যাওয়া। সেখানে গরমের দিনে সন্ধেবেলা দেবদারু ঘেরা ঘন সবুজ লনে কিংবা আধুনিক সুইমিং পুলের ধারে উঁচুনিচু টেরেস করা বসার জায়গায় যে আরাম তা কলকাতায় কোথায়। হ্যাঁ। সেখানেও বড় বড় ক্লাবটাব আছে। কিন্তু সেখানে চাকরির দৌলতে প্রবেশের অধিকার অনেক উঁচুতলার সাহেবদের। ভুবনেশ্বরে সকলেই বড় সাহেব। কোম্পানির খরচে আধুনিক বাসস্থান, গাড়ি, কখনও বা ড্রাইভারও। ভুবনেশ্বরের প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ।
অমল জানে কলকাতায় ইংরেজদের তৈরি ডাকসাইটে ক্লাব আছে। বেঙ্গল ক্লাব, টলি ক্লাব, সাটারেডে ক্লাব। আরও কত। সেখানে সদস্য সব কোইহ্যায় জমানার বাঙালি বক্সওয়ালা ও প্রফেশনাল প্রথম সারির ডাক্তার ব্যারিস্টার বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। অমল কুমার দাসের তিন পুরুষ সেসব জায়গায় ঢোকেনি। ঢোকার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। কলকাতায় তাদের কাছে ক্লাব মানে পাড়ার নেতাজি ব্যায়াম সমিতি। ভাঙা রেলিং ঘেরা তিনকোনা ফাঁকা জায়গা, ভেতরে একটা ছোট একতলা ঝরঝরে বাড়ি। সেখানে প্রথম যুগে বাঙালি যুবকদের শারীরিক উন্নতির মহৎ সংকল্পে ডাবেল, বারবেল ইত্যাদি সহযোগে আজীবন অকৃতদার মাস্টারদার কড়া খবরদারিতে হইয়ো হইয়ো হত। মাস্টারদার পরলোক প্রাপ্তির পর দ্বিতীয় যুগেইনডোর গেমস, অর্থাৎ তাস ক্যারাম গুলতানি। অধুনা স্রেফ গুণ্ডা রিক্রুটমেন্ট সেন্টার। নেতাজী ক্লাবের এহেন বিবর্তন অনেকটাই অমলের চোখে দেখা। তাই ভুবনেশ্বর ক্লাবে পা দিয়ে তার মনে হল যেন অন্য গ্রহে এসেছে। প্রায় খ্রিস্টার হোটেলের মতো বিলিতি পরিবেশ, রিসেপশনিস্ট ছোঁকরার মুখে ইংরিজি, এয়ার কন্ডিশান করা বার, উর্দিপরা বেয়ারা। সভ্যরা সব শহরের মাথা মাথা লোক। সকাল সন্ধে লনে টেনিস খেলা, ভেতরে বিলিয়ার্ডস। হ্যাঁ, তাসও আছে। ব্রিজ ছাড়া স্টেকেও খেলা হয়। সবুজ সোয়েড আঁটা চারকোণা ছোট ঘোট টেবিলে মাঝ বয়সি মহিলাদের বাজি ধরে খেলতে দেখে প্রথম প্রথম অমল একটু চমকে গিয়েছিল। তবে সব হাই ক্লাস সোসাইটি লেডিজ খেদিপেঁচি নয়। স্বামীরা যখন বার-এ, স্ত্রীরা কী করে সময় কাটান? বিশেষ করে যারা ড্রিংক-ফ্রিংক করেন না। মাঝে মাঝে কেটা ট্রমবোলা, হাউজিসভ্যদের পুত্রকন্যাদের নাচগান কুইজে পারদর্শিতা প্রদর্শন, ৩১শে ডিসেম্বর, দেওয়ালি, হোলি ইত্যাদি উপলক্ষে কনসার্ট, বারবিকিউ ইত্যাদি। কবছর যেতে না যেতেই ক্লাবের একজিকিউটিভ কমিটিতে ইলেকটেড মেম্বার অমলকুমার দাস—যে অমলকুমার দাসের ঠাকুরদার বাবা হাঁটুতে কাপড় তুলে বলদ ঠেঙিয়ে জমিতে লাঙ্গল চষত, যার ঠাকুরদা ভাগ্যবশত দুপাতা ইংরিজি পড়তে পেরে কলকাতায় বঙ্গলক্ষ্মী স্মৃতিতে বাবু হয়ে বসলেন, যার বাবা হরিচরণ দাস বিএ বিএল দেশপ্রেমিক, কংগ্রেসকর্মী, দেশের না হলেও পাড়ার নেতা। সেই অমল কুমার দাস আজ আরও এক ধাপ উঠল। পুরুষানুক্রমিক সামাজিক সিঁড়িভাঙায় সে সফল।
