-তা কেজরিওয়ালজি, আপনি তো খুব ভাল বাংলা ওড়িয়া বলেন জানতাম এখন তো দেখছি হিন্দিও কম জানেন না।
-কী যে বোলেন মিঃ দাস। হিন্দিই তো আমাদের আসোল ভাষা। ঘরে তো হিন্দিই বোলি। তাছাড়া ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ বোলে কোথা। মাড়োয়ারি বাড়ির হিন্দি আর এখানে ওবেরয়-এ দিল্লিমার্কা হিন্দি যে ঠিক এক নয় তা অমলের বিলক্ষণ জানা। তবে হিন্দির রকমফের এত যে কোন্টা ঠিক হিন্দি আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি। দুরদর্শনে সমাচারের হিন্দি না কি হিন্দি সিনেমার হিন্দি। মুখে বলে,
—তা ব্লাস্ট ফারনেস চালু হওয়া কেমন দেখলেন?
-ঠাট্টা কোরছেন মিঃ দাস? আপনি ব্যাঙ্কার, আমি বিজিনেসম্যান। আমাদের চোখে কি ধুলো দেওয়া যায়। হ্যাঁ, ব্লাস্ট ফারনেস সত্যি সত্যি চালু হোবে যখন আমি ইস্টিল প্ল্যান্ট কোরব।
—আপনিও স্টিল প্ল্যান্ট করবেন না কি?
-বাঃ কোরব না। সোবই আউটসাইডার এসে কোরবে। কোত একর জমি পেয়েছি জানেন?
এই আরেক ধান্দা। একজন ধীরজ পাল একজন গীতা থাপার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে। রাঘববোয়াল। সব বাইরের লোক। এদের এক এক ঘাইতে রাজ্যের অর্থনীতি কত হাত তলায় বসে যায়। আর এদের দেখিয়ে যে মৃত্তিকার সন্তানসন্ততি আম্ভে ওড়িয়ামানে পবিত্র মাতৃভূমি আম ওড়িশার শত শত একর দখল করে বসে থাকে তার খেয়াল কে রাখে। পরে মন্ত্রিত্ব বদল হলে আগের সরকারের একজন অপেক্ষাকৃত সৎ অতএব অপ্রধানদপ্তরধারী প্রাক্তন মন্ত্রী অমলকে সখেদে বলেছিলেন, বুঝিলে মিঃ দাস যে আমকু গুড মর্নিং গুড নাইট কহিলা আমে ভাবিলু সে ওড়িশারে ইনভেস্ট করিব। তাকু সবু দিও। এবে দেখন্তু অবস্থা। রাজ্যটাহি বিকিগলানি।
.
ছবছর বয়সে ঠাকুরদার কাছে শিখেছিলাম ইংরেজ আমল ছিল বাঙালির স্বর্ণযুগ। এতদিন এতবছর পরে হৃদয়ঙ্গম করেছি তার কারণ, সাহেবরা আমাদের নিজেদের কাছ থেকে বাঁচিয়ে রাখত।
আমার জীবনের যে অধ্যায়টিকে আমি স্বর্ণযুগ মনে করি তার পেছনেও কি সেই এক যুক্তি কাজ করে? আমি কি সে সময়ে নিজের কাছ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম? টি আই এলের কেচ্ছা, তার স্পনসর হওয়ার সমস্যা, একতার শেষ অনুষ্ঠানের বিপর্যয় যার ফলে আমার ও মৈত্রেয়ীর সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন—এসবই কি আমার চরিত্রের কোনও ছিদ্র থেকে উদ্ভূত অবধারিত পরিণতি না কি শুধুমাত্র একের পর এক সম্পর্কহীন দুর্ঘটনামাত্র? যার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই। হয়তো কোনও তাৎপর্যও নেই। আমরা অবস্থার দাস সত্যি, কিন্তু সে অবস্থা কি অনেকখানি নিজেদেরই সৃষ্টি নয়? একতাক্লাব আমার জীবনের কেন্দ্র হয়ে উঠল কেন?একতার মধ্যে দিয়ে আমি ছড়িয়ে পড়েছিলাম বহু মানুষের জীবনে। আমি তো শুধু নিজেকে নিয়ে থাকতাম না। অর্থাৎ নিজের কর্মস্থল, সংকীর্ণ আধাসামাজিক হালকা মেলামেশা যেটা একজন ব্যাচেলার প্রবাসীর পক্ষে স্বাভাবিক শুধু সেই চৌহদ্দির মধ্যেই তো আমি সীমাবদ্ধ ছিলাম না।
–আচ্ছা আপনি নিজের কথা না কইয়া রাজ্যের কথা কইতাসেন ক্যান? কে ব্যবসা করল কে পাবলিকরে ঠকাইল তাতে আপনার হিরো আর হিরোয়িনের কী? আপনারা তো ব্যবসা করতেন না। আমি তো এই স্টোরির মাথামুণ্ডু বুঝতাসি না।
-আরে বুঝবে বুঝবে। জীবনটা তো শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নায়ক নায়িকার প্রেম বিরহ মিলনের কাহিনী নয়। বাস্তবে কতটুকু সময় আমরা নারীপুরুষের সম্পর্কে দিই বলো তো? আসল কথা কি জানো? সবাই চায় নিজেকে জাহির করতে। সেটা সব চেয়ে ভালভাবে কিসে হয় বল তো? অন্যের ওপর ক্ষমতা দেখিয়ে। ওটাই বেসিক ইনস্টিংট। তাই তো সেক্স অ্যান্ড ভায়োলেন্স এত পপুলার। যেমন করে পারো অন্যকে কজা কর।
-না না ও সব সাইকোলজির কথা রাখেন। আমি হইলাম গিয়া বাঙ্গাল। অতশত বুঝি না। ঠিকমত বলেন দেখি। ভুবনেশ্বর জায়গাটা ক্যামন। আপনাদের ওই একতা ক্লাব লইয়াই ক্যান এত মাথাব্যথা। তার সঙ্গে হিরোয়িনটার কী সম্পর্ক। খোলসা কইর্যা বলেন।
.
কটক থেকে ভুবনেশ্বর ওড়িশার রাজধানী উঠে আসবার বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত শহর হিসেবে ভুবনেশ্বর তেমন জমে ওঠেনি। বহুদিন পর্যন্ত জায়গাটা ছিল বলতে গেলে শুধু সরকারি চাকুরেদের কলোনি। ভুবনেশ্বর ক্লাব একরকম অফিসার্স ক্লাব আর অফিসার মানে রাজ্য ও কেন্দ্রের উচ্চপদস্থ আমলা। শেষে দরজা খুলল বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থার দিকে। সে একটা সময়। যে কোম্পানি ভুবনেশ্বরে নতুন শাখা খোলে, তার মুখ্য কর্তাব্যক্তি হয়ে আসে একজন বাঙালি। গ্রিভস কটন-এর সুশান্ত ঘোষ, টেলকোর রণজিৎ মিত্র, ক্রম্পটন গ্রিভস-এর সুবিনয় মুখার্জি, এলজির প্রদীপ চক্রবর্তী। আরও কত কে।
দেখাদেখি পাবলিক সেক্টরেরও একই নীতি। ইউকো ব্যাঙ্কের সিদ্ধার্থ পাল, কোল ইন্ডিয়ার অভিজিৎ কুণ্ডু, রিজিওন্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির দিব্যেন্দু মুখার্জি, কৃষ্ণেন্দু ব্যানার্জি, ইন্ডিয়ান অয়েলের সঞ্জয় গুপ্ত, অম্লান ঘোষ। এছাড়া বিভিন্ন হোটেলে নতুন নতুন ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। চারিদিকে বাঙালি। এদের নিয়ে একতাক্লাবের ছোট্ট উপনিবেশ।
এত ভাল চাকুরে বহিরাগত আসার দরুন সরকারি অফিসার ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি বিশাল বাড়িগুলোর মোটা টাকার ভাড়াটে জুটতে শুরু করল। সবচেয়ে কুলীন ফরেস্ট পার্ক যেখানে নতুন রাজধানী পত্তনের সময় সরকারের উচ্চস্তরের পদাধিকারীদের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন। তার পরের খেপে সূর্যনগর, সত্যনগর, শহীদনগর। হাল আমলের শৌখিন এলাকা নুয়াপল্লি। আমজনতা ও অপেক্ষাকৃত সাধারণ বহিরাগতদের জন্য চন্দ্রশেখরপুরে সরকারি বাসগৃহ। এরপর বারামুণ্ডায় সরকারি হাফফিনিসড বাড়ি। শহর জমে ওঠার সবচেয়ে বড় লক্ষণ বাজারের আমূল পরিবর্তন। শহরের মধ্যে চার নম্বর ইউনিটে এজি অফিসের যথেষ্ট সংখ্যক বাঙালি কর্মীদের বাসস্থান হওয়ার দরুন চাহিদা এবং যোগানের অবধারিত আইন অনুসারে সেখানে ঠিক রাস্তার পাশে কিছু মাছওয়ালা বসতে শুরু করে। ক্রমে সেখানে দেখা যায় শহরের সেরা মাছের বাজার। সে বাজারে সকালে যে মাছ বিক্রি হয় না তার স্থান শহরের প্ল্যান করা মেন মারকেটে বিকেলে। একতা ক্লাবের জমায়েতে বা যে কোনও দুজন নবাগত বাঙালি এক হলেই আলাপ আলোচনার প্রসঙ্গে মাছ ও ভুবনেশ্বর স্তুতি। শুনতে শুনতে একতার অ্যাডভাইসার একজন সিনিয়র বাঙালি আই এ এস ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,
